গান ৭৪ – বাড়ির কাছে আরশিনগর / Song 74 – Barir Kachhe Aarshinagar (City of Mirrors)

আজকের ভণিতার বিষয়টুকু বেশ জটিল। একই তত্ত্বের সাধক বা একই পথের যাত্রী যারা, তাদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব কিংবা রেষারেষি থাকবে, তা আশ্চর্য নয়, কিন্তু সম্পর্কটি যদি নারী ও পুরুষের মাঝে হয়? বিপরীত লিঙ্গের মধ্যেকার সহজাত আকর্ষণটুকু কি সেই সাধনা বা যাত্রাটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়, নাকি সেগুলোর অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়?

প্রশ্নগুলো করছি কারণ বাউলসম্রাট লালন সাঁইয়ের বাড়ির কাছে আরশিনগর  কবিতাটি পড়তে গিয়ে সেগুলো মনে এলো। বাউলদের আমরা সাধক বলে জানি, কিন্তু তাঁরা যে মানবিক প্রবৃত্তির প্রভাবগুলো হতে পুরোপুরি মুক্ত, তা কি সত্যি? লালন সাঁইয়ের ভাষায় –

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত, দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁকে রে।।

হয়তো আমাদের কেউই পুরোপুরি মুক্ত নই, কিংবা আমিই হয়তো আধ্যাত্মিক মিলনের আকাঙ্খাকে সাধারণ মানুষের আসক্তি ভেবে ভুল করছি। যাই হোক, ক্ষুদ্র মনের অনুধাবনের বাইরের প্রশ্নগুলি বাউলসম্রাটের কবিতাটিসহ পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে, এই আশায় তুলে দিলাম।

A few questions for my readers today: In our pursuits of divine truths or higher goals, how do our relationships with fellow pursuers of the opposite gender matter? Does the sexuality that is entwined with gender intensify the camaraderie (or competition) between travelers on the same path? And does it influence, or perhaps taint, the very pursuit itself?

I write the questions because reading Lalon Sain’s Barir Kachhe Aarshinagar (City of Mirrors) made me think of those. Quoting from the source of the translation:

Bauls hold women in high esteem. They are essential to the male practitioner’s success in sadhana. This is one of Lalon’s many songs that secretly refer to the sadhika (female practitioner) or to the sahaj manus (natural person) within her.

Yet to me, the explanation seems to merely be a summarization of something more profound. Perhaps you know what I mean? The questions asked are far from simple, and a discussion of those require more than a blog post, and more than a knowledge of literature. So let me leave those for your weekend tea-parties – you will need more than a cup, I am sure :).

A translation of the poem by the Bangla scholar, Dr. Carol Salomon, is provided below.

বাড়ির কাছে আরশিনগর

বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শি বসত করে।
আমি একদিন না দেখিলাম তারে।।
গিরাম বেড়ে অগাধ পানি
ও তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে
মনে বাঞ্ছা করি দেখব তারে
কেমনে সে গাঁয় যাই রে।।
বলবো কী সেই পড়শির কথা
ও তার হস্তপদ স্কন্ধমাথা, নাই রে
ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর
ক্ষণেক ভাসে নীরে।।
পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত, দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁকে রে।।

– লালন সাঁই

Barir Kachhe Aarshinagar (The City of Mirrors)
(Translated by Carol Salomon)

I have not seen her even once–
my neighbor
who lives in the city of mirrors
near my house.
Her village is surrounded
by deep boundless waters,
and I have no boat
to cross over.
I long to see her,
but how can I reach
her village?
What can I say
about my neighbor?
She has no hands, no feet,
no shoulders, no head.
Sometimes she floats high up in the sky,
sometimes in the water.
If my neighbor only touched me,
she would send the pain of death away.
She and Lalon are in the same place,
yet five hundred thousand miles apart.

– Lalon Sain

Advertisements

কবিতা ৫৮ – জন্মকথা / Poem 58 – Janmokatha (The Beginning)

Rabindranath Thakur-Khoka Ma ke Shudhay (3)

প্রতিটি শিশুর মনে কখনো না কখনো জাগা একটি প্রশ্ন, আর তার উত্তরে কিছু কথা, যা হয়তোবা প্রতিটি নারীরই মাতৃত্ব আর ভালবাসার পূর্ণতম বহিঃপ্রকাশ। জন্মকথা য় শিশুর প্রতি মায়ের আবেগ আর স্নেহ এত আর্দ্রভাবে ফুটে উঠেছে, যে কবিতাটি যে একজন পুরুষের লেখা তা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ হয়তো রবীন্দ্রনাথ, আর বাঙ্গালী হিসেবে আমরা ভাগ্যবান, সেকারণেই। আমাদের মধ্যে সুপ্ত কিংবা প্রষ্ফুটিত মা ও শিশু যারা, তাদের মনে করে আজ প্রিয় এই কবিতাটি তুলে দিলাম।

“Where did I come from?” is perhaps the one question that every child asks its parent(s) one day. In Janmokatha (The Beginning), Rabindranath Thakur answers it with such familiarity and tenderness that it seems hard to believe that the poem was written by a man. But the poem is more than a due testament to Thakur’s genius – in its beautiful, innocent, soft and sacred portrayal of motherhood, it is a perfect celebration of the relationship between a mother and her child. Life, in its own ways, leaves many of us unable to grasp the poem in its entirety, but if you are a mother or will ever be one, this one is for your heart. A translation by the poet himself is also provided below.

জন্মকথা

খোকা মাকে শুধায় ডেকে–
“এলেম আমি কোথা থেকে,
কোন্‌খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।’
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে
খোকারে তার বুক বেঁধে–
“ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।
ছিলি আমার পুতুল-খেলায়,
প্রভাতে শিবপূজার বেলায়
তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি।
তুই আমার ঠাকুরের সনে
ছিলি পূজার সিংহাসনে,
তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।
আমার চিরকালের আশায়,
আমার সকল ভালোবাসায়,
আমার মায়ের দিদিমায়ের পরানে–
পুরানো এই মোদের ঘরে
গৃহদেবীর কোলের ‘পরে
কতকাল যে লুকিয়ে ছিলি কে জানে।
যৌবনেতে যখন হিয়া
উঠেছিল প্রস্ফুটিয়া,
তুই ছিলি সৌরভের মতো মিলায়ে,
আমার তরুণ অঙ্গে অঙ্গে
জড়িয়ে ছিলি সঙ্গে সঙ্গে
তোর লাবণ্য কোমলতা বিলায়ে।
সব দেবতার আদরের ধন
নিত্যকালের তুই পুরাতন,
তুই প্রভাতের আলোর সমবয়সী–
তুই জগতের স্বপ্ন হতে
এসেছিস আনন্দ-স্রোতে
নূতন হয়ে আমার বুকে বিলসি।
নির্নিমেষে তোমায় হেরে
তোর রহস্য বুঝি নে রে,
সবার ছিলি আমার হলি কেমনে।
ওই দেহে এই দেহ চুমি
মায়ের খোকা হয়ে তুমি
মধুর হেসে দেখা দিলে ভুবনে।
হারাই হারাই ভয়ে গো তাই
বুকে চেপে রাখতে যে চাই,
কেঁদে মরি একটু সরে দাঁড়ালে।
জানি না কোন্‌ মায়ায় ফেঁদে
বিশ্বের ধন রাখব বেঁধে
আমার এ ক্ষীণ বাহু দুটির আড়ালে।’

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু হতে সংগ্রহীত)

Janmokatha (The Beginning)
Translated by the poet himself

‘Where have I come from, where did you pick me up?’ the baby asked its mother.
She answered half crying, half laughing, and clasping the baby to her breast,-
‘You were hidden in my heart as its desire, my darling.
You were in the dolls of my childhood’s games; and when with clay
I made the image of my god every morning, I made and unmade you then.
You were enshrined with our household deity, in his worship I worshipped you.
In all my hopes and my loves, in my life, in the life of my mother you have lived.
In the lap of the deathless Spirit who rules our home you have been nursed for ages.
When in girlhood my heart was opening its petals, you hovered as
a fragrance about it
Your tender softness bloomed in my youthful limbs, like a glow in
the sky before the sunrise.
Heaven’s first darling, twin-born with the morning light, you have floated
down the stream of the world’s life, and at last you have stranded on my heart.
As I gaze on your face, mystery overwhelms me; you who belong to
all have become mine.
For fear of losing you I hold you tight to my breast.
What magic has snared the world’s treasure in these slender arms of mine?’

– Rabindranath Thakur (Collected from The Crescent Moon)

ছোটগল্প ৮০ – নিমগাছ / Short Story 80 – Neemgachh (The Neem Tree)

Banaful-Neem Gachh 2

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Banaful-Neem Gachh

নিমগাছ – বনফুল

এবার বাংলার চিরঅবহেলিত নারীদের নিয়ে লেখা একটি গল্প, বনফুলের কলমে। গল্পটি পিডিএফের সাথে সাথে এই পৃষ্ঠাতেও তুলে দিলাম।

Neemgachh (The Neem Tree) – Banaful

This time, a metaphorical representation of the neglected women of Bengal, by Banaful.

কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে।
পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ।
কেউ বা ভাজছে গরম তেলে।
খোস দাদ হাজা চুলকুনিতে লাগাবে।
চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ।
কচি পাতাগুলো খায়ও অনেকে।
এমনি কাঁচাই…..

কিংবা ভেজে বেগুন- সহযোগে।
যকৃতের পক্ষে ভারী উপকার।
কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক…। দাঁত ভালো থাকে।
কবিরাজরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ।
বাড়ির পাশে গজালে বিজ্ঞরা খুসী হন।
বলেন-”নিমের হওয়া ভাল, থাক, কেটো না।”
কাটে না, কিন্তু যত্নও করে না।
আবর্জনা জমে এসে চারিদিকে।
শান দিয়ে বাধিয়েও দেয় কেউ- সে আর এক আবর্জনা।
হঠাৎ একদিন একটা নূতন ধরণের লোক এল।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে বেয়ে রইল নিমগাছের দিকে। ছাল তুললে না, পাতা ছিঁড়লে না, ডাল ভাঙ্গলে না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল শুধু।
বলে উঠলো, “বাঃ কি সুন্দর পাতাগুলো…..কি রূপ। থোকা থোকা ফুলেরই বা কি বাহার….এক ঝাঁক নক্ষত্র নেমে এসেছে যেন নীল আকাশ থেকে সবুজ সায়রে। বাঃ–”
খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে চলে গেল।`
কবিরাজ নয়, কবি।
নিমগাছটার ইচ্ছে করতে লাগল লোকটার সঙ্গে চলে যায়। কিন্তু পারলে না।মাটির ভেতর শিকড় অনেক দূরে চলে গেছে। বাড়ির পিছনে আবর্জনার স্তূপের মধ্যেই দাঁড়িয়ে রইল সে।
ওদের বাড়ীর গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্ণী বউটার ঠিক এই দশা।

ছোটগল্প ৭৩ – বর্ণে বর্ণে / Short Story 73 – Barne Barne (The Choice of Color)

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Banaful-Barne Barne

বর্ণে বর্ণে – বনফুল

বাঙ্গালী সমাজের নির্মম অবিচারের একটি গল্প – দুটি আলাদা দৃশ্যে বাঙ্গালী ভদ্রলোকদের রঙের বিচারের মাধ্যমে – গল্পটি বনফুল লিখেছিলেন অনেক আগে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে গল্পটির চরিত্রগুলো আজও আমাদের সমাজে বর্তমান।

Barne Barne (The Choice of Color) – Banaful

In this story, Banaful portrays a cancer of Bangalee society, through narrations of two situations where Bangalee gentlemen base their choice on colour.

ছোটগল্প ৫৭ – ছুড়িটা / Short Story 57 – Chhurita (The Girl)

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Banaful-Chhurita

ছুড়িটা – বনফুল

“মনে হয় তার নাম যে অপ্সরী ছিল একথা কি কেউ বিশ্বাস করবে আজকাল? স্কুলে কিন্তু তার ওই নামই লেখা আছে এখনও। সে স্কুলে ভাল মেয়ে ছিল, ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছিল। তারপর হঠাৎ একদিন হেডমিস্ট্রেস তার নামটা কেটে দিলেন। বললেন, তুমি বাড়ি যাও, এ স্কুলে তোমাকে পড়তে হবে না। সে বাড়ি চলে গেল, মাকে জিজ্ঞাসা করল, কেন তাকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিল। মা উত্তর দিল না। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললে – কি হবে স্কুলে পড়ে, তোমার পড়ার খরচ আমি টানতে পারব না। আর পড়েই বা হবে কি? শেষকালে গতর বেচেই তো খেতে হবে।

… তার বাবার কথা মনে পড়ে তখন। তার বাবা একদিন দিল্লী চলে গেল। বলে গেল সেখানে নাকি একটা ভাল কাজ পেয়েছে। দিন কতক পরে ফিরে এসে সবাইকে নিয়ে যাবে। কিন্তু বাবা আর ফেরেনি। মাকে চিঠি দিয়েছিল একটা। পঞ্চাশটা টাকাও পাঠিয়েছিল মনি-অর্ডার করে। মা সে টাকা ফেরত দিয়েছিল।”

একজন নারীর প্রতি সমাজের চরম অবিচার আর ভদ্রলোকদের কপটতার গল্প – বনফুলের কলমে।

Chhurita (The Girl) – Banaful

The story of a wronged woman in any developing society, and the hypocrisy of those who call themselves gentleman – in Banaful’s words.