কবিতা ৮৪ – পাছে লোকে কিছু বলে / Poem 84 – Pachhe Loke Kichhu Bole (Lest They Say Something)

আমাদের সমাজব্যবস্থার যা ধরণ, তাতে যে নারীরা প্রতিনিয়ত কত অযাচিত আর ব্যাখ্যাহীন বাঁধার শিকার হন, তা আমরা অনেকেই খেয়াল করিনা। বিশেষ করে চিরকাল যারা সামাজিক কাঠামোর সুবিধাটুকু পেতে অভ্যস্ত, সেই পুরুষরা তো অনেক সময় এই অসমতাটুকু স্বীকারই করতে চান না। কিন্তু লোকলজ্জার প্রচ্ছন্ন চাপ যে এই সমাজে বেড়ে ওঠা নারীদের ইচ্ছে, ভাবনা আর সৃষ্টিশীলতাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দেয়, নারীর চাইতে এই কথাটি আর কে ভাল জানে?

প্রায় এক শতাব্দী আগে কামিনী রায়, যিনি একাধারে একজন প্রথিতযশা বাঙালি কবি, উনবিংশ-শতাব্দীর ঔপনিবেশিক ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক, এবং বাঙালি নারীবাদের একজন পথিকৃৎ, গুটিয়ে যাওয়ার সেই অনূভুতিটিকু তাঁর পাছে লোকে কিছু বলে কবিতাটিতে ব্যক্ত করেছিলেন। আমাদের দুর্ভাগ্য, যে এতদিন পেরিয়ে গেলেও কবিতাটি প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে। তাই কামিনী রায় যা বলতে চেয়েছিলেন, সে কথাটুকু আরেকবার আমাদেরকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যে কবিতাটি তুলে দেওয়া।

To be a woman any society means facing undue restrictions, stigma and setbacks at every stage of life. Men, who in many ways benefit from social structures, often do not understand how such things stifle the creativity, desires and endeavors of women – being different means that perhaps they never fully will. To those with heart, however, Kamini Roy’s Pachhe Loke Kichhu Bole (Lest They Say Something) poignantly narrates how fear of breaking social norms and glass ceilings stop women from realizing their potential. Roy, who was a pathbreaking feminist, poet and the first female graduate with honors in British-occupied India, wrote this poem about a century ago. Unfortunately, much of her feeling as a woman unduly restrained by society is still felt by women today, and shows how far we still have to go.

পাছে লোকে কিছু বলে

করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে –
পাছে লোকে কিছু বলে।

আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।

হৃদয়ে বুদবুদ মত
উঠে চিন্তা শুভ্র কত,
মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি
সযতনে শুকায়ে রাখি;-
নিরমল নয়নের জলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা –
চলে যাই উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

মহৎ উদ্দেশ্য যবে,
এক সাথে মিলে সবে,
পারি না মিলিতে সেই দলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

বিধাতা দেছেন প্রাণ
থাকি সদা ম্রিয়মাণ;
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

– কামিনী রায়

কবিতা ৫৯ – দেশলাইয়ের কাঠি / Poem 59 – Deshlai er Kathi (The Matchstick)

sukanta-bhattacharya-deshlaier-kathi-1

অনেকদিন পরে আবার সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতা –দেশলাইয়ের কাঠি। কবি সুকান্ত যে ব্যক্তিগত জীবনে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন, এই সাইটে আমি তা উল্লেখ করেছি আগেই। এই কবিতাটি লেখা সেই আদর্শ থেকেই – একটি আগুন নিয়ে, যা এই সমাজের ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা নিপীড়িতদের ভিতরে সম্ভাবনা হয়ে বেঁচে থাকে, আর যা একদিন বিপ্লব হয়ে হয়তো বদলে দেবে সারা পৃথিবীকেই।

After a long time, a poem by Sukanta Bhattacharya. Even for the most literally inclined of readers, the symbolism in Deshlai er Kathi (The Matchstick) is hard to miss – as I had mentioned earlier, Sukanta’s writings were heavily inspired by Communist ideas – in the poem, the poet speaks to the bourgeoisie and the elite of our society through a metaphor that is seemingly little and a mere convenience to most of us, but also one that holds the potential to burn the loftiest of palaces down to rubble. To some, it is literally a matchstick, but to others, it is the proletariat who rear a flame that can burn down the heirarchies of this world.

দেশলাইয়ের কাঠি

আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না;
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন –
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাত্‍‌
আমি একাই- ছোট্ট একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন-
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে–আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।
আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করেছো বারংবার;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে, গ্রামে– দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়-
তা তো তোমরা জানোই!
কিন্তু তোমরা তো জানো না:
কবে আমরা জ্বলে উঠব-
সবাই– শেষবারের মতো!

– সুকান্ত ভট্টাচার্য (ছাড়পত্র  হতে সংগ্রহীত)