গান ৭২ – পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে / Song 72 – Prithibita Naki Chhoto Hote Hote (Light-years Apart in a Shrinking World)

লম্বা একটি বিরতির পর আজকে একটু অন্যরকম একটা পোস্ট – পৃথিবীটা নাকি গানটি এই সাইটে তোলা অন্যান্য গানগুলোর চাইতে বিষয় ও ধারা, দু দিক দিয়েই একটু আলাদা। আজকের এই যুগে ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা কতভাবেই না অন্যদের সাথে সংযুক্ত, কিন্তু সেই প্রযুক্তির হাত ধরেই আপনজনদের কাছ থেকে যে আমরা কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি বা গেছি, তা কি আমরা মনে রাখি? পাঠকদের মধ্যে যারা শহুরে, তাদের হয়তো সেই একাকিত্বটুকু একটু বেশিই বাস্তব হয়ে ঠেকে। নগরায়ণ আর প্রযুক্তিগত সংযোগের মাঝে সেই  নিঃসঙ্গতাই ফুটে উঠেছে এই গানটিতে – মহীনের ঘোড়াগুলির পৃথিবীটা নাকি

গানটির কথা যখন লিখলাম, তখন মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। পাঠকদের অনেকেই হয়তো জানেন যে মহীনের ঘোড়াগুলি উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রক ব্যান্ডগুলোর মধ্যে একটি। জীবনানন্দ যেমন তাঁর সময়ে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন সাহিত্যধারাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডটিও বাংলার সঙ্গীতজগতে অনেকটা সেভাবেই রক সঙ্গীতধারার প্রচলিত করে। ব্যান্ডটির নাম যে জীবনানন্দের কবিতা থেকেই নেওয়া, তা আর বিস্ময়ের কি? বাংলা ও উপমহাদেশীয় ব্যান্ড সঙ্গীতধারার উপর মহীনের ঘোড়াগুলির প্রভাব যে কি বিশাল, তা বোঝানোর জন্যেপৃথিবীটা নাকি গানটিই যথেষ্ট – গানটি প্রকাশের পরবর্তী বছরগুলোতে সীমান্তের এপার আর ওপার, দুই বাংলারই অনেক গায়কেরা গানটি গেয়েছেন বা সেটি দ্বারা অনুপ্রাণিত করেছেন। বাংলাদেশের নগরবাউল ব্যান্ডের জেমস এর গাওয়া বলিউড সঙ্গীত ভিগি ভিগি  গানটি শুনলেই সেটি বোঝা যায়।

গান শুনতে যারা ভালবাসেন, তাদের জন্যে গানটির পংক্তির সাথে সাথে নিচে একটি ইউটিউব ভিডিও সংযুক্ত করে দিলাম। আশা করি সবার ভাল লাগবে।

In a way of breaking what has been an extended hiatus, a song that I have been thinking of putting up for quite some time. If you are a reader who grew up listening to rock songs in the eighties’ or nineties’ Bangla, you probably know about Moheener Ghoraguli (Moheen’s Horses), if not, you should! One of the first rock bands in the subcontinent, they played a pioneering role in establishing Rock as a genre in the Bangla music, and have had an immense influence on the bands which followed, and continue to follow their footsteps even today. Case on point: Prithibita Naki Chhoto Hote hote (Light-years Apart in a Shrinking World) – a song of citidwelling lovers who grow light-years apart because of the very technology that is supposed to connect them. In this era of Facebook, Twiter and WhatsApp, does that sound familiar? One of their most famous hits, the song has been covered by many famous singers in both Bangladesh and India, and has influenced many famous hits as well. Listen to the song on Youtube below, and then check out the Bollywood hit Bheegi Bheegi sung by the Bangladesh rockstar James, and you will know exactly what I mean. Old stuff, gold stuff – Prithibita Naki a truly interesting example of art moving across boundaries and cultures.

পৃথিবীটা নাকি

পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে
স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে
ড্রয়িং রুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে
যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে
ঘুঁচে গেছে দেশ কাল সীমানার গণ্ডি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

সারি সারি মুখ আসে আর যায়
নেশাতুর চোখ টিভি পর্দায়
পোকামাকড়ের আগুনের সাথে সন্ধি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
পাশাপাশি বসে একসাথে দেখা
একসাথে নয় আসলে যে একা
তোমার আমার ভাড়াটের নয়া ফন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

স্বপ্ন বেচার চোরা কারবার
জায়গা তো নেই তোমার আমার
চোখ ধাঁধানোর এই খেলা শুধু বন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
তার চেয়ে এসো খোলা জানালায়
পথ ভুল করে ভুল রাস্তায়
হয়ত পেলেও পেতে পারি আরো সঙ্গী,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

– মহীনের ঘোড়াগুলি
.
Advertisements

কবিতা ৫২ – সোনার তরী / Poem 52 – Sonar Tori (The Golden Boat)

rabindranath-thakur-sonar-tori

একটি কবিতার অর্থ কবির একান্তই নিজের থাকে ততক্ষণই, যতক্ষণ সেটি একান্তই তার মনে ভাবনা হয়ে কিংবা অন্যের অগোচরে লেখা হয়ে রয়। যেই মুহূর্তে পৃথিবীর কাছে সেটি উন্মুক্ত হয়ে যায়, সেই মালিকানাটুকু যায় হারিয়ে, আর পাঠকের মনের প্রতিফলনের সাথে মিশে গিয়ে কবিতার আদি অর্থটুকু এক একটি হৃদয়ে এক একটি নতুন রূপ লাভ করে। আর সেইসব অর্থের ভীড়ে কবির মনের কথাটুকু হয়তো হারিয়েই যায়… আমরা কি তা জানতে পারি কখনো?

এই অনাবশ্যক ভণিতাটুকুর কারণ এই, যে রবিঠাকুরের সোনার তরী  নিয়ে কিছুদিন আগে এক বন্ধুর সাথে খানিকটা আলোচনা হয়েছিল। বন্ধুর মতে, কবিতাটি সমাজ কেমন করে একজন মানুষের অবদানটুকু গ্রহণ করে তাকে শূন্য করে ফেলে রেখে যায়, তা নিয়ে। মানুষের মাঝে মহীরুহসম রবীন্দ্রনাথ যে একাকীত্ব থেকে তেমনটা অনুভব করে লিখবেন, তা অস্বাভাবিক নয়। আমার অবশ্য কবিতাটির আক্ষরিক অর্থ করতে ইচ্ছে করে… এমন সুন্দর এই কবিতাটির মাঝে নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজতে চাওয়াটুকু কি খুব দোষের।

Although he writes his poems on his own, the poet holds ownership of the meaning only as long as the lines are kept away from the reader. The moment his work is read, that ownership is lost to others, who reflect themselves onto the lines to create new meanings without ever realizing what the poet had wanted to say. But then again, perhaps it is those inherent mutations which makes this world so rich with meaning… as a reader, do you feel the same way?

A few days ago, I was talking with a friend when our conversation meandered to Rabindranath Thakur’s Sonar Tori (The Golden Boat). My friend was of the opinion that the poem speaks of how society gladly accepts the contributions of man, but seldom the man who has emptied himself for her sake. Perhaps Rabindranath, the titan that he was among men, felt the loneliness that my friend inferred in his lines; after all, it was the sage himself who wrote –

The grass seeks her crowd in the earth
The tree seeks his solitude of the sky.
(Collected from Stray Birds)

Given my penchant for literal interpretations, however, I read the poem very differently – it is hard not to, when the interpretation falls so in line with feelings at this end.

English translations, the first by the Kabiguru himself, and a second by the eminent Bangla scholar William Radice, are included below.

সোনার তরী

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

      একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা–
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।

      গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে–
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।

ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।

      যত চাও তত লও তরণী-‘পরে।
আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে–
এখন আমারে লহ করুণা করে।

      ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি–
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সোনার তরী  হতে সংগ্রহীত)

Sonar Tori (The Golden Boat)
(Version 1: Translated by the poet himself, taken from The Fugitive)

The rain fell fast. The river rushed and hissed. It licked up and swallowed the island, while I waited alone on the lessening bank with my sheaves of corn in a heap.

From the shadows of the opposite shore the boat crosses with a woman at the helm.
I cry to her, ‘Come to my island coiled round with hungry water, and take away my year’s harvest.’

She comes, and takes all that I have to the last grain; I ask her to take me.
But she says, ‘No’-the boat is laden with my gift and no room is left for me.

(Version 2: Translated by William Radice)

Clouds rumbling in the sky; teeming rain.
I sit on the river bank, sad and alone.
The sheaves lie gathered, harvest has ended,
The river is swollen and fierce in its flow.
As we cut the paddy it started to rain.

One small paddy-field, no one but me –
Flood-waters twisting and swirling everywhere.
Trees on the far bank; smear shadows like ink
On a village painted on deep morning grey.
On this side a paddy-field, no one but me.

Who is this, steering close to the shore
Singing? I feel that she is someone I know.
The sails are filled wide, she gazes ahead,
Waves break helplessly against the boat each side.
I watch and feel I have seen her face before.

Oh to what foreign land do you sail?
Come to the bank and moor your boat for a while.
Go where you want to, give where you care to,
But come to the bank a moment, show your smile –
Take away my golden paddy when you sail.

Take it, take as much as you can load.
Is there more? No, none, I have put it aboard.
My intense labour here by the river –
I have parted with it all, layer upon layer;
Now take me as well, be kind, take me aboard.

No room, no room, the boat is too small.
Loaded with my gold paddy, the boat is full.
Across the rain-sky clouds heave to and fro,
On the bare river-bank, I remain alone –
What had has gone: the golden boat took all.

– Rabindranath Thakur