গান ৭৫ – হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল / Song 75 – Hari Din to Gelo Sandhya Holo (Carry me Across, O Lord)

আজ পাঠকদের জন্যে আমার প্রিয় একটি গান। হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল  বৃহত্তর বাংলার, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের, সবচেয়ে জনপ্রিয় ভক্তিমূলক গানগুলোর মধ্যে একটি। লালনশিষ্য কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের লেখা এই গানটি এক কথায় ঈশ্বরের কাছে পৃথিবীর মোহ হতে মুক্ত কিংবা দুঃখভারে ভেঙ্গে পড়া মানুষের চিরন্তন আর্তি – একূল আর ও কূলের মাঝে যে অসীম সাগর, তা পার করে তাকে পরপারে নেওয়ার। বাংলার লোকসঙ্গীতের মাঝে যে কত গভীর আধ্যাত্মিকতা নিহিত আছে, তার একটি উদাহারণ এই গান।

বাংলা লোকসঙ্গীতের সাথে যারা পরিচিত, তারা হয়তো এই গানটির ঈশ্বরকে মাঝি রূপে কল্পনার সাথে অন্যান্য লোকগানের সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন। সেটি আশ্চর্য নয়। নদীমাতৃক বাংলার কবিরা যে মর্ত্য আর পরলোকের সংযোগকারীর উপমা খেয়াঁর মাঝির মাঝে খুঁজে পাবেন, তাই তো হওয়ার কথা।

যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে আরতি মুখোপাধ্যায়ের গলায় গানটির একটি ইউটিউব সংস্করণ নিচে তুলে দিলাম।

Today, a heartfelt song of faith – one that you must have heard if you are a Bangalee on the western side of the border, or a listener of Bangla folk music on the eastern side. Written by Kangal Harinath Majumdar, Hari Din to Gelo (Carry me Across, O Lord) is a soulful call to God by a seeker who is in the twilight of his/her life. Weary of the world on this shore, (s)he wishes to cross over to the other side – a realm truer and more profound than holy texts can convey. But lacking the piety that would allow him/her to cross the waters, the seeker can only appeal keeping fatih in God’s mercy – something that is beautifully expressed in this song.

If you are familiar with Bangla devotional songs, you should find Hari Din to Gelo to be a classic Bangalee representation of God as a boatman. It should not be surprising – Bangla, after all, is a land crisscrossed by a thousand rivers. Who else could carry us away from that we want to leave, but a boatman?

হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল

হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !
তুমি পারের কর্তা শুনে বার্তা
ডাকি হে তোমারে ।
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

আমি আগে এসে
ঘাটে রইলাম বসে –
ওহে – আমায় কি পার করবেনা হে ?
আমায় কি পার করবেনা হে ?
আমি অধম বলে –
যারা পাছে এল আগে গেল
আমি রইলাম পড়ে !
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

শুনি কড়ি নাই যার
তুমি তারেও কর পার !
আমি সেই কথা শুনে ঘাটে এলাম হে
সেই কথা শুনে ঘাটে এলাম হে
কড়ি নাই যার
তুমি তারেও কর পার !
আমি দিন ভিখারি নাইকো কড়ি
দেখ ঝুলি ঝেড়ে !
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

আমার পারের সম্বল
দয়াল নামটি কেবল !
তাই দয়াময় বলে ডাকি তোমায় হে
অধম তারণ বলে ডাকি তোমায় হে
পারের সম্বল
দয়াল নামটি কেবল !
ফিকির কেদে আকুল
পড়ে অকুল পাথারে সাঁতারে !

হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !
তুমি পারের কর্তা শুনে বার্তা
ডাকি হে তোমারে ।
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

– কাঙাল হরিনাথ মজুমদার

Advertisements

গান ৭৪ – বাড়ির কাছে আরশিনগর / Song 74 – Barir Kachhe Aarshinagar (City of Mirrors)

আজকের ভণিতার বিষয়টুকু বেশ জটিল। একই তত্ত্বের সাধক বা একই পথের যাত্রী যারা, তাদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব কিংবা রেষারেষি থাকবে, তা আশ্চর্য নয়, কিন্তু সম্পর্কটি যদি নারী ও পুরুষের মাঝে হয়? বিপরীত লিঙ্গের মধ্যেকার সহজাত আকর্ষণটুকু কি সেই সাধনা বা যাত্রাটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়, নাকি সেগুলোর অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়?

প্রশ্নগুলো করছি কারণ বাউলসম্রাট লালন সাঁইয়ের বাড়ির কাছে আরশিনগর  কবিতাটি পড়তে গিয়ে সেগুলো মনে এলো। বাউলদের আমরা সাধক বলে জানি, কিন্তু তাঁরা যে মানবিক প্রবৃত্তির প্রভাবগুলো হতে পুরোপুরি মুক্ত, তা কি সত্যি? লালন সাঁইয়ের ভাষায় –

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত, দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁকে রে।।

হয়তো আমাদের কেউই পুরোপুরি মুক্ত নই, কিংবা আমিই হয়তো আধ্যাত্মিক মিলনের আকাঙ্খাকে সাধারণ মানুষের আসক্তি ভেবে ভুল করছি। যাই হোক, ক্ষুদ্র মনের অনুধাবনের বাইরের প্রশ্নগুলি বাউলসম্রাটের কবিতাটিসহ পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে, এই আশায় তুলে দিলাম।

A few questions for my readers today: In our pursuits of divine truths or higher goals, how do our relationships with fellow pursuers of the opposite gender matter? Does the sexuality that is entwined with gender intensify the camaraderie (or competition) between travelers on the same path? And does it influence, or perhaps taint, the very pursuit itself?

I write the questions because reading Lalon Sain’s Barir Kachhe Aarshinagar (City of Mirrors) made me think of those. Quoting from the source of the translation:

Bauls hold women in high esteem. They are essential to the male practitioner’s success in sadhana. This is one of Lalon’s many songs that secretly refer to the sadhika (female practitioner) or to the sahaj manus (natural person) within her.

Yet to me, the explanation seems to merely be a summarization of something more profound. Perhaps you know what I mean? The questions asked are far from simple, and a discussion of those require more than a blog post, and more than a knowledge of literature. So let me leave those for your weekend tea-parties – you will need more than a cup, I am sure :).

A translation of the poem by the Bangla scholar, Dr. Carol Salomon, is provided below.

বাড়ির কাছে আরশিনগর

বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শি বসত করে।
আমি একদিন না দেখিলাম তারে।।
গিরাম বেড়ে অগাধ পানি
ও তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে
মনে বাঞ্ছা করি দেখব তারে
কেমনে সে গাঁয় যাই রে।।
বলবো কী সেই পড়শির কথা
ও তার হস্তপদ স্কন্ধমাথা, নাই রে
ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর
ক্ষণেক ভাসে নীরে।।
পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত, দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁকে রে।।

– লালন সাঁই

Barir Kachhe Aarshinagar (The City of Mirrors)
(Translated by Carol Salomon)

I have not seen her even once–
my neighbor
who lives in the city of mirrors
near my house.
Her village is surrounded
by deep boundless waters,
and I have no boat
to cross over.
I long to see her,
but how can I reach
her village?
What can I say
about my neighbor?
She has no hands, no feet,
no shoulders, no head.
Sometimes she floats high up in the sky,
sometimes in the water.
If my neighbor only touched me,
she would send the pain of death away.
She and Lalon are in the same place,
yet five hundred thousand miles apart.

– Lalon Sain