কবিতা ৬৩ – স্বপ্ন / Poem 63 – Swapna (The Dream)

rabindranath-thakur-swapna-1

আজ পাঠকদের ফেলে আসা রাত্রিগুলোকে মনে করিয়ে দেওয়ার মত একটি কবিতা – রবিঠাকুরের কলমে – দূরত্ব, ভালবাসা, আর তা হতে জন্ম নেওয়া স্বপ্নগুলোকে নিয়ে।

Today, a poem that will perhaps stir memories of nights past – written by the Rabindranath Thakur, Swapna (The Dream) is an achingly beautiful poem about dreams that are born out of love and separation.

স্বপ্ন

কাল রাতে দেখিনু স্বপন–
দেবতা-আশিস-সম     শিয়রে সে বসি মম
মুখে রাখি করুণনয়ন
কোমল অঙ্গুলি শিরে     বুলাইছে ধীরে ধীরে
সুধামাখা প্রিয়-পরশন–
কাল রাতে হেরিনু স্বপন।
হেরি সেই মুখপানে     বেদনা ভরিল প্রাণে
দুই চক্ষু জলে ছলছলি–
বুকভরা অভিমান     আলোড়িয়া মর্মস্থান
কণ্ঠে যেন উঠিল উছলি।
সে শুধু আকুল চোখে     নীরবে গভীর শোকে
শুধাইল, “কী হয়েছে তোর?”
কী বলিতে গিয়ে প্রাণ     ফেটে হল শতখান,
তখনি ভাঙিল ঘুমঘোর।
অন্ধকার নিশীথিনী     ঘুমাইছে একাকিনী,
অরণ্যে উঠিছে ঝিল্লিস্বর,
বাতায়নে ধ্রুবতারা     চেয়ে আছে নিদ্রাহারা–
নতনেত্রে গণিছে প্রহর।
দীপ-নির্বাপিত ঘরে     শুয়ে শূন্য শয্যা-‘পরে
ভাবিতে লাগিনু কতক্ষণ–
শিথানে মাথাটি থুয়ে     সেও একা শুয়ে শুয়ে
কী জানি কী হেরিছে স্বপন
দ্বিপ্রহরা যামিনী যখন।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (চৈতালি হতে সংগ্রহীত)

Swapna (The Dream)
(Translated by the poet himself)

I dreamt that she sat by my head,
tenderly ruffling my hair with her fingers,
playing the melody of her touch.
I looked at her face and struggled with my tears,
till the agony of unspoken words burst my sleep like a bubble.

I sat up and saw the glow of the milky way
above my window, like a world of silence on fire,
and I wondered if at this moment
she had a dream that rhymed with mine.

– Rabindranath Thakur (Collected from Chaitali)

 

কবিতা ৫০ – আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই / Poem 50 – Amar Gharete Aar Nai She Je Nai (Brink of Eternity)

Rabindranath Thakur-Amar Gharete Ar Nai

আজ পাঠকদের জন্যে নীলচে একটি কবিতা। হারানো কোন প্রিয়জনকে নিয়ে বিরহ, আর তাঁকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্খা যে কতটুকু তীব্র হতে পারে, রবীন্দ্রনাথের আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই  কবিতাটিতে তা ব্যাকুলরূপে প্রতিমূর্ত হয়ে উঠেছে। স্থান ও কালের যে অসীমতাকে আমরা ঈশ্বরের একটি রূপ বলে জানি, বিলীন হয়ে যাওয়া সমস্ত কিছুর ঠাঁই তো তারই মাঝে হয়। প্রিয়জনের খোঁজে ক্লান্ত আর পরাজিত মনটির যদি ঈশ্বরের কাছে শেষ আর্তি বলে কিছু থেকে থাকে, তবে তা সেই অসীমতায় হারিয়ে গিয়ে সেই হারানো জনের সাথে একাকার হয়ে যেতে চাওয়া ছাড়া আর কি হতে পারে? পাঠকদের মাঝে যদি কেউ প্রবল আবেগ দিয়ে কাউকে ভালবেসে থাকেন, তিনি জানবেন হয়তো।

Today, a heartbreakingly beautiful poem for your contemplation: in Amar Gharete Aar Nai She Je Nai (Brink of Eternity), Rabindranath Thakur inks his longing for a beloved someone into lines so profound that they leave us awestruck at the infinitude of Creation and the intensity of human feeling. Yearning for someone he has lost, Thakur knows that his search for her is only in vain, so standing on the brink of the Eternal and the Infinite – where all that was exists forever – he tearfully asks God to immerse him in that eternity… wishing nothing more than to feel, for once, her “lost sweet touch in the allness of the Universe”.

Finding words that give voice to a overwhelming love and longing may give solace to those who know the feeling. If you have ever felt anything close, this poem is for you.

আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই

আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই–
যাই আর ফিরে আসি, খুঁজিয়া না পাই।
আমার ঘরেতে নাথ, এইটুকু স্থান–
সেথা হতে যা হারায় মেলে না সন্ধান।
অনন্ত তোমার গৃহ, বিশ্বময় ধাম,
হে নাথ, খুঁজিতে তারে সেথা আসিলাম।
দাঁড়ালেম তব সন্ধ্যা-গগনের তলে,
চাহিলাম তোমা-পানে নয়নের জলে।
কোনো মুখ, কোনো সুখ, আশাতৃষা কোনো
যেথা হতে হারাইতে পারে না কখনো,
সেথায় এনেছি মোর পীড়িত এ হিয়া–
দাও তারে, দাও তারে, দাও ডুবাইয়া।
ঘরে মোর নাহি আর যে অমৃতরস
বিশ্ব-মাঝে পাই সেই হারানো পরশ।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (গীতাঞ্জলী হতে সংগ্রহিত)

Brink of Eternity
(Translated by the Poet himself)

In desperate hope I go
and search for her
in all the corners of my room;
I find her not.

My house is small and
what once has gone from it
can never be regained.

But infinite is thy mansion,
my lord, and seeking her
I have to come to thy door.

I stand under the golden canopy
of thine evening sky and
I lift my eager eyes to thy face.

I have come to the brink of eternity
from which nothing can vanish —
no hope, no happiness,
no vision of a face seen through tears.

Oh, dip my emptied life
into that ocean, plunge it
into the deepest fullness.
Let me for once feel that
lost sweet touch
in the allness of the universe.

– Rabindranath Thakur (Collected from Gitanjali)

কবিতা ৪৯ – ব্যাকুল / Poem 49 – Byakul (The Wicked Postman)

Rabindranath Thakur-Byakul

চিরস্তব্ধ হয়ে যাওয়া কোন বাবার হয়ে তার অবুঝ শিশুর চিঠি লিখে মাকে প্রবোধ দিতে চাওয়ার চাইতে করুণ কিছু বোধহয় এই পৃথিবীতে খুব কমই আছে। আজ তা নিয়েই মন খারাপ করা একটি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যাকুল

There are few things sadder on earth than a little child trying to console a mother who has gone numb at the loss of her husband. In Rabindranath Thakur’s Byakul (The Wicked Postman), a little boy tells her mother that he will write her all the letters that father does not write to her any more, with a heartbreaking innocence and sincerity that is bound to touch the reader.

ব্যাকুল

অমন করে আছিস কেন মা গো,
খোকারে তোর কোলে নিবি না গো?
পা ছড়িয়ে ঘরের কোণে
কী যে ভাবিস আপন মনে,
এখনো তোর হয় নি তো চুল বাঁধা।
বৃষ্টিতে যায় মাথা ভিজে,
জানলা খুলে দেখিস কী যে —
কাপড়ে যে লাগবে ধুলোকাদা।
ওই তো গেল চারটে বেজে,
ছুটি হল ইস্কুলে যে —
দাদা আসবে মনে নেইকো সিটি।
বেলা অম্‌নি গেল বয়ে,
কেন আছিস অমন হয়ে —
আজকে বুঝি পাস নি বাবার চিঠি।
পেয়াদাটা ঝুলির থেকে
সবার চিঠি গেল রেখে —
বাবার চিঠি রোজ কেন সে দেয় না?
পড়বে ব’লে আপনি রাখে,
যায় সে চলে ঝুলি-কাঁখে,
পেয়াদাটা ভারি দুষ্টু স্যায়না।
মা গো মা, তুই আমার কথা শোন্‌,
ভাবিস নে মা, অমন সারা ক্ষণ।
কালকে যখন হাটের বারে
বাজার করতে যাবে পারে
কাগজ কলম আনতে বলিস ঝিকে।
দেখো ভুল করব না কোনো —
ক খ থেকে মূর্ধন্য ণ
বাবার চিঠি আমিই দেব লিখে।
কেন মা, তুই হাসিস কেন।
বাবার মতো আমি যেন
অমন ভালো লিখতে পারি নেকো,
লাইন কেটে মোটা মোটা
বড়ো বড়ো গোটা গোটা
লিখব যখন তখন তুমি দেখো।
চিঠি লেখা হলে পরে
বাবার মতো বুদ্ধি ক’রে
ভাবছ দেব ঝুলির মধ্যে ফেলে?
কক্‌খনো না, আপনি নিয়ে
যাব তোমায় পড়িয়ে দিয়ে,
ভালো চিঠি দেয় না ওরা পেলে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু হতে সংগ্রহীত)

Byakul (The Wicked Postman)
(Translation by the poet himself)

Why do you sit there on the floor so quiet and silent, tell me, mother dear?
The rain is coming in through the open window, making you all wet, and you don’t mind it.
Do you hear the gong striking four? It is time for my brother to come home from school.
What has happened to you that you look so strange?
Haven’t you got a letter from father today?
I saw the postman bringing letters in his bag for almost everybody in the town.
Only, father’s letters he keeps to read himself. I am sure the postman is a wicked man.
But don’t be unhappy about that, mother dear.
To-morrow is market day in the next village. You ask your maid to
buy some pens and papers.
I myself will write all father’s letters; you will not find a single mistake.
I shall write from A right up to K.
But, mother, why do you smile?
You don’t believe that I can write as nicely as father does!
But I shall rule my paper carefully, and write all the letters beautifully big.
When I finish my writing, do you think I shall be so foolish as father and drop it into the horrid postman’s bag?
I shall bring it to you myself without waiting, and letter by letter help you to read my writing.
I know the postman does not like to give you the really nice letters.

– Rabindranath Thakur (Collected from Shishu)

গান ৪৬ – আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে / Song 46 – Aaj Jyotsna-raate Sabai Gechhe Bone (On This Moon-soaked Night)

Rabindranath Thakur-Aaj Jyotsnaraate (2)

বেশ কিছুদিন ধরেই রবিঠাকুরের লেখাগুলোর মাঝে ডুবে আছি, তাই এই সাইটটির সাম্প্রতিক সংযোজনগুলোর ধারাবাহিকতায় আজ কবিগুরুর আরেকটি কবিতা। আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে  গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন বোলপুরে থাকাকালে কোন এক জ্যোৎস্নালোকিত রাতে, সাহিত্যিক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়

“কোন এক উৎসব উপলক্ষে আমরা বহু লোক বোলপুরে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভব ‘রাজা’ নাটক অভিনয় উপলক্ষে। বসন্তকাল, জ্যোৎস্না রাত্রি। যত স্ত্রীলোক ও পুরুষ এসেছিলেন তাঁদের সকলেই প্রায় পারুলডাঙ্গা নামক এক রম্য বনে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কেবল আমি যাইনি রাত জাগবার ভয়ে।… গভীর রাত্রি, হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, মনে হল যেন ‘শান্তিনিকেতনের’ নীচের তলার সামনের মাঠ থেকে কার মৃদু মধুর গানের স্বর ভেসে আসছে। আমি উঠে ছাদে আলসের ধারে গিয়ে দেখলাম, কবিগুরু জ্যোৎস্নাপ্লাবিত খোলা জায়গায় পায়চারি করছেন আর গুন্‌গুন্‌ করে গান গাইছেন। আমি খালি পায়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলাম, কিন্তু তিনি আমাকে লক্ষ করলেন না।, আপন মনে যেমন গান গেয়ে গেয়ে পায়চারি করছিলেন তেমনি পায়চারি করতে করতে গান গাইতে লাগলেন। গান গাইছিলেন মৃদুস্বরে।  তিনি গাইছিলেন ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে…”।

পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে কোন এক জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রিতে তাঁকে মনে করে রবিঠাকুর এই গানটি লিখেছিলেন, এমন একটি ইতিকথা বাঙ্গালীদের মাঝে প্রচলিত। কিন্তু গানটি সত্যিই ঐ প্রেক্ষাপটে লেখা কিনা আমি জানিনা। কিন্তু এটুকু মনে হয় যে প্রিয় কিংবা আরাধ্য কোনও জনের জন্য গভীর ভালবাসা আর বেদনাভরা অপেক্ষা এমন আবেগভরে বোধহয় আর কোনও লেখায় বর্ণিত হয়নি। পাঠকদের মন আর্দ্র করে দিতে তাই গানের পংক্তিগুলো আজ এখানে তুলে দিলাম।

পুনশ্চ – গানটির উপরোক্ত ইতিহাস, এবং এডওয়ার্ড থমসনের লেখা সেটির নিম্নোক্ত ইংরেজি অনুবাদ আমি পেয়েছি গীতবিতান.নেট ওয়েবসাইটটিতে। রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপারে যারা বিস্তারিত জানতে চান, তাদের পৃষ্ঠাটিতে ঘুরে আসার আমন্ত্রণ ও অনুরোধ রইল। তাছাড়া যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে ইউটিউবে পাওয়া গানটির একটি ভিডিও নিচে সংযুক্ত করে দিলাম।

In continuation of my recent immersion in Rabindranath Thakur’s works, another of his songs. From anecdotal evidence, we know that Aaj Jyotsnaraate Sabai Gechhe Bone (On This Moon-soaked Night) was written by Thakur on a moonlit night in Bolpur, but whether it was written from grief at the loss of his younger son Shamindranath, we will perhaps never know. One can be sure, however, that that few works, if any, express with such tenderness the yearning and pain that accompanies Man’s separation from and wait to find a cherished someone (or perhaps God Himself, depending on how you read the poem) he has lost. For the softer corner of your heart, therefore, this song.

P.s. For non-native speakers, I have included two English translations of the song below. The anecdotes about the poem and the translation by Edward Thomson were found in http://www.gitabitan.net, which has a beautiful collection of Thakur’s songs and associated materials. Do take a peek. Also, if you prefer the words sung, you will find a YouTube video of a rendition at the end of this post.

আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে

আজ    জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥
যাব না গো যাব না যে,   রইনু পড়ে ঘরের মাঝে–
এই নিরালায় রব আপন কোণে।
যাব না এই মাতাল সমীরণে ॥

আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে
ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।
আমারে যে জাগতে হবে,   কী জানি সে আসবে কবে
যদি আমায় পড়ে তাহার মনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Aj Jyotsnarate Shabai Geche Bone (On This Moon-soaked Night)

Translation – Version 1- Edward Thomson
(Rabindranath Tagore: The Augustan Books of Modern Poetry, Ernest Benn Ltd. London, 1925)

They have all gone to the woods in this moonlit night,
In the south wind drunken with Spring’s delight.
But I will not go, will not go;
I will stay in the house, and so
Wait in my lonely corner-this night
I will not go in this south wind drunk with delight.

Rather, this room with care
I must scour and cleanse and prepare;
For … if He remembers me, then
He will come, though I know not when;
They must wake me swiftly. I will not fare
Out where the drunk wind reels through the air.

Translation – Version 2

On this moon-soaked night,
they have all gone to frolic in the forest.
The drunk spring breeze beckons, “Come!”
but heed it I will not.
In this desolate corner of my house, I will remain.
No I will not go into this intoxicating night.

I will stay behind
and clean my room with care.
Who knows when he may come?
Remain I must, perchance he remembers me,
and the drunk winds bring him here,
in this moonlit night.
I must stay awake.

– Rabindranath Thakur

কবিতা ৩৩ – লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে / Poem 33 – Lekhan Amar Mlano Hoye Ashe (The Closing Words That Fade)

Rabindranath Thakur-Lekhan Amar (2)

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে ক্যান্ডেস জেম্‌স এর ওয়েব পাতায় / Original of the edited photo taken from candacejames.com)

আজ রবিঠাকুরের একটি কবিতা। জীবনে যেসব মানুষের প্রতি বলতে চাওয়া কিছু কথা চিরকাল অব্যক্ত থেকে যাবে, তাদের মনে রেখে।

On this day, a poem by Rabindranath Thakur – meant for the people in our lives whom we never get to tell how we feel for them. A poor attempt at translation follows.

লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে

লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে
অক্ষরে
এখন গোপনে ফুটিয়া উঠিছে,
অন্তরে।

অনাহত বাণী মনে তুলে নিয়ে
রেখো তারে তব স্মরণে
স্থায়ী হয়ে যাবে যখন সে বাণী
তরিয়া যাইবে মরণে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ – অপ্রচলিত সংগ্রহ)

Lekhan Amar Mlan Hoye Ashe (The Closing Words That Fade)

The closing words that fade
with the dying ink
Today etch themselves
unfadingly on the heart.

Friend, those unwritten lines
keep alive in your memory.
For in the stasis of writing
the song
would only meet its end.

– Rabindranath Thakur (Sphulinga – Apracholito Sangraha)

কবিতা ৩২ – বিদায় / Poem 32 – Biday (Farewell)

Rabindranath Thakur-Biday

আজ রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা। জীবন থেকে হেলায় হারানো লাবণ্যটুকুকে মনে করে পড়বার জন্যে। আজও ভালবাসি, তাই।

This time, one of Rabindranath Thakur’s most beautiful poems – Biday (Farewell). The poem is meant to be the last words a person can say to his/her beloved before they part – if you have ever said goodbye to someone who you will never stop loving, this poem is for you. A slightly modified version of a wonderful translation by Rumela Sengupta follows.

বিদায়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল–
তুলে নিল দ্রুতরথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহুদূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে,
বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতপ্রদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা-স্বপ্নের মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু, বিদায়।
তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত-মুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
হোক তব সন্ধ্যাবেলা।
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানসভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
আজও তুমি নিজে
হয়তো বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সেই ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ-রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু, তার
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম,
হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Biday (Farewell)

Do you hear the wheels of time rumble
It’s chariot disappearing in a flash
It arouses a vibration of heartbeats in the vast ether
Heartbroken sobs of stars glisten in trampled darkness
My friend
That fleeting time
Embraces me, weaving it’s web
Lifts me to that speeding chariot
En route the dare-devil journey
Far, far away from you
I feel, a thousand deaths
I have faced to come here
At the summit of this new dawn –
The chariot’s restless pace
Sets free my name of yore – aflutter in the breeze
I have no means of turning back
If you see me from afar
You will know me not
My friend, farewell.

Some day, in respite from work
In the fullness of leisure amidst a soft spring breeze
On a night when deep sighs float forth from shores of the past
Wails of withered bakul flowers pierce the skies
In that moment search and see
A part of me is left behind in the margins of your life.
In the oblivion of dusk, it may hold some light
It may, in nameless dreams, take form.
Yet a dream it is not
My truth above all it is,
Death-defying
It is my love.
That I have left behind
Unchanging homage in your name
I float on with the flow of change
With the journey of time
My friend, farewell.

A loss it is not for you
Merely mortal my clay
If you have created with it an idol immortal
Let it be worshipped at eventide
That game of devotion will not be hindered
Tarnished not by my daily touch
Not one flower detached from the salver of floral offering
The festive spread of your mind that you garnish with care
With the sweet juice of emotion to quench the desire of expression
I will not adulterate it with my riches that are mere dust
With that, which is moist with my tears
Even today you may design your creation
With words woven in dreams of just my memory
Weighed not down nor moored to obligation
My friend, farewell.

Grieve not for me
I have my work
I have this whole wide world
My vessel, empty it is not
I will make whole each void
This vow I take forevermore.
If there be one who is
For me anxiously awaiting
That very one will fulfill me
The one who brings a tuberose stalk
From the night of the waxing moon
To decorate the salver of sacrifice
When it wanes
Who sees me as I am
Virtues and vices all
With boundless forgiveness
In worship of the one
Now I wish to give up myself.
What I have given you
Your right to that remains endless
An iota it is
That I give here and now
Pitiable moments
That sip in mere fistfuls
From this heart of mine
It’s hands folded in prayer
What I have given you
Was your own gift to me
The more you accepted
The more indebted you made me
My friend, farewell!

Rabindranath Thakur (Translated by Rumela Sengupta)

কবিতা ১৩ – দুখের বেশে এসেছ বলে / Poem 13 – Dukher Beshe Eshecho Bole (Have You come to me as my sorrow)

ঈশ্বরের প্রতি একটি করুণ আর্তি – যা হয়ত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি জর্জরিত হৃদয়েরই প্রার্থনা। রবিঠাকুরের কলমে।

In Two verses by Rabindranath Tagore, a deep longing for God that transcends most religious boundaries – a translation from the Kabiguru himself, and a second cruder one, follows.

দুখের বেশে এসেছ বলে

দুখের বেশে এসেছ বলে তোমারে নাহি ডরিব হে।
যেখানে ব্যথা তোমারে সেথা নিবিড় ক’রে ধরিব হে ॥
আঁধারে মুখ ঢাকিলে স্বামী, তোমারে তবু চিনিব আমি–
মরণরূপে আসিলে প্রভু, চরণ ধরি মরিব হে।
যেমন করে দাও-না দেখা তোমারে নাহি ডরিব হে ॥
নয়নে আজি ঝরিছে জল, ঝরুক জল নয়নে হে।
বাজিছে বুকে বাজুক তব কঠিন বাহু-বাঁধনে হে।
তুমি যে আছ বক্ষে ধরে বেদনা তাহা জানাক মোরে–
চাব না কিছু, কব না কথা, চাহিয়া রব বদনে হে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংকলিত)

Dukher Beshe Eshecho Bole (Have You come to me as my sorrow)

Have you come to me as my sorrow? All the more I must cling to you.
Your face is veiled in the dark, all the more I must see you.
At the blow of death from your hand let my life leap up in a flame.
Tears flow from my eyes,-let them flow round your feet in worship.
And let the pain in my breast speak to me that you are, still mine.

-Translated by the poet himself.

(Version 2)

Although You have come as sorrow, O Lord,
I shall not fear, and hold You dearly where it hurts.
If you shroud Yourself in darkness, I shall know You still,
And if You appear as death, yield at Your feet.
However You come to me, O Lord, I will be unafraid.

Let tears flow from my eyes in streams,
And the soul writhe in pain from Your unyielding grasp,
For this sorrow is but a reminder
Of Your firm hands holding me onto the refuge of Your heart.
I seek nothing else, O Lord, only to gaze at Your Face.

– Rabindranath Thakur (Collected from Puja/Crossing)