কবিতা ৫৯ – দেশলাইয়ের কাঠি / Poem 59 – Deshlai er Kathi (The Matchstick)

sukanta-bhattacharya-deshlaier-kathi-1

অনেকদিন পরে আবার সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতা –দেশলাইয়ের কাঠি। কবি সুকান্ত যে ব্যক্তিগত জীবনে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন, এই সাইটে আমি তা উল্লেখ করেছি আগেই। এই কবিতাটি লেখা সেই আদর্শ থেকেই – একটি আগুন নিয়ে, যা এই সমাজের ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা নিপীড়িতদের ভিতরে সম্ভাবনা হয়ে বেঁচে থাকে, আর যা একদিন বিপ্লব হয়ে হয়তো বদলে দেবে সারা পৃথিবীকেই।

After a long time, a poem by Sukanta Bhattacharya. Even for the most literally inclined of readers, the symbolism in Deshlai er Kathi (The Matchstick) is hard to miss – as I had mentioned earlier, Sukanta’s writings were heavily inspired by Communist ideas – in the poem, the poet speaks to the bourgeoisie and the elite of our society through a metaphor that is seemingly little and a mere convenience to most of us, but also one that holds the potential to burn the loftiest of palaces down to rubble. To some, it is literally a matchstick, but to others, it is the proletariat who rear a flame that can burn down the heirarchies of this world.

দেশলাইয়ের কাঠি

আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না;
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন –
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাত্‍‌
আমি একাই- ছোট্ট একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন-
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে–আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।
আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করেছো বারংবার;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে, গ্রামে– দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়-
তা তো তোমরা জানোই!
কিন্তু তোমরা তো জানো না:
কবে আমরা জ্বলে উঠব-
সবাই– শেষবারের মতো!

– সুকান্ত ভট্টাচার্য (ছাড়পত্র  হতে সংগ্রহীত)

Advertisements

কবিতা ৩৯ – ভেজাল / Poem 39 – Bhejal (Adulterated)

এ সাইটে সুকান্ত ভট্টাচার্যের লেখা তোলা হয়না অনেকদিন থেকেই, তাই আজ সেই বিরতিতে একটি ছেদ – ভেজাল  কবিতাটি বর্তমান বাঙ্গালী সমাজের এমনই নিখুঁত একটি প্রতিচ্ছবি যে সুকান্ত কবিতাটি আজ হতে সত্তর বছর আগে লিখেছিলেন তা কল্পনা করতেও অদ্ভূত লাগে। কবিতাটির প্রাসঙ্গিকতা সুকান্তের দূরদর্শীতাস্বরূপ, নাকি এই সত্তর বছরেও বাঙ্গালী সমাজের অসততা, দুর্নীতি আর নকলপ্রবণতা থেকে উঠে আসতে না পারার কারণে, তা জানিনা। তবে এটুকু জানি যে নিজের চারপাশটাকে যখন চেয়ে দেখি তখন এই কবিতাটি বড় সত্যি হয়ে ঠেকে। শুধু চারপাশ কেন, নিজেকে দেখলেও তো তাই। সেজন্যে আজকের দিনে দুটিকেই ব্যঙ্গ করে সুকান্তের এই কবিতাটি আজ তুলে দিলাম।

It has been a long time since I last put up a work by Sukanta Bhattacharya on this site, hence this post. Bhejal (Adulterated) is a poem that perfectly describes the dysfunction within the Bangalee society, and upon introspection, around perhaps all of us. Written about seventy years ago, the poem continues to be a condescending nod from Sukanta, and perhaps just as well – we really have not risen above corruption, dishonesty and shortchanging since he penned those words.

ভেজাল

ভেজাল, ভেজাল ভেজাল রে ভাই, ভেজাল সারা দেশটায়,
ভেজাল ছাড়া খাঁটি জিনিষ মিলবে নাকো চেষ্টায়!
ভেজাল তেল আর ভেজাল চাল, ভেজাল ঘি আর ময়দা,
`কৌন ছোড়ে গা ভেজাল ভেইয়া, ভেজালসে হ্যায় ফয়দা।’
ভেজাল পোশাক ভেজাল খাবার, ভেজাল লোকের ভাবনা,
ভেজালেরই রাজত্ব এ পাটনা থেকে পাবনা।
ভেজাল কথা— বাংলাতে ইংরেজী ভেজাল চলছে,
ভেজাল দেওয়া সত্যি কথা লোকেরা আজ বলছে।
`খাঁটি জিনিষ’ এই কথাটা রেখো না আর চিত্তে,
`ভেজাল’ নামটা খাঁটি কেবল আর সকলই মিথ্যে।
কলিতে ভাই `ভেজাল’ সত্য ভেজাল ছাড়া গতি নেই,
ছড়াটাতেও ভেজাল দিলাম, ভেজাল দিলে ক্ষতি নেই॥

– সুকান্ত ভট্টাচার্য

কবিতা ৭ – রানার / Poem 7 – Ranar (The Postal Runner)

Sukanta Bhattacharya-Runner

সুকান্তের আরেকটি অসাধারণ কবিতা – প্রতিনিয়ত সংগ্রামকারী মানুষদের বেদনার গল্প, একজন ডাক-হরকরার (ডাক বাহক) জীবনের একটি রাতের বর্ণনায়…

Another of Sukanta Bhattacharya’s intense portrayals – this time, of a night in the life of the ‘Ranar’. In British India, postal runners delivered mail from post offices to distant villages and small towns, often running mile after mile all night to their destination to ensure timely delivery. The work of the ‘Ranar’ was arduous and erosive to say the least, and in depicting a night in his life, Sukanta glorifies the pain and struggle which define the life of the proletariat everywhere and everywhen.

রানার

রানার ছুটেছে তাই ঝুম্‌ঝুম্ ঘন্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে,
রানার চলেছে, রানার !
রাত্রির পথে পথে চলে কোনো নিষেধ জানে না মানার ।
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে রানার-
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার ।

রানার ! রানার !
জানা-অজানার
বোঝা আজ তার কাঁধে,
বোঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে;
রানার চলেছে, বুঝি ভোর হয় হয়,
আরো জোরে, আরো জোরে হে রানার দু্র্বার দুর্জয় ।
তার জীবনের স্বপ্নের মতো পিছে সরে যায় বন,
আরো পথ, আরো পথ – বুঝি লাল হয় ও – পূর্ব কোণ ।
অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিট্‌মিট্ করে চায়;
কেমন ক’রে এ রানার সবেগে হরিণের মতো যায় !
কত গ্রাম, কত পথ যায় স’রে স’রে –
শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভোরে;
হাতে লন্ঠন করে ঠন্‌ঠন্, জোনাকিরা দেয় আলো
মাভৈঃ রানার ! এখনো রাতের কালো ।

এমনি ক’রেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বোঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘মেলে’ ।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে ।
অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে ।

রানার ! রানার !
এ বোঝা টানার দিন কবে শেষ হবে ?

রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে ?
ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালো ধোঁয়া,
পিঠেতে টাকার বোঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,
রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছোটে,
দস্যুর ভয়, তারো চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে ।
কত চিঠি লেখে লোকে –
কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শোকে ।
এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনো দিনও,
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,
এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,
এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালো রাত্রির খামে ।
দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি, –
এ-কে যে ভোরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি –
রানার ! রানার ! কি হবে এ বোঝা ব’য়ে ?
কি হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে ?
রানার ! রানার ! ভোর তো হয়েছে – আকাশ হয়েছে লাল
আলোর স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল ?

রানার ! গ্রামের রানার !
সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;
শপথের চিঠি নিয়ে চলো আজ
ভীরুতা পিছনে ফেলে –
পৌঁছে দাও এ নতুন খবর,
অগ্রগতির ‘মেলে’,
দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি –
নেই, দেরি নেই আর,
ছুটে চলো, ছুটে চলো আরো বেগে
দুর্দম, হে রানার ॥

– সুকান্ত ভট্টাচার্য

A crude translation of loosely strung lines from the poem by yours truly:

As he runs across fields, carrying messages written by loving hands to the hearts they own, his lonely lover surrenders herself to another sleepless night. She will never receive a letter from him, for he has sold all his nights to traverse horizons for the women who will, to never slow down and never look back – his pain forever enveloped in the dark… for he is the postal runner, the man who must defeat the Sun.

(ছবিতে রানারের প্রতিকৃতি একটি বাংলাদেশী ডাকটিকেট হতে সংগ্রহীত/Figure of the runner adopted from a Bangladeshi postage stamp.)

কবিতা ৪ – হে মহাজীবন / Poem 4 – Hey Mahajiban (O Great Life)

Sukanta Bhattacharya-He Mahajiban

সুকান্ত ভট্টাচার্য – বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা, অথচ অসাধারণ প্রতিভাবান এক কবি। মাত্র ২১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা এই কবি কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন, আর সেকারণেই তার অনেক কবিতায় দারিদ্রে নিপীড়িতদের যন্ত্রনার ছবি তুলে ধরেছিলেন তিনি। ‘হে মহাজীবন’ তেমনই একটি লেখা, যা দারিদ্র আর সাহিত্যকে এক সুতোয় বেঁধে তুলে নিয়েছে এক অবিস্মরণীয় কাব্যিক উচ্চতায়:

হে মহাজীবন

হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!

প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি।।

– সুকান্ত ভট্টাচার্য (ছাড়পত্র, ১৯৪৭)

Sukanta Bhattacharya (1926-1947) was a wonderfully talented poet from West Bengal, whose untimely death at a young age of 21 perhaps deprived our literature of many significant works. Yet, the few pieces he wrote during his short life were sufficient to carve a permanent place for him in the Bangla literary pantheon. A youth inspired by communist ideas, Sukanta depicted the dour life of the poor in his poems. Hey Mahajiban (O Great Life) is perhaps the most famous of those – one that ties poverty and poetry with a harshness that betrays his own perceived nature of the genre:

O Great Life
(A slightly modified version of a translation by Osman Gani)

O Great Life! No more of this Poetry,
Now bring the hard, harsh Prose,
Let the poetic-tender-chime dissolve,
Strike the tough hammer of Prose today!

(We) need not of the softness of Poetry–
Poetry, today I give you a break,
For in the realm of Hunger, the world is prosaic:
The Full Moon appears to be a scorched bread.

– Sukanta Bhattacharya (Chharpatra, 1947)