গল্প ৯৩ – পথের পাঁচালী / Story 93 – Pather Panchali (Song of the Road)

Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Pather Panchali

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Pather Panchali

পথের পাঁচালী – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরেকটি গল্প। পথের পাঁচালী র সারমর্ম পাঠকদের জন্য তুলে ধরার মত ক্ষমতা আমার নেই, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের অমর এই সৃষ্টিটিকে কি ভূমিকা ছাড়া এই সাইটে উপস্থাপন করা যায়? তাই এই ভণিতাটুকু। পথের পাঁচালী আমাদের চিরচেনা গ্রামবাংলারই কোনো এক প্রান্তে একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের জীবনকাহিনী, যাতে বিভূতিভূষণ পরিবারটির হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর সংগ্রামের ছবি তুলে ধরেছেন অবিশ্বাস্য নিপুণতায়। এই সাইটে তোলা বিভূতিভূষণের আগের গল্পগুলোর মতো এটিও বিশেষ কোন পরিণতিকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং লেখা সাধারণ সব মানুষদের জীবনের নগণ্য সব ঘটনা নিয়েই। উদাহারণস্বরূপ গল্পটির মূল চরিত্র ছোট্ট অপুর জীবন থেকে একটি ঘটনা তুলে দেই –

বিশু ডানপিটে ছেলে, তাহাকে দৌড়িয়া ধরা কি খেলায় হারানো সোজা নয়। একবার অমলা স্পষ্টতই বিরক্তি প্রকাশ করিল। অপু প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিল যাহাতে সে জেতে, যাহাতে অমলা সন্তুষ্ট হয় – কিন্তু বিস্তর চেষ্টা সত্ত্বেও সে আবার হারিয়া গেল।

সে-বার দল গঠন করিবার সময় অমলা ঝুঁকিল বিশুর দিকে।

অপুর চোখে জল ভরিয়া আসিল। খেলা তাহার কাছে হঠাৎ বিস্বাদ মনে হইল – অমলা বিশুর দিকে ফিরিয়া সব কথা বলিতেছে, হাসিখুসি সবই তাহার সঙ্গে। খানিকটা পরে বিশু কি কাজে বাড়ী যাইতে চাইলে অমলা তাহাকে বার বার বলিল যে, সে যেন আবার আসে। অপুর মনে অত্যন্ত ঈর্ষা হইল, সারা সকালটা একেবারে ফাঁকা হইয়া গেল! পরে সে মনে মনে ভাবিল – বিশু খেলা ছেড়ে চলে যাচ্ছে – গেলে খেলার খেলুড়ে কমে যাবে, তাই অমলাদি ঐরকম বলছে, আমি গেলে আমাকেও বলবে, ওর চেয়েও বেশি বলবে। হঠাৎ সে চলিয়া যাইবার ভান করিয়া বলিল – বেলা হয়ে যাচ্ছে, আমি যাই নাইবো। অমলা কোনো কথা বলিল না, কেবল কামারদের ছেলে নাড়ুগোপাল বলিল – আবার ও-বেলা এসো ভাই!

অপু খানিক দূর গিয়া একবার পিছনে চাহিল – তাহাকে বাদ দিয়া কাহারও কোনো ক্ষতি হয় নাই। পুরাদমে খেলা চলিতেছে, অমলা মহা উৎসাহে খুঁটির কাছে বুড়ি হইয়া দাঁড়াইয়াছে – তাহার দিকে ফিরিয়াও চাহিতেছে না।

অপু আহত হইয়া অভিমানে বাড়ি আসিয়া পৌঁছিল, কাহারও সঙ্গে কোনো কথা বলিল না।

ভারি তো অমলাদি! না চাহিল তাহাকে – তাতেই বা কি?…

উপরের লেখাটি পড়লে ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া তেমনই কোন ঘটনার কথা মনে পড়ে, তাই না? বাংলা সাহিত্যিকদের মধ্যে গ্রামীণ সমাজ আর শিশুমনকে একইসাথে বিভূতিভূষণের মতো অবলীলায় তুলে ধরতে আর কেউ বোধহয় পারেননি, আর তাঁর ক্ষমতার উৎকর্ষ যদি কোথাও ঘটে থাকে, তা এই গল্পতেই।পথের পাঁচালী  শুধু পল্লীবাংলার অকৃত্তিম প্রতিচ্ছবিই নয়, তার বুকে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ছেলেমানুষী হাসি-কান্নার দিনলিপিও। আর সেই অনন্যতাস্বরূপই বাংলা সাহিত্যে ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই হয়তো গল্পটি অদ্বিতীয়। অসাধারণ এই গল্পটি ছাড়া এই সাইটটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তাই আজ পাঠকদের জন্যে এটি তুলে দিলাম।

(প্রসঙ্গত – যারা আগে জানতেন না, সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী  কিন্তু বিভূতিভূষণের এই গল্পকে ঘিরেই লেখা। সত্যজিৎ রায়ের অতুলনীয় নির্দেশনার কারণে গল্পটি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছে সন্দেহ নেই, তবে চলচ্চিত্রের সৌন্দর্যের মূলটুকু কিন্তু সত্যজিৎ খুঁজে পেয়েছিলেন তার প্রিয় এই গল্পটির মধ্যেই। পথের পাঁচালী  চলচ্চিত্রটি বানানো নিয়ে সত্যজিৎ তাঁর একেই বলে শুটিং  স্মৃতিচারণার একটি অধ্যায় লিখেছিলেন – পাঠকদের সেটিও পড়বার আমন্ত্রণ রইল।)

Pather Panchali (Song of the Road) – Bibhutibhushan Bandyopadhyay

Pather Panchali (Song of the Little Road) by Bibhutibhushan Bandyopadhyay, is one of the most celebrated works in Bangla literature. As far as accolades go, there is not much I can say that has not been already said, but it needs to be mentioned that perhaps no other work in Bangla, and even perhaps world literature, compares to the novel in its representation of a rural life from the perspective of a little boy (Apu) from a poor family. Like Bibhutibhushan Bandyopadhyay’s other works, Pather Panchali too does not have a conclusion towards which it is directed. Instead, the narratives loses itself in a languid but beautiful flow that is interspersed with little Apu’s joys and sorrows – for instance, his seeing a train for the first time, and his offense at not heeded by a girl with whom he wants to play. The narrative is not even throughout, however. As Apu grows up, the realities of his world become starker, and on the last page of the novel, an adolescent Apu is left trying to become a man. In many ways, Pather Panchali is a familiar story of our childhoods, and the close-knit families from which many of us come. But it is with this ordinariness that it captures the reader, stirring up the most intimate and beautiful of childhood memories, and anchors itself to his/her heart. That every Bangalee should read this Bibhutibhushan masterpiece goes without saying. So here it is, for your eyes.

(Something that you might find interesting: The story was taken to the global audience by eminent Indian film director Satyajit Ray, whose début with Pather Panchali (Song of the Little Road), brought him and his genre of Indian cinema critical acclaim across the world. Ray’s personal account of the making of the film can be found in his autobiography Ekei Bole Shooting. While Ray’s direction was crucial in presenting the narrative, he always took particular care to acknowledge Bibhutibhushan’s influence on him. Those who have read Feluda’s stories will know that Bibhutibhushan was the sleuth’s favorite writer. )

Advertisements

গল্প ৯২ – ফেলুদা – জয় বাবা ফেলুনাথ / Story 92 – Feluda – Jay Baba Felunath

Satyajit Ray-Feluda-Jay Baba Felunath 1পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray-Feluda-Jay Baba Felunath

ফেলুদার গল্প – জয় বাবা ফেলুনাথ – সত্যজিৎ রায়

মৌসুমটা যখন পূজোর, তাই এবারের গল্পটাও নাহয় সময়টার মতই জমজমাট হোক। জয় বাবা ফেলুনাথ পুজোর সময়েরই গল্প, তবে এতে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরী বাংলাতে নয়, ঘটে কাশীর সরু গলিগুলোর মধ্যে। দশাশ্বমেধ ঘাট আর বিশ্বনাথের শহর কাশীতে ফেলুদাদের যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পুজোর ছুটি কাটানো, কিংবা লালমোহনবাবুর ভাষায় “কাশী, (ফেলুদার তদন্তের) কেস আর (কাশীতে ঘুরে প্লট জোগাড় করে তা নিয়ে লিখে লালমোহন বাবুর) ক্যাশ” জোটানো। শেষ পর্যন্ত যা হয়, তা তোপ্‌সের বর্ণনায় –

বেনারস গিয়ে লালমোহনবাবু গল্পের প্লট পেয়েছিলেন ঠিকই; তবে ফিরে আসার দুমাস পরে বড়দিনে তার যে রহস্য উপন্যাসটা বেরোল, সেটার সাথে টিনটিনের একটা গল্পের আশ্চর্য মিল।

ফেলুদার কিন্তু গিয়ে সত্যিই লাভ হয়েছিল। তা না হলে অবিশ্যি এই বইটাই লেখা হত না। ফেলুদার জীবনে সবচেয়ে ধুরন্ধর ও সাংঘাতিক প্রতিদ্বন্দীর সঙ্গে তাকে এই বেনারসেই লড়তে হয়েছিল। ও পরে বলেছিল – ‘এইরকম একজন লোকের জন্যই অ্যাদ্দিন অপেক্ষা করছিলাম রে তোপ্‌সে। এ সব লোকের সঙ্গে লড়ে জিততে পারলে সেটা বেশ একটা টনিকের কাজ দেয়।’

গোয়েন্দা সাহিত্যে নায়কের কৃতিত্বের সিংহভাগই যে খলনায়কের কারণেই, জয় বাবা ফেলুনাথ  এর মগনালাল মেঘরাজ তার অখন্ডনীয় প্রমাণ। গল্পটা কিভাবে শেষ হয়, তা তো জানাই। কিন্তু প্রথম আর শেষের মাঝখানে ঠাসা যেই টানটান উত্তেজনা, তাতো আর সেটি না পড়লে বোঝার নয়। তাই এই পূজোয় পাঠকদের জন্যে আজ ফেলুদার আর মগনলালের রোমহর্ষক সংঘর্ষের কাহিনী – জয় বাবা ফেলুনাথ । শারদীয় শুভেচ্ছা রইল।

Feluda’s Stories – Jay Baba Felunath – Satyajit Ray

For about half of us Bangalees, it is that wonderful time of the year again. And the season demands that everything else measures up to it, does it not? So this time, as the season’s greetings from yours truly, an upload that is perhaps the best of the Feluda series. Imagine yourself in a few days from now, celebrating this year’s Durga Puja, but not in Kolkata or some other place in Bangla. Instead, you are in Kashi, the old and colorful city of temples and narrow lanes, of ghats on the Ganga, and of gangsters and godfathers. Now, imagine you are a sleuth, and that a local Bangalee in distress asks for your help on a case. You accept, only to find yourself against the godfather of the city, Maganlal Meghraj, whose goons lurk in every corner of Benares. What would you do? What would Feluda do against the man who is every bit of Moriarty as he is to Holmes, and more? The answer is in Jay Baba Felunath, attached here for your reading pleasure.

Satyajit Ray-Feluda-Jay Baba Felunath 2

ছোটগল্প ৯১ – প্রফেসর শঙ্কু – স্বপ্নদ্বীপ / Short Story 91 – Professor Shanku – Swapnadwip (The Island of Dreams)

Satyajit Ray-Professor Shanku-Swapnadwip 1

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray-Professor Shanku-Swapnadwip

প্রফেসর শঙ্কুর গল্প – স্বপ্নদ্বীপ – সত্যজিৎ রায়

প্রফেসর শঙ্কুর গল্পগুলো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী হওয়ার কারনেই খানিকটা অদ্ভুত, তবে সেগুলোর মধ্যেও যদি অদ্ভুততর কোন গল্পের নাম বলতে হয়, তখন স্বপ্নদ্বীপ এর কথা মনে আসে। স্বপ্নদ্বীপ এর শুরু হয় রোজ রাতে প্রফেসর শঙ্কুর একটি আশ্চর্য জায়গাকে স্বপ্নে দেখা নিয়ে। স্বপ্নটা নাহয় শঙ্কুর ভাষাতেই বর্ণনা করি –

দেখলাম আমি একটা অদ্ভুত জায়গায় গিয়ে পড়েছি। সেখানে ঘরবাড়ি লোকজন কিছুই নেই – আছে শুধু গাছপালা আর বনজঙ্গল। এইসব গাছপালার একটিও আমার চেনা নয়। এদের রংও ভারী অস্বাভাবিক। সবুজ পাতা প্রায় নেই বললেই চলে। তার বদলে নীল লাল বেগুনী কমলা এই ধরনের রং। গাছে ফুল আর ফলও আছে – তার একটাও আমার চেনা নয়। একটা প্রকান্ড  ফুলে অজস্র পাপড়ি আর প্রত্যেকটা পাপড়ির রং আলাদা। আর একটা ফুলের এক-একটা পাপড়ি যেন এক-একটা হাতির কান, আর হাতির কানের মতই সেগুলো মাঝে মাঝে দুলে দুলে উঠছে… আর একটা তরমুজের সাইজের ফল – তার সর্বাঙ্গে গাঁঢ় লাল রোঁয়া, আর সেই রোঁয়ার ভিতর দুটো করে গোল গোল সাদার মাঝখানে কালো ফুটকি। ঠিক যেন মনে হয়, ফলের গায়ে একজোড়া চোখ।

শঙ্কু তখন তার প্রতি-মাধ্যাকর্ষণ ধাতু দিয়ে একটি উড়োজাহাজ বানানোর কাজে ব্যস্ত। কিন্তু তার মধ্যেই প্রতি রাতে এই অদ্ভুত স্বপ্নটি দেখতে দেখতে কেন জানি শঙ্কুর বাইরে কোথাও ঘুরে আশার ইচ্ছে জাগে। একই সময় হঠাৎই পৃথিবীর নানা দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট মনীষী রহস্যজনকভাবে একইসাথে নিখোঁজ হয়ে যান। ঘটনাটি শঙ্কুর মনে খটকা জাগালেও উড়োজাহাজ তৈরী আর রাত্রে একই স্বপ্ন বার বার দেখা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় তার ছিল না। যাই হোক উড়োজাহাজও তৈরী হয়, আর শঙ্কুও তাতে তার প্রতিবেশী অবিনাশবাবুকে নিয়ে উড়াল দেন। তাদের গন্তব্য – অক্ষাংশ ১৬ উত্তর, দ্রাঘিমাংশ ১৩৬ পূর্ব – আর তাতে যাওয়ার কারণ – অজানা, হয়তো স্বপ্নে দেখা বলে।

Professor Shanku’s Stories – Swapnadwip (The Island of Dreams) – Satyajit Ray

Of the adventures of Professor Shanku, Swapnadwip (The Island of Dreams) ranks among the most bizarre. The story starts with Shanku in the thick of building his own airplane – a task that keeps him absorbed even when several prominent people from across the world mysteriously go missing. But busy though he is, Shanku’s sleep is strangely broken by the same dream every night – one about an island with enticingly colourful plants and strangely alive flowers. And despite his work, Shanku finds himself brooding more and more on his nightly visions, which inexplicably fill him with a desire to go off to some faraway land. As if on cue, the airplane gets built, and Shanku sets off on it with his neighbor, Abinash Babu towards the Bay of Bengal. Their destination – a stretch of water at Latitude 16 N and Longitude 136 E, and reason for going there – a desire to go that Shanku himself cannot explain.

Satyajit Ray-Professor Shanku-Swapnadwip 2