কবিতা ৫৩ – মানুষ / Poem 53 – Manush (Man)

Nazrul Islam-Manush

আজ নজরুলের একটি মানবতাবাদী কবিতা – মানুষ। আজকের এই সময়ে, যখন ধার্মিকেরা অধার্মিক আর রক্ষকেরা ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তখন কবিতাটির পংক্তিগুলো আরো বেশি সত্যি হয়ে উঠেছে, তাই আজ লেখাটি তুলে দেওয়া। মানুষ নজরুল রচনা করেছিলেন তাঁর সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে প্রতিবাদী পর্যায়ে, আর কবিতাটির পংক্তিগুলোতে তাই আমরা তাঁর অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরসোচ্চার ও আর মানবতাবাদের উপর অটল বিশ্বাসী রূপটিকে দেখতে পাই। সমাজের উচ্চবিত্ত আর ধর্মের বস্ত্রধারি শঠরা নজরুলের কলমের কাছে কখনোই ছাড় পায়নি – মানুষ  তারই একটি অগ্নিতুল্য নিদর্শন, আর তারই সাথে নজরুলের বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি – যে “মানুষের চেয়ে … নহে কিছু মহীয়ান”।

Today, a poem that is all thunder and rage at the hypocrisy of the rich and the pious, and fittingly, by that fireball of a man, the Rebel Poet, Nazrul Islam. Manush (Man) was written by Nazrul when he was at the boldest phase of his literary career, and in accordance, it seethes at the injustice that is meted out to the downtrodden of our society by the rich the the pious. At his most passionate, Nazrul spares not even the religious leaders, and justly so, as religion to them is merely a means to benefit from the oppressive status quo. In essence, however, Manush remains a humanist poem in which the poet finds the best of humanity, and depending on whom you  ask, God himself, in the hardworking poor among us.

মানুষ

গাহি সাম্যের গান–
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান ,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি ।
‘পুজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পুজার সময় হলো !’
স্বপ্ন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
দেবতার বরে আজ রাজা- টাজা হয়ে যাবে নিশ্চয় !
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনা তো সাত দিন !’
সহসা বন্ধ হল মন্দির , ভুখারী ফিরিয়া চলে
তিমির রাত্রি পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে !
ভুখারী ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পুজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয় !’
মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি !
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে-আজারির চিন্
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন !’
তেরিয়াঁ হইয়া হাঁকিল মোল্লা–”ভ্যালা হলো দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গে-ভাগাড়ে গিয়ে ! নামাজ পড়িস বেটা ?”
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা !’ মোল্লা হাঁকিল- ‘তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ !’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা !
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে–
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তেমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু !
তব মজসিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী !”
কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড় ;
ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া- দ্বার !
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায় কে দেয় সেখানে তালা ?
সব দ্বার এর খোলা র’বে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা !
হায় রে ভজনালয়
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয় !
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি
ও মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে ।
পুজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল !–মুর্খরা সব শোনো
মানুষ এনেছে গ্রন্থ,–গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো ।
আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এরা পিতা পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী করে প্রতি ধমনীতে বাজে !
আমরা তাঁদেরি সন্তান , জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ ।
হেস না বন্ধু ! আমার আমি সে কত অতল অসীম
আমিই কি জানি কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা ?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি ?
হয়তো উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি !
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ–দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজানালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয় !
হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
জন্মিছে কেহ-জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে !
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখেনি–হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে !
ও কে ? চন্ডাল ? চমকাও কেন ? নহে ও ঘৃণ্য জীব !
ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চন্ডাল, কাল হতে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী পাঠ ।
রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে !
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে !
চাষা বলে কর ঘৃণা !
দেখো চাষা রুপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না !
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারও ধরিল হাল
তারাই আনিল অমর বাণী–যা আছে র’বে চিরকাল ।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি !
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে
দ্বার দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলৈ ।
সে মোর রহিল জমা –
কে জানে তোমারে লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা !
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু’চোখ স্বার্থ ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলী ।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা মথিত সুধা
তাই লুটে তুমি খাবে পশু ? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা ?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনখানে !
তোমারি কামনা-রাণী
যুগে যুগে পশু ফেলেছে তোমায় মৃত্যু বিবরে টানি ।

– কাজী নজরুল ইসলাম

Advertisements

কবিতা ৪ – হে মহাজীবন / Poem 4 – Hey Mahajiban (O Great Life)

Sukanta Bhattacharya-He Mahajiban

সুকান্ত ভট্টাচার্য – বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা, অথচ অসাধারণ প্রতিভাবান এক কবি। মাত্র ২১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা এই কবি কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন, আর সেকারণেই তার অনেক কবিতায় দারিদ্রে নিপীড়িতদের যন্ত্রনার ছবি তুলে ধরেছিলেন তিনি। ‘হে মহাজীবন’ তেমনই একটি লেখা, যা দারিদ্র আর সাহিত্যকে এক সুতোয় বেঁধে তুলে নিয়েছে এক অবিস্মরণীয় কাব্যিক উচ্চতায়:

হে মহাজীবন

হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!

প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি।।

– সুকান্ত ভট্টাচার্য (ছাড়পত্র, ১৯৪৭)

Sukanta Bhattacharya (1926-1947) was a wonderfully talented poet from West Bengal, whose untimely death at a young age of 21 perhaps deprived our literature of many significant works. Yet, the few pieces he wrote during his short life were sufficient to carve a permanent place for him in the Bangla literary pantheon. A youth inspired by communist ideas, Sukanta depicted the dour life of the poor in his poems. Hey Mahajiban (O Great Life) is perhaps the most famous of those – one that ties poverty and poetry with a harshness that betrays his own perceived nature of the genre:

O Great Life
(A slightly modified version of a translation by Osman Gani)

O Great Life! No more of this Poetry,
Now bring the hard, harsh Prose,
Let the poetic-tender-chime dissolve,
Strike the tough hammer of Prose today!

(We) need not of the softness of Poetry–
Poetry, today I give you a break,
For in the realm of Hunger, the world is prosaic:
The Full Moon appears to be a scorched bread.

– Sukanta Bhattacharya (Chharpatra, 1947)