গল্প ৯০ – ফেলুদা – রবার্টসনের রুবি / Story 90 – Feluda – Robertson er Ruby (Robertson’s Ruby)

Satyajit Ray-Feluda-Robertson er Ruby (1)

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray-Feluda-Robertson er Ruby

ফেলুদার গল্প – রবার্টসনের রুবি – সত্যজিৎ রায়

আরেকবার ফেলুদা, তবে এটি পাহাড় কিংবা নগর নয়, বরং বাংলারই বীরভূমকে পটভূমি করে লেখা। গল্পটি যার পূর্বপুরুষের পান্নাকে (রুবি) নিয়ে, সেই রবার্টসনের সাথে ফেলুদাদের প্রথম পরিচয় হয় বীরভূমে যাওয়ার ট্রেনে, যা পরে সখ্যে গড়ায়। ভারতপ্রেমী রবার্টসন তার আলোকচিত্রী বন্ধু টম ম্যাক্সওয়েলকে সঙ্গে নিয়ে বীরভূম যাচ্ছিলেন পোড়ামাটির স্থাপত্যকলার স্থানীয় কিছু নিদর্শন দেখতে। তবে তার কাছে যে ভারত থেকে তারই ব্রিটিশ পূর্বপুরুষের লুঠ করা এক বহুমূল্য পান্না আছে, আর তা যে তিনি ভারতে ফেরত দিতে এসেছেন, সে খবর চাউর হয়ে যাওয়ায় অনেকেরই অনাকাঙ্খিত নজর পড়ে তার উপর। ব্যাপারটা ফেলুদার চোখে পড়লেও তার চিন্তার কারণ ছিল অন্য – ম্যাক্সওয়েল, যার ঔদ্ধত্য আর ভারতবিদ্বেষ শুধু পান্নাটিরই নয়, এমনকি রবার্টসনদের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

************************

সত্যজিৎ রায়ের গল্পগুলি বাস্তব চরিত্রদের দ্বারা কতটুকু অনুপ্রাণিত, তা নিয়ে বোধহয় খুব বেশি গবেষণা হয়নি, তবে রবার্টসনের রুবিতে লেখকের একজন বন্ধুর উল্লেখ আমরা পাই – ডেভিড ম্যাককাচন, যিনি বাংলার পোড়ামাটির স্থাপত্যকলা নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন। রবার্টসনের রুবি সত্যজিৎ প্রকাশ করার কিছুদিন আগে ম্যাককাচন মারা যান, তাই মনে হয় গল্পটিতে ম্যাককাচনের প্রশংসাটুকু হয়তো সত্যজিৎ পুরোনো বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী হিসেবে লিখেছিলেন।

Satyajit Ray-Feluda-Robertson er Ruby (2)Feluda’s Stories – Robertson er Ruby (Robertson’s Ruby) – Satyajit Ray

Feluda again, and this time, a bit closer to home. Robertson er Ruby starts with Feluda and company on a train journey to a vacation in Birbhum, when they meet and befriend Peter Robertson, an India-enthusiast who was traveling across the country with his friend, photographer Tom Maxwell. Although foremost a traveler, Peter was unique from other visitors, for he had come to India to return a priceless ruby that his great-great grandfather had looted during the British occupation of India. However, the ruby had also made him a target of collectors and potentially, criminals. Feluda saw travel ahead even as he befriended Robertson, but his unease would only be exacerbated by Maxwell, whose anti-Indian sentiment and superiority complex would put the entire party on the wrong side of the locals.

************************

While notable for its pro-Indian sentiment and storyline alone, Robertson er Ruby is also perhaps unique in the sense that in the story, Satyajit Ray refers to a close friend – David McCutchion, who pioneered the academic study of the terracotta temples of Bangla. MuCutchion had probably died shortly before the story was published, and the Ray’s praise of McCutchion through the voice of Feluda can perhaps be regarded as a tribute to an old friend.

Advertisements

কবিতা ৩১ – এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে / Poem 31 – Eto Alo Jwaliyechho Ei Gagane (When You Hold Your Lamp in the Sky)

 Rabindranath Thakur-Eto Alo Jaliyechho ei Gagane (1)(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে এখানে / Original version of the picture taken from here.)

অনেক দিন ধরেই রবিঠাকুরের এই কবিতাটি খুঁজছিলাম, হয়তো মন কবিতাটির পংক্তিগুলো নিভৃতে গেয়ে চলে তাই। লেখাটি ভাল লাগে খুব, তাই সেই ভাললাগাটুকু পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিতে ছবিসহ পংক্তিগুলো তুলে দিলাম – রবিঠাকুরের লেখা এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে, যা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের ভালবাসা আর বিস্ময়কে নিয়ে।

This time, a most beautiful set of lines that I had read long ago – Eto Alo Jwaliyecho Ei Gagane (When You Hold Your Lamp in the Sky) – a poem by Rabindranath Thakur expressing our wondrous amazement at and love for God – presented here for your contemplation.

এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে

এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে
কী উৎসবের লগনে॥
সব আলোটি কেমন ক’রে    ফেল আমার মুখের ‘পরে,
তুমি আপনি থাকো আলোর পিছনে ॥

প্রেমটি যেদিন জ্বালি হৃদয়-গগনে
কী উৎসবের লগনে
সব আলো তার কেমন ক’রে   পড়ে তোমার মুখের ‘পরে,
আমি আপনি পড়ি আলোর পিছনে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহীত)

Eto Alo Jwaliyecho Ei Gagane (When You Light your Lamp in the Sky)
(Translated by the poet himself)

When you hold your lamp in the sky
it throws its light on my face
and its shadow falls over you.

When I hold the lamp of love in my heart
its light falls on you
and I am left standing behind in the shadow.

– Rabindranath Thakur (Collected from Puja)

গল্প ৮৯ – ফেলুদা – গ্যাংটকে গণ্ডগোল / Story 89 – Feluda – Gangtok e Gandogol (Trouble in Gangtok)

Satyajit Ray-Feluda-Gangtok e Gandogol 1

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray-Feluda-Gangtok e Gandogol

ফেলুদার গল্প – গ্যাংটকে গণ্ডগোল – সত্যজিৎ রায়

“বাগডোগরা বলতে অনেকেই মনে করবে, আমরা হয়তো দার্জিলিং কিম্বা কালিম্পং যাচ্ছি। আসলে তা নয়। আমরা যাচ্ছি সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে। এর আগে গ্রীষ্মের ছুটিতে দুবার দার্জিলিং গেছি; এবারও প্রথমে দার্জিলিং-এর কথাই হয়েছিল, কিন্তু শেষ মূহূর্তে ফেলুদা গ্যাংটকের নাম করল। বাবার হঠাৎ ব্যাঙ্গালোরে একটা কাজ পড়ে গেল বলে উনি আর এলেন না। বললেন, ‘তুই পরীক্ষা দিয়ে বসে আছিস, ফেলুরও ছুটি পাওনা হয়েছে – দিন পনেরোর জন্য ঘুরে আয়। কলকাতায় বসে ভ্যাপসা গরমে পচার কোনও মানে হয়না।’”

অতঃপর ফেলুদার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর গল্পগুলির মধ্যে একটি – গ্যাংটকে গণ্ডগোল। গল্পের শুরুর ছুঁতোটুকু ভ্রমণ হলেও আসল উপলক্ষ্যটা যে রহস্য উদঘাটন, তা তো পাঠকদের জানাই। তবে এর বেশি বললে গল্পের মজাটা নষ্ট হয়ে যাবে, তাই পাঠকদের জন্য গল্প থেকে কটি সূত্র তুলে দিলাম – তিব্বত, পাথর, যমন্তক, বৌদ্ধমঠ, শেলভাঙ্কার, ছদ্মবেশ আর জোঁক – ব্যাস, বাকিটুকু নাহয় লিংকেই থাকল!

Feluda’s Stories – Gangtok e Gandogol (Trouble in Gangtok) – Satyajit Ray

Another of Feluda’s adventures, on set on the mountainous terrains of Sikkim. In Gangtok e Gandogol (Trouble in Gangtok), Feluda and Topshe, who had gone to the town for a vacation, learns about the death of Shivkumar Shelvankar, a rich businessman who was in town for business in a car crash. The death is initially presumed to be an accident, but as Feluda learns more about the circumstances preceding Shelvankar’s visit and the people he knew, the less sure he becomes. Feluda’s suspicions do not escape the notice of those on the lookout, and before long, the sleuth finds himself and his cousin inextricably entangled in a danger.

Satyajit Ray-Feluda-Gangtok e Gandogol 2

গল্প ৮৮ – ইছামতি / Story 88 – Ichamati

Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Ichamati 2

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Ichamati

ইছামতি – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কিছুদিন আগে এই সাইটে বিভূতিভূষণের গল্পগুলোতে “সময়ের শান্ত স্রোতে (চরিত্রদের জীবন) ধীরে ধীরে একটি নিরুদ্বেগ অবধারিতের” দিকে প্রবাহিত হওয়া নিয়ে লিখেছিলাম। সে সময় আলোচ্য লেখাটি ছিল আরণ্যক ইছামতি  উপন্যাসটিও সেক্ষেত্রে অনেকটা আরণ্যকের মতই, তবে এই গল্পটির পটভূমি বিহার নয়, বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে গেছে যে ইছামতি নদী, তারই ধারের পাঁচপোতা নামের একটি গ্রাম। অবিভক্ত ভারত তখনো ব্রিটিশদের দখলে, আর মোল্লাহাটির নীলকুঠির অবস্থাও তখন রমরমা। কুঠির দেওয়ান কুলীন ব্রাহ্মন রাজারাম রায়, যার প্রতাপে সারা গ্রাম তটস্থ থাকে। গল্পের শুরুতে রাজারামের তিন বোন তিলু, বিলু আর নিলুর বিয়ে হয় গ্রামে ঘুরতে আসা ভবানী বাড়ুয্যে নামের আরেকজন কুলীনের সাথে। আর যদিও বিভূতিভূষণের এই উপন্যাসটি বিশেষ কোন চরিত্রকে নিয়ে লেখা নয়, গল্পের পরবর্তীটুকুতে মূলত ভবানী ও তার স্ত্রীদের চোখ দিয়েই গ্রামটির সাথে ধীরে ধীরে আমাদের পরিচয় ঘটে।

ইছামতি  উপন্যাসটি যে সময়ের উপর ভিত্তি করে লেখা, তখন নদীপাড়ের জনপদগুলি সেকেলে বাঙ্গালী সমাজের মতই গোঁড়ামী আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। জাতপ্রথা আর নারীর অবদমন থেকে শুরু করে ভারতীয় সমাজের বৃটিশ-আরাধনা আর দুর্বলদের উপর নিপীড়ন – এর সবই উপন্যাসটিতে আমরা দেখি, কিন্তু তা সমালোচকের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং যেন পাঁচপোতার একটি নিতান্তই মানবিক দিনলিপির মাধ্যমে। গ্রামের বুড়ো ব্রাহ্মণদের পরনিন্দা-পরচর্চা, নীলকুঠির কর্মচারীদের দাদাগিরী, আর গ্রাম্যবধূদের গল্প – এসমস্ত রোজনামচার মধ্যে দিয়েই গল্পটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। অথচ তারই মধ্যে তিলুরা ঘোমটা ছাড়া রাস্তায় চলতে শেখে, গ্রামের ছেলেরা এক এক করে কলকাতায় পাড়ি জমায়, আর সাহেবদের সেই নীলকুঠি কিনে নেয় গ্রামেরই এক লালমোহন পাল, যে কম বয়সে কুঠির সাহেব মালিককে দেখে চাবুকের বাড়ি খাওয়ার ভয়ে রাস্তার উপর নিজের সওদাপাতি ফেলে পালিয়েছিল। শ্বাশত আর পরিবর্তনের মাঝে ভারসাম্য রেখে চলা সে অদৃশ্য ধারার গভীর সৌন্দর্যকে বিভূতিভূষণ যেন ইছামতির মাঝেই খুঁজে পান –

কত তরুণী সুন্দরী বধূর পায়ের চিহ্ন পড়ে নদীর দু’ধারে, ঘাটের পথে, আবার কত প্রৌঢ়া বৃদ্ধার পায়ের দাগ মিলিয়ে যায়… গ্রামে গ্রামে মঙ্গলশঙ্খের আনন্দধ্বনি বেজে ওঠে বিয়েতে, অন্নপ্রাশনে, উপনয়নে, দূর্গাপূজোয়, লক্ষীপূজোয়… সে সব বধূদের পায়ের আলতা ধুয়ে যায় কালে কালে, ধূপের ধোঁয়া ক্ষীণ হয়ে আসে… মৃত্যুকে কে চিনতে পারে? গরীয়সী মৃত্যু-মাতাকে? পথপ্রদর্শক মায়ামৃগের মতো জীবনের পথে পথে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে সে, অপূর্ব রহস্যভরা তার অবগুন্ঠন কখনো খোলে শিশুর কাছে, কখনো বৃদ্ধের কাছে… তেলাকুচো ফুলের দুলুনিতে অনন্ত সে সুর কানে আসে… কানে আসে বনৌষধির কটুতিক্ত সুঘ্রাণে, প্রথম হেমন্তে বা শেষ শরতে। বর্ষার দিনে এই ইছামতির কূলে কূলে ভরা ঢলঢল রূপে সেই অজানা মহাসমুদ্রের তীরহীন অসীমতার স্বপ্ন দেখতে পায় কেউ কেউ… কত যাওয়া আসার অতীত ইতিহাস মাখানো ঐ সব মাঠ, ঐ সব নির্জন মাঠের ঢিপি – কত লুপ্ত হয়ে যাওয়া মায়ের হাসি ওতে অদৃশ্য রেখায় আঁকা। আকাশের প্রথম তারাটি তার খবর রাখে হয়তো…

বিভূতিভূষণ ইছামতি লেখার পর সময়ের সাথে সাথে নদীপাড়ের গ্রামগুলি বদলে গেছে অনেক। তবে গ্রামীণ বাংলার যা কিছু চিরন্তন, তাতো আর বদলায়নি, মঙ্গলশঙ্খের আনন্দধ্বনি সময়ে সময়ে নদীপারের গ্রামগুলোতে বেজে ওঠে আজও, রূপসী বধূদের পদচিহ্ন এখনো নদীপারে খানিক্ষণের জন্যে আঁকা হয়ে মুছে যায়। সে মনে করেই বাংলার নদীপাড়ের মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর ভালবাসা নিয়ে বিভূতিভূষণের লেখা এই উপন্যাসটি আজ পাঠকদের জন্যে তুলে দিলাম।

Ichamati – Bibhutibhushan Bandyopadhyay

Following Aranyak, another of Bibhutibhushan Bandyopadhyay’s novels: Ichamati is a narrative of the life along the banks of a river of the same name.  In the early 20th Century, when the subcontinent was under British occupation and indigo plantations were strewn across the undivided Bangla, a plantation by a certain Panchpota village on the river was in its heyday. The owners of that plantation were Englishmen, but their power was wielded through Bangalees who commanded subservience across the entire region. Rajaram, the dewan (secretary) of the plantation, had married off his three sisters to a former ascetic, Bhavani Bandyopadhyay, and it is the latter’s polygynous yet happy family around which the novel develops. Like any other rural Bangalee community of the time, Panchpota was not without its share of superstition, wrongs and biases – but instead of being condemned in Ichamati, those are humanised through the characters. In the novel, the anticipating reader finds the usual village folk who do their usual work – hypocritical, elderly Brahman’s who only gossip idly and criticize others, the hired goons of the plantation who grab land, and the ‘off-the-rocker’ housewife who would say things no one would (or could). Yet, around the daily routines of these people occur silent but subversive changes – Bhavani’s wives learn to walk in public without a veil, and the boys of the village go off to Kolkata to work, one by one… even the ownership of the plantation shifts to a local man. Such changes continue to shape the Indian subcontinent even today. So in that sense, Ichamati helps us understand every Bangalee village then and now. But with its heart-softening narrative of the lives along the river bank, it also offers more than an analytical window into rural Bangla, it teaches us to love her.