গান ৬৬ – জয় বাংলা, বাংলার জয় / Song 66 – Joy Bangla, Bangla’r Joy (Victory to Bangla)

ডিসেম্বরের শুরু আজ। আমাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি, তাদের মনে মাসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ – একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তো বাংলাদেশ বিজয় লাভ করেছিল এই মাসের ১৬তেই। বিজয়ের মাসে তাই বিজয়ের একটি গান – গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও আনোয়ার পারভেজ এর সুরে জয় বাংলা, বাংলার জয়  বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে একটি। একাত্তরে যখন বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে রেডিও তরঙ্গে ভেসে আসা জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি তাদের অনুপ্রেরণা যোগাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শেশ হয়ে গেছে ৪৫ বছর আগেই, কিন্তু যেসব কারণে যুদ্ধ, তার অনেককটিই দুই বাংলাতেই এখনো বর্তমান। সেসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণাস্বরূপ তাই আজ এই গানটি তুলে দেওয়া।

It’s December – a month of significance for Bangalees, and particularly, Bangladeshis. It was on the 16th of this month, in 1971, that the Bangladeshi militia (and the supporting Indian allies) defeated the Pakistani army and their associates after a nine month War of Independence. The war saw millions become refugees, and by some estimates, about 3 million deaths – needless to say, it was dark period for the Bangalees who lived through it. During those times, Muktijoddhas (freedom fighters) in the thick of war would draw inspiration from songs Bangladeshi refugee artists wrote and sung over the airwaves from India. Joy Bangla Bangla’r Joy (Victory to Bangla) is one of the most famous of those songs. Written by Gazi Majharul Anwar, it was simultaneously an expression of anger at the atrocities by the Pakistan army and a call to action against them. On this month and in these times of forgetfulness, it is only appropriate that this thrilling and patriotic song is added to this site.

জয় বাংলা, বাংলার জয়

জয় বাংলা, বাংলার জয়,
হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়
কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়।।

বাংলার প্রতি ঘরে ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে
আমাদের রক্ত টগবগ দুলছে মুক্তির দৃপ্ত তারুণ্যে
নেই ভয়, হয় হোক রক্তের প্রচ্ছদ পট
তবু করিনা করিনা করিনা ভয়।।

অশোকের ছায়ে যেন রাখালের বাঁশরী
হয়ে গেছে একেবারে স্তদ্ধ
চারিদিকে শুনি আজ নিদারুণ হাহাকার
আর ওই কান্নার শব্দ।

শাসনের নামে চলে শোষণের সুকঠিন যন্ত্র
বজ্রের হুঙ্কারে শৃঙ্খল ভাঙ্গতে সংগ্রামী জনতা অতন্দ্র
আর নয়, তিলে তিলে বাঙালীর এই পরাজয়
আমি করিনা করিনা করিনা ভয়।।

ভূখা আর বেকারের মিছিলটাকে যেন ওই
দিন দিন শুধু বেড়ে যাচ্ছে
রোদে পুড়ে জলে ভিজে অসহায় হয়ে আজ
ফুটপাতে তারা ঠাঁই পাচ্ছে।

বারবার ঘুঘু এসে খেয়ে যেত দেবনা তো আর ধান
বাংলার দুশমন তোষামুদী চাটুকার
সাবধান, সাবধান, সাবধান
এই দিন, সৃষ্টির উল্লাসে হবে রঙীন
আর মানিনা, মানিনা কোন সংশয়।।

মায়েদের বুকে আজ শিশুদের দুধ নেই
অনাহারে তাই শিশু কাঁদছে
গরীবের পেটে আজ ভাত নেই ভাত নেই
দ্বারে দ্বারে তাই ছুটে যাচ্ছে।

মা-বোনেরা পরণে কাপড়ের লেশ নেই
লজ্জায় কেঁদে কেঁদে ফিরছে
ওষুধের অভাবে প্রতিটি ঘরে ঘরে,
রোগে শোকে ধুকে ধুকে মরছে
অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই
অত্যাচারী শোষকদের আজ
মুক্তি নাই, মুক্তি নাই , মুক্তি নাই।

– গাজী মাজহারুল আনোয়ার
(সুর) আনোয়ার পারভেজ

ছোটগল্প ১১৪ – পুরস্কার / Short Story 114 – Puroskhar (The Prize)

 

satyajit-ray-puroshkar

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray- Puroshkar

শিল্পী – সত্যজিৎ রায়

সত্যজিৎ রায় যে ছবি আঁকতে ভালবাসতেন আর বেশ ভালই আঁকতেন, তা ফেলুদাপ্রফেসর শঙ্কুর গল্পগুলোর জন্যে তাঁর নিজের আঁকা ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায়। আর চিত্রাঙ্কন সম্বন্ধে তাঁর ব্যক্তিগত মতামতও ছিল তাঁর আঁকা ছবিগুলোর মতই – সোজাসাপটা এবং স্পষ্ট। চিত্রাঙ্কনে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বাস্তববাদী ধারা যে সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় ছিল, তা তিনি তাঁর একটি লেখায় (নাম মনে পড়ছে না) ইঙ্গিত করেছিলেন। আর বিমূর্ত শিল্প, বা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট আর্ট যে তাঁর মোটেও পছন্দ ছিল না, তাও তিনি লুকোননি – পুরস্কার গল্পটি সেই ভাবনা থেকেই লেখা।

Puroskhar (The Prize)- Satyajit Ray

If you have been reading the any of the stories by Satyajit Ray on this websites, and have been paying attention to the signatures on the drawings that go with those, you will know that the man was not only a legendary filmmaker and a wonderful writer, but also a good artist. It is not hard to infer from his drawing what kind of style he preferred – simple and plain realistic drawings – but to really know how he felt about art, one needs to look at his writings where he compares realism with abstraction. Puroshkar (The Prize) is one such story.

কবিতা ৬৫ – বঙ্গমাতা / Poem 65 – Bangomata (Mother Bengal)

rabindranath-thakur-bangomata

আজ যে কবিতাটি তোলা, তার শেষের দুটি পংক্তি আমাদের অনেকেরই মুখে মুখে ফেরে। বাঙ্গালী হিসেবে আমরা খানিকটা অসূয়াপূর্ণ, অর্থাৎ পৃথিবীকে বাঁকা চোখে দেখতে আর নিজেদের নিয়ে ঠাট্টা করতে অভ্যস্ত, তাই সেটি অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু বঙ্গমাতা কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সমাজের অবক্ষয়ের মুখে বাঙ্গালীদের নিষ্ক্রিয় দুর্বলতা হতে উত্তরণের পথনির্দেশনা দিতেই লিখেছিলেন। বিগত কদিন ধরে সংবাদ পরে মনটা বেশ ভারাক্রান্ত হয়ে আছে, কবিতার মাঝে তাই খানিকটা আলোর দিশা খুঁজছিলাম। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল, তাই তুলে দেওয়া।

Today, a poem whose last two lines are the favorite lament of every cynical Bangalee – but that is not the reason why I post this. Bangomata (Mother Bengal) was written by Rabindranath Thakur not as a lament or a jibe at the state of our society, but rather, to point towards a salvation from this quagmire in which we Bangalees find ourselves so hoplessly stuck. In a time when it is easy for us to succumb to inaction and domestic bliss even as out soceity descends into darkness, this poem reminds us of what we must instead be – strong and resilient in the face of pain and danger – to lift ourselves out of our current state of being.

বঙ্গমাতা

পূণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে
হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি, তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে।
দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালোছেলে করে।
প্রাণ দিয়ে, দুঃখ স’য়ে, আপনার হাতে
সংগ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।
শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে।
সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (চৈতালি  হতে সংগ্রহীত)

গান ৬৪ – হৃদ-মাঝারে রাখিব (কত লক্ষ জনম ঘুরে) / Song 64 – Hrid Majhare Rakhibo (Kato Lakkho Janom Ghure/After A Million Incarnations)

বাংলা সাহিত্য আর সঙ্গীত নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করলেও সে বিষয়গুলোতে যে নিজের জ্ঞান কতটা সীমিত, তা আজকের লেখাটি যেই গানটিকে নিয়ে, সেটি শুনে নতুন করে মনে পড়ে গেল। ইউটিউবে ঘোরাঘুরি করতে করতে দ্বিজ ভূষণ এর লেখা আর আনুশেহ অনাদিল এর গলায় এই বৈষ্ণবগীতিটি খুঁজে পাই। গানটা তারপর থেকেই মনে বেজে চলেছে, তাই শোনার আনন্দটুকু পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিতে আজ এই সাইটে পংক্তিসহ সেটি তুলে দেওয়া। দ্বিজ ভূষণ সম্বন্ধে আমার বেশি জানা নেই, তবে যা মনে হয়, তিনি লালনের সমসাময়িক একজন গীতিকার। পাঠকদের জানা থাকলে অনুগ্রহ করে এই পোস্টে মন্তব্য করবেন। বাংলা লোকগীতি যারা শোনেন, তাদের হয়ত আনুশেহ অনাদিলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। যারা নতুন, তাদের উপরে সংযুক্ত করা গানটি শোনার আমন্ত্রণ রইল। বাংলার লোকগানের সাথে শ্বাস্ত্রীয় আর খানিকটা পশ্চিমা সুরের অপূর্ব সুন্দর সমন্বয় রয়েছে এতে – দ্বিজ ভূষণ এর কত লক্ষ জনম ঘুরে – যা এক অর্থে ভক্তিমূলক, আর অন্য অর্থে ভালবাসার মানুষটিকে ছাড়তে না চাওয়ার গান।

In the course of my work on this site, the occassional epiphanies that I know very little about Bangla literature and songs are, more often than not, humbling. Sometimes, however, it comes with the unadulterated joy of a piece never read, or a song never heard before. Today, while surfing across YouTube, I came across Dwij Bhushan’s Kato Lakkho Janom Ghure (After A Million Incarnations), and the song has been resonating in my mind since. Whether that is because of Dwij Bhushan’s words, or Anusheh Anadil’s soulful voice, or the superb incorporation of the esraj into a folk song, I do not know, but in the hope that you too will find what I found in the song, this post. For your listening pleasure, a YouTube link is provided above, and if you wish to pour your heart into a chorus, the lyrics are given below – Dwij Bhushan’s Kato Lakkho Janom Ghure, a song of not letting go.

(In case you are not familiar with the Bangla script, a transliteration can be found here.)

কত লক্ষ জনম ঘুরে

কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে, মনরে……মনরে……
কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে, আমরা পেয়েছি ভাই মানব জনম
এ জনম চলে গেলে, এ জনম চলে গেলে আর পাবো না
না না না আর মিলবে না
তাই হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
আমরা আর পাব না, আর পাব না।
“তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না” (২)

ভূবনো মোহনো গোরা, কোন মণিজনার মনোহরা
মণিজনার মনোহরা
ওরে রাধার প্রেমে মাতোয়ারা চাঁদ গৌড়
ধূলায় যাই ভাই গড়াগড়ি
যেতে চাইলে যেতে দেবো না, না না না। (২)
যেতে দেবো না।
তোমায় হৃদয় মাঝে……
তোমায় হৃদয় মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

“যাবো ব্রজের কুলে কুলে” (২)
আমরা মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
ওরে পাগল মন…
যাবো ব্রজের কুলে কুলে
মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
“ওরে নয়নেতে নয়ন দিয়ে রাখবো তারে” (২)
চলে গেলে… চলে গেলে যেতে দেবো না,
না না… যেতে দেবো না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

যে ডাকে চাঁদ গৌড় বলে, ওগো ভয় কিগো তার ব্রজের কুলে
যে ডাকে চাঁদ গৌড় বলে, ভয় কিগো তার ব্রজের কুলে
ভয় কি তার ব্রজের কুলে
“ওরে দ্বিজ ভূষণ চাঁদ বলে” (২)
চরন ছেড়ে দেবো না, না না না……
ছেড়ে দেবো না
তোমায় বক্ষ মাঝে……
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড় আর পাবো না
ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
আর পাব না না না না, আর পাব না।
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় হৃদ মাঝারে…

– দ্বিজ ভূষণ

ছোটগল্প ১১৩ – শিবু আর রাক্ষসের কথা / Short Story 113 – Shibu Ar Rakkhosh er Katha (Shibu and the Demon)

satyajit-ray-shibu-ar-rakkhosh-er-katha

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray-Shibu Ar Rakkhosh Er Katha

শিবু আর রাক্ষসের কথা – সত্যজিৎ রায়

আজ অংক স্যার, রাক্ষস, পাগলাটে দাদা আর আমাদের ছেলেবেলা নিয়ে সত্যজিৎ রায়ের একটি গল্প। অঙ্ক জিনিসটা নিয়ে আমাদের সবারই একটা বয়সে হয় আগ্রহ নয়তোবা দুশ্চিন্তা থাকে। কিন্তু হঠাৎ যদি সেগুলোর একটি তার উল্টোটিতে বদলে যায়, আর তার উপর যদি সেটার কারণ হয় একটি রাক্ষস? হ্যা, আক্ষরিক অর্থেই একটি রাক্ষস। অদ্ভূত লাগছে শুনে? শিবু আর রাক্ষসের কথা  পড়লে কিন্তু সেটি মনে হবে না, বরং স্কুলের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। যারা বাংলা রূপকথার পোকা, তাদের জন্যে একটি সূত্র রেখে দেই –

নর কি বানর কিংবা অন্য জানোয়ার
জেনে রাখো হৃৎপিন্ডে রহে প্রাণ তার।
রাক্ষসের প্রাণ জেনো মৎস্যের উদরে
সেই হেতু রাক্ষস সহজে না মরে।

সত্যজিত রায়ের কলমে স্কুলজীবনের সাথে রূপকথা মেশানো গল্প এর আগেও একবার তুলেছি – সেবারের গল্পটি ছিল ভীনগ্রহের প্রাণীকে নিয়ে। এবারের গল্পটিও খানিকটা তেমনই, তাই পাঠকদের ভাললাগার জন্যে আর তুলে দিলাম। : )

Shibu Ar Rakkhosh er Katha (Shibu and the Demon) – Satyajit Ray

It has been quite some time since I posted one of Satyajit Ray’s fairy tales, hence this upload. The last time, it was about a boy who preferred fairy-tales to math textbooks, and an alien. In Shibu At Rakkhosher Katha (Shibu and the Demon), however, the boy actually happens to love math, and it is the demons in the fairy-tales which scare him – what if they were actually real?