গল্প ৮৮ – ইছামতি / Story 88 – Ichamati

Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Ichamati 2

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Ichamati

ইছামতি – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কিছুদিন আগে এই সাইটে বিভূতিভূষণের গল্পগুলোতে “সময়ের শান্ত স্রোতে (চরিত্রদের জীবন) ধীরে ধীরে একটি নিরুদ্বেগ অবধারিতের” দিকে প্রবাহিত হওয়া নিয়ে লিখেছিলাম। সে সময় আলোচ্য লেখাটি ছিল আরণ্যক ইছামতি  উপন্যাসটিও সেক্ষেত্রে অনেকটা আরণ্যকের মতই, তবে এই গল্পটির পটভূমি বিহার নয়, বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে গেছে যে ইছামতি নদী, তারই ধারের পাঁচপোতা নামের একটি গ্রাম। অবিভক্ত ভারত তখনো ব্রিটিশদের দখলে, আর মোল্লাহাটির নীলকুঠির অবস্থাও তখন রমরমা। কুঠির দেওয়ান কুলীন ব্রাহ্মন রাজারাম রায়, যার প্রতাপে সারা গ্রাম তটস্থ থাকে। গল্পের শুরুতে রাজারামের তিন বোন তিলু, বিলু আর নিলুর বিয়ে হয় গ্রামে ঘুরতে আসা ভবানী বাড়ুয্যে নামের আরেকজন কুলীনের সাথে। আর যদিও বিভূতিভূষণের এই উপন্যাসটি বিশেষ কোন চরিত্রকে নিয়ে লেখা নয়, গল্পের পরবর্তীটুকুতে মূলত ভবানী ও তার স্ত্রীদের চোখ দিয়েই গ্রামটির সাথে ধীরে ধীরে আমাদের পরিচয় ঘটে।

ইছামতি  উপন্যাসটি যে সময়ের উপর ভিত্তি করে লেখা, তখন নদীপাড়ের জনপদগুলি সেকেলে বাঙ্গালী সমাজের মতই গোঁড়ামী আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। জাতপ্রথা আর নারীর অবদমন থেকে শুরু করে ভারতীয় সমাজের বৃটিশ-আরাধনা আর দুর্বলদের উপর নিপীড়ন – এর সবই উপন্যাসটিতে আমরা দেখি, কিন্তু তা সমালোচকের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং যেন পাঁচপোতার একটি নিতান্তই মানবিক দিনলিপির মাধ্যমে। গ্রামের বুড়ো ব্রাহ্মণদের পরনিন্দা-পরচর্চা, নীলকুঠির কর্মচারীদের দাদাগিরী, আর গ্রাম্যবধূদের গল্প – এসমস্ত রোজনামচার মধ্যে দিয়েই গল্পটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। অথচ তারই মধ্যে তিলুরা ঘোমটা ছাড়া রাস্তায় চলতে শেখে, গ্রামের ছেলেরা এক এক করে কলকাতায় পাড়ি জমায়, আর সাহেবদের সেই নীলকুঠি কিনে নেয় গ্রামেরই এক লালমোহন পাল, যে কম বয়সে কুঠির সাহেব মালিককে দেখে চাবুকের বাড়ি খাওয়ার ভয়ে রাস্তার উপর নিজের সওদাপাতি ফেলে পালিয়েছিল। শ্বাশত আর পরিবর্তনের মাঝে ভারসাম্য রেখে চলা সে অদৃশ্য ধারার গভীর সৌন্দর্যকে বিভূতিভূষণ যেন ইছামতির মাঝেই খুঁজে পান –

কত তরুণী সুন্দরী বধূর পায়ের চিহ্ন পড়ে নদীর দু’ধারে, ঘাটের পথে, আবার কত প্রৌঢ়া বৃদ্ধার পায়ের দাগ মিলিয়ে যায়… গ্রামে গ্রামে মঙ্গলশঙ্খের আনন্দধ্বনি বেজে ওঠে বিয়েতে, অন্নপ্রাশনে, উপনয়নে, দূর্গাপূজোয়, লক্ষীপূজোয়… সে সব বধূদের পায়ের আলতা ধুয়ে যায় কালে কালে, ধূপের ধোঁয়া ক্ষীণ হয়ে আসে… মৃত্যুকে কে চিনতে পারে? গরীয়সী মৃত্যু-মাতাকে? পথপ্রদর্শক মায়ামৃগের মতো জীবনের পথে পথে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে সে, অপূর্ব রহস্যভরা তার অবগুন্ঠন কখনো খোলে শিশুর কাছে, কখনো বৃদ্ধের কাছে… তেলাকুচো ফুলের দুলুনিতে অনন্ত সে সুর কানে আসে… কানে আসে বনৌষধির কটুতিক্ত সুঘ্রাণে, প্রথম হেমন্তে বা শেষ শরতে। বর্ষার দিনে এই ইছামতির কূলে কূলে ভরা ঢলঢল রূপে সেই অজানা মহাসমুদ্রের তীরহীন অসীমতার স্বপ্ন দেখতে পায় কেউ কেউ… কত যাওয়া আসার অতীত ইতিহাস মাখানো ঐ সব মাঠ, ঐ সব নির্জন মাঠের ঢিপি – কত লুপ্ত হয়ে যাওয়া মায়ের হাসি ওতে অদৃশ্য রেখায় আঁকা। আকাশের প্রথম তারাটি তার খবর রাখে হয়তো…

বিভূতিভূষণ ইছামতি লেখার পর সময়ের সাথে সাথে নদীপাড়ের গ্রামগুলি বদলে গেছে অনেক। তবে গ্রামীণ বাংলার যা কিছু চিরন্তন, তাতো আর বদলায়নি, মঙ্গলশঙ্খের আনন্দধ্বনি সময়ে সময়ে নদীপারের গ্রামগুলোতে বেজে ওঠে আজও, রূপসী বধূদের পদচিহ্ন এখনো নদীপারে খানিক্ষণের জন্যে আঁকা হয়ে মুছে যায়। সে মনে করেই বাংলার নদীপাড়ের মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর ভালবাসা নিয়ে বিভূতিভূষণের লেখা এই উপন্যাসটি আজ পাঠকদের জন্যে তুলে দিলাম।

Ichamati – Bibhutibhushan Bandyopadhyay

Following Aranyak, another of Bibhutibhushan Bandyopadhyay’s novels: Ichamati is a narrative of the life along the banks of a river of the same name.  In the early 20th Century, when the subcontinent was under British occupation and indigo plantations were strewn across the undivided Bangla, a plantation by a certain Panchpota village on the river was in its heyday. The owners of that plantation were Englishmen, but their power was wielded through Bangalees who commanded subservience across the entire region. Rajaram, the dewan (secretary) of the plantation, had married off his three sisters to a former ascetic, Bhavani Bandyopadhyay, and it is the latter’s polygynous yet happy family around which the novel develops. Like any other rural Bangalee community of the time, Panchpota was not without its share of superstition, wrongs and biases – but instead of being condemned in Ichamati, those are humanised through the characters. In the novel, the anticipating reader finds the usual village folk who do their usual work – hypocritical, elderly Brahman’s who only gossip idly and criticize others, the hired goons of the plantation who grab land, and the ‘off-the-rocker’ housewife who would say things no one would (or could). Yet, around the daily routines of these people occur silent but subversive changes – Bhavani’s wives learn to walk in public without a veil, and the boys of the village go off to Kolkata to work, one by one… even the ownership of the plantation shifts to a local man. Such changes continue to shape the Indian subcontinent even today. So in that sense, Ichamati helps us understand every Bangalee village then and now. But with its heart-softening narrative of the lives along the river bank, it also offers more than an analytical window into rural Bangla, it teaches us to love her.

Advertisements

ছোটগল্প ৮৩ – বিলু ও তার মৌমাছি / Short Story 83 – Bilu O Tar Moumachhi (Bilu and his Bees)

Jafar Iqbal-Bilu O Tar Moumachhi

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Jafar Iqbal-Bilu O Tar Moumachhi

বিলু ও তার মৌমাছি – জাফর ইকবাল (আমড়া ও ক্র্যাব নেবুলা হতে সংগ্রহিত)

জাফর ইকবালের এই গল্পটি সাহিত্য হিসেবে যে অসাধারণ, তা হয়ত বলা যাবে না। কিন্তু সাদামাটা ভাষায় লেখা এই মজার ছোটগল্পটি আমার হৃদয়ের খুব কাছের, কারণ সেটির অনেকটুকুই আমার চিন্তাভাবনার সাথে মিলে যায়। খানিকটা তুলে দেই –

রনির ব্যাপারটা একেবারে মাত্রা ছাড়িয়ে গেল সেইদিন বিকেলে। স্কুল শেষ করে বাবার সাথে মৌমাছি ফার্মে খানিকক্ষণ কাজ করে নদীতীরে খেলতে গিয়ে দেখে সেখানে কয়েকজন মানুষ গর্ত করে বাঁশ পুঁতছে। রনি পকেটে হাত দিয়ে কাছে দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হয় কাজের খবরদারি করছে। বিলু অবাক হয়ে কাছে এগিয়ে গেল। রনি এমন ভান করল সে তাকে দেখতেই পায়নি। যে মানুষগুলো বাঁশ পুঁতছে তাদের একজনের না কাজেম আলি, সে বিলুকে দেখে দাঁত বের করে হেসে বলল, বিলু বাজান কেমুন আছেন?

বিলু বলল, ভালো। তারপর জিজ্ঞাসা করল, কাজেম চাচা এখানে কি করছেন?

কিলাব হাউচ তৈরী হচ্ছে।

ক্লাব হাউজ?

জে। বাঁশ পুঁতে উঁচু ঘর তৈরি হবে। সেটারে বলে কিলাব হাউচ।

এইখানে?

জে।

বিলু গলা শক্ত করে বলল, এইখানে আমরা হা-ডু-ডু খেলি।

রনি তখন কাছে এসে কাজেম আলিকে বলল, কথা বলছ কেন? কাজ কর, কালকের মাঝে শেষ করতে হবে।

কাজেম আলি মাথা নেড়ে বলল, জে জে করছি। তারপর খন্তা দিয়ে মাটিতে গর্ত করতে শুরু করল।

বিলুর মাথায় রক্ত উঠে গেল। সে চোখ পাকিয়ে বলল, এখানে কিছু তৈরী করতে পারবে না। এইখানে আমরা খেলি।

রনি হাত ভাজ করে বুকের উপর ধরে বলল, এটা আমার নানার প্রপার্টি – এখান থেকে যাও, না হলে তোমার ঘাড় ধরে বের করে দেব।

কাজেম আলি তাড়াতাড়ি রনির কাছে এসে বলল, এইভাবে কথা বলে না ছোট সাহেব। ডাক্তার সাহেবের ছেলে –

রনি বলল – আই ডোন্ট কেয়ার। আমার নানার প্রপার্টিতে আমি যা ইচ্ছে তাই করব, আমার ইচ্ছা।

পরদিন ফারুখ খবর আনল ‘কিলাম হাউচ’ নাকি প্রায় দাঁড়া হয়ে গেছে। ব্যাপারটা একটা মাচা ছাড়া আর কিছু নয়। দুপুরবেলা নান্টু খবর আনল ‘কিলাম হাউচে’ রনি আর তার ছোট বোন বসে বসে রুটি খাচ্ছে। বাড়াবাড়ি বড়লোকেরা দুপুরবেলায় রুটি খায়। ঢাকা থেকে সেই রুটি আনা হয়েছে। বিকালবেলা জলিল সবচেয়ে বড় খবর আনল, আগামীকাল শহর থেকে রনির বন্ধুরা আসছে – তারা কখনো গ্রাম দেখে নাই, তাই গ্রাম দেখতে আসছে।

আধা-খেঁচড়া ভাবে পশ্চিমা শিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে অশিক্ষিত হওয়াটাই যেখানে এখন রেওয়াজ হয়ে গেছে, সেখানে জাফর ইকবালের এই গল্পটি বাঙ্গালীরা আজো পড়ে ভেবে মনে খানিকটা আশা জাগে। সত্যি বলতে কি, হয়তো আমিও এককালে রনিদের দলেই ছিলাম, কিন্তু এখন মনটা ভালর দিকে বদলে গেছে ভাবতে ইচ্ছে হয়। তাই এই গল্প।

Bilu O Tar Moumachhi (Bilu and his Bees) – Jafar Iqbal (from Amra O Crab Nebula)

A story close to my heart, Bilu O Tar Moumachhi (Bilu and his Bees) is one about the triumph of the ‘raw, Bangalee village boy’ over the ‘condescending wannabe western city-kid’. As a piece of literature, the story perhaps leans on simple stereotypes, but in this case, at least the second stereotypes are perhaps too correct to be ignored. Being a Bangladeshi who has spent a considerable time of his life as a scientist in the US, Zafar Iqbal has perhaps known people of both types too well, and if this story is a representation of his views, I am glad to say that they mirror mine.