ছোটগল্প ১২৯ – প্রফেসর হিজিবিজ্‌বিজ্‌ / Short Story 129 – Professor Hijibijbij


পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray-Professor Hijibijbij

প্রফেসর হিজিবিজ্‌বিজ্‌ – সত্যজিৎ রায়

অনেকদিন পরে আজ সত্যজিৎ রায়ের আরেকটি ছোটগল্প। ‘প্রফেসর হিজিবিজ্‌বিজ্‌’ নামটি শুনলে কি পাঠকদের কি সুকুমার রায়ের হ-য-ব-র-ল গল্পের বিখ্যাত কোন চরিত্রকে মনে পড়ে? বাবার লেখা একটি চরিত্রের মাঝে যে সত্যজিৎ রায় অনুপ্রেরণা খুঁজে পাবেন, তা আশ্চর্য নয়। কিন্তু তাই বলে যে গল্পটি শুধুমাত্রহ-য-ব-র-ল এর ধারাবাহক, তা মোটেও নয়। ‘প্রফেসর হিজিবিজ্‌বিজ্‌’ গল্পটি সুকুমার-সৃষ্ট একটি চরিত্রকে ভিত্তি করে লেখা বটে, কিন্তু তা ছাড়াও সেটি একই সাথে পাঠকদের টানবার মত একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী, খানিকটা ভৌতিক আর খানিকটা হাসির গল্প। সত্যজিৎ এর লেখা যারা পড়েন, তাদের এটি নিঃসন্দেহে ভাল লাগবে। আর সুকুমার রায়ের শিশুতোষ লেখাগুলো যারা পড়েছেন, তারাও গল্পটিতে চেনা চরিত্রগুলোকে নতুন চেহারায় দেখতে পাবেন। তাই আজ এই লেখাটি তুলে দেওয়া। পড়বার আমন্ত্রণ রইল। 🙂

Professor Hijibijbij – Satyajit Ray

Another long break later, a short story by Satyajit Ray. Does the name ‘Professor Hijibijbij’ ring a bell? If the reader is familiar with Sukumar Ray’s famour work Ha-Ja-Ba-Ra-La (or H.J.B.R.L), then perhaps? That Satyajit Ray would be inspired by one of his father’s creations is not surprising, but the work is more than a nod to his father’s work – it is at once a science-fiction and a cross between a funny and a horror story – which makes it fascinating and enjoyable at the same time. Fans of Ray’s works will definitely find this a great read, as will Sukumar-fans. And to those who are uninitiated to either of these wonderful writers, what better way to start? Hence this upload. Enjoy! 🙂

কবিতা ২২ – সুকুমার রায়ের কিছু ছড়া / Poem 22 – Sukumar Ray er Kichhu Chhara (Some Rhymes by Sukumar Ray)

আধুনিক বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ সুকুমার রায়। ছোটবেলায় যে তাঁর লেখা কত মজার ছড়া পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। অনেক দিন পর হঠাৎ করেই কোন প্রসংক্রমে তাঁর কিছু কবিতা মনে পড়ে গেল। কবিতাগুলো ছোটদের জন্যে লেখা, কিন্তু বুড়োরা যে এসবে অর্থ খুঁজে পাবে না তা নয়। আমি তো অন্তত কিছু কিছু মানে খুঁজে পাই। হয়তো যথেষ্ট পরিণত হইনি বলে। যাই হোক, বাংলা সাহিত্যের অদ্ভুতুড়ে কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে গভীর অর্থবহ কোণটির উদযাপনে এই লেখা।

This time, a collection of rhymes by one of the pioneers of modern Bangla youth literature. Sukumar Ray wrote his poems about a century ago. Yet, they continue to inspire childish joy among young and adults alike, and if you read just right, reveal a lot about us and our society. Consider this to be in celebration of the ridiculous but meaningful.

কবিতা গুলো সংগ্রহ করা হয়েছে এখান থেকে। সুকুমার রায়ের আরও অনেক ভাল লেখা আছে এখানে।

কুমড়ো পটাশ

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ নাচে-
খবরদার এসো না কেউ আস্তাবলের কাছে ;
চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে চাইবে নাকো পাছে ;
চার পা তুলে থাকবে ঝুলে হট্টমুলার গাছে !

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ কাঁদে-
খবরদার! খবরদার! বসবে না কেউ ছাদে ;
উপুড় হয়ে মাচায় শুয়ে লেপ কম্বল কাঁধে ;
বেহাগ সুরে গাইবে খালি ‘রাধে কৃষ্ণ রাধে’ !

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ হাসে-
থাকবে খাড়া একটি ঠ্যাঙে রান্নাঘরের পাশে ;
ঝাপ্‌সা গলায় ফার্সি কবে নিশ্বাসে ফিস্‌ফাসে ;
তিনটি বেলা উপোস করে থাকবে শুয়ে ঘাসে !

Kumropatash

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ ছোটে-
সবাই যেন তড়বড়িয়ে জানলা বেয়ে ওঠে ;
হুঁকোর জলে আলতা গুলে লাগায় গালে ঠোঁটে ;
ভুলেও যেন আকাশ পানে তাকায় নাকো মোটে !

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ ডাকে-
সবাই যেন শাম্‌লা এঁটে গামলা চড়ে থাকে ;
ছেঁচকি শাকের ঘণ্ট বেটে মাথায় মলম মাখে ;
শক্ত ইঁটের তপ্ত ঝামা ঘষতে থাকে নাকে !

তুচ্ছ ভেবে এ-সব কথা করছে যারা হেলা,
কুম্‌‌ড়োপটাশ জানতে পেলে বুঝবে তখন ঠেলা ।
দেখবে তখন কোন্‌ কথাটি কেমন করে ফলে,
আমায় তখন দোষ দিওনা, আগেই রাখি বলে ।

বড়াই

গাছের গোড়ায় গর্ত ক’রে ব্যাং বেঁধেছেন বাসা,
মনের সুখে গাল ফুলিয়ে গান ধরেছেন খাসা।
রাজার হাতি হাওদা-পিঠে হেলে দুলে আসে—
“বাপ্‌রে” ব’লে ব্যাং বাবাজি গর্তে ঢোকেন ত্রাসে!
রাজার হাতি মেজাজ ভারি হাজার রকম চাল;
হঠাৎ রেগে মটাৎ ক’রে ভাঙল গাছের ডাল।
গাছের মাথায় চড়াই পাখি এবাক হ’য়ে কয়—
“বাস্‌রে বাস্‌! হাতির গায়ে এমন জোরও হয়”!
মুখ বাড়িয়ে ব্যাং বলে, “ভাই, তাইত তোরে বলি—
আমরা, অর্থাৎ চার-পেয়েরা, এম্নিভাবেই চলি”।।

বাবুরাম সাপুড়ে

Baburam Shapureবাবুরাম সাপুড়ে,
কোথা যাস্‌ বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা,
দুটো সাপ রেখে যা !
যে সাপের চোখ নেই,
শিং নেই নোখ্‌ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না,
কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস ফাঁস,
মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ,
নেই কোন উৎপাত,
খায় শুধু দুধ ভাত-
সেই সাপ জ্যান্ত
গোটা দুই আনত ?
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা
ক’রে দেই ঠাণ্ডা ।

ভাল ছেলের নালিশ

মাগো!
প্রসন্নটা দুষ্টু এমন! খাচ্ছিল সে পরোটা
গুড় মাখিয়ে আরাম ক’রে বসে –
আমায় দেখে একটা দিল ,নয়কো তাও বড়টা,
দুইখানা সেই আপনি খেল ক’ষে!
তাইতে আমি কান ধরে তার একটুখানি পেঁচিয়ে
কিল মেরেছি ‘হ্যাংলা ছেলে’ বলে-
অম্‌‌নি কিনা মিথ্যা করে ষাঁড়ের মত চেচিয়ে
গেল সে তার মায়ের কাছে চলে!

মাগো!
এম্‌‌নিধারা শয়তানি তার, খেলতে গেলাম দুপুরে,
বল্‌ল, ‘এখন খেলতে আমার মানা’-
ঘন্টাখানেক পরেই দেখি দিব্যি ছাতের উপরে
ওড়াচ্ছে তার সবুজ ঘুড়ি খানা।
তাইতে আমি দৌড়ে গিয়ে ঢিল মেরে আর খুঁচিয়ে
ঘুড়ির পেটে দিলাম করে ফুটো-
আবার দেখ বুক ফুলিয়ে সটান মাথা উঁচিয়ে
আনছে কিনে নতুন ঘুড়ি দুটো!

সাধে কি বলে গাধা

বললে গাধা মনের দুঃখে অনেকখানি ভেবে-
“বয়েস গেল খাটতে খাটতে, বৃদ্ধ হলাম এবে,
কেউ না করে তোয়াজ তবু, সংসারের কি রীতি !
ইচ্ছে করে এক্ষুনি দিই কাজে কর্মে ইতি ।
কোথাকার ঐ নোংরা কুকুর, আদর যে তার কত-
যখন তখন ঘুমোচ্ছে সে লাটসাহেবের মত !
ল্যাজ নেড়ে যেই, ঘেউ ঘেউ ঘেউ, লাফিয়ে দাঁড়ায় কোলে,
মনিব আমার বোক্‌চন্দর, আহ্লাদে যান গলে ।
আমিও যদি সেয়ানা হতুম, আরামে চোখ মুদে
রোজ মনিবের মন ভোলাতুম অম্নি নেচে কুঁদে ।
ঠাং নাচাতুম, ল্যাজ দোলাতুম, গান শোনাতুম সাধা-
এ বুদ্ধিটা হয়নি আমার- সাধে কি বলে গাধা !”

বুদ্ধি এঁটে বসল গাধা আহ্লাদে ল্যাজ নেড়ে,
নাচ্‌ল কত, গাইল কত, প্রাণের মায়া ছেড়ে ।
তারপরেতে শেষটা ক্রমে স্ফুর্তি এল প্রাণে
চলল গাধা খোদ্‌ মনিবের ড্রইংরুমের পানে ।
মনিবসাহেব ঝিমুচ্ছিলেন চেয়ারখানি জুড়ে,
গাধার গলার শব্দে হঠাৎ তন্দ্রা গেল উড়ে ।
চম্‌কে উঠে গাধার নাচন যেমনি দেখেন চেয়ে,
হাসির চোটে সাহেব বুঝি মরেন বিষম খেয়ে ।

ভাব্‌লে গাধা- এই তো মনিব জল হয়েছেন হেসে
এইবারে যাই আদর নিতে কোলের কাছে ঘেঁষে ।
এই না ভেবে এক্কেবারে আহ্লাদেতে ক্ষেপে
চড়্‌ল সে তার হাঁটুর উপর দুই পা তুলে চেপে ।
সাহেব ডাকেন ‘ত্রাহি ত্রাহি’ গাধাও ডাকে ‘ঘ্যাঁকো’
(অর্থাৎ কিনা ‘কোলে চড়েছি, এখন আমার দ্যাখো !’)

ডাক শুনে সব দৌড়ে এল ব্যস্ত হয়ে ছুটে,
দৌড়ে এল চাকর বাকর মিস্ত্রী মজুর মুটে,
দৌড়ে এল পাড়ার লোকে, দৌড়ে এল মালী-
কারুর হাতে ডাণ্ডা লাঠি, কারু বা হাত খালি ।
ব্যাপার দেখে অবাক সবাই, চক্ষু ছানাবড়া-
সাহেব বললে, “উচিত মতন শাসনটি চাই কড়া ।”
হাঁ হাঁ ব’লে ভীষন রকম উঠ্‌ল সবাই চটে
দে দমাদম্‌ মারের চোটে গাধার চমক্‌ ছোটে ।

ছুটল গাধা প্রাণের ভয়ে গানের তালিম ছেড়ে,
ছুটল পিছে একশো লোকে হুড়মুড়িয়ে তেড়ে ।
তিন পা যেতে দশ ঘা পড়ে, রক্ত ওঠে মুখে-
কষ্টে শেষে রক্ষা পেল কাঁটার ঝোপে ঢুকে ।
কাঁটার ঘায়ে চামড়া গেল, সার হল তার কাঁদা ;
ব্যাপার শুনে বললে সবাই, “সাধে কি বলে গাধা !”

Sukumar Ray-Shadhe ki Bale Gadha

অসম্ভব নয় !

এক যে ছিল সাহেব, তাহার
গুণের মধ্যে নাকের বাহার ।
তার যে গাধা বাহন, সেটা
যেমন পেটুক তেমনি ঢ্যাঁটা ।
ডাইনে বললে যায় সে বামে
তিন পা যেতে দুবার থামে ।
চল্‌‌তে চল্‌‌তে থেকে থেকে
খানায় খন্দে পড়ে বেঁকে ।
ব্যাপার দেখে এম্নিতরো
সাহেব বললে, “সবুর করো-
মামদোবাজি আমার কাছে ?
এ রোগেরও ওষুধ আছে ।”
এই না ব’লে ভীষণ ক্ষেপে
গাধার পিঠে বস্‌ল চেপে
মুলোর ঝুঁটি ঝুলিয়ে নাকে ।
আর কি গাধা ঝিমিয়ে থাকে ?
মুলোর গন্ধে টগবগিয়ে
দৌড়ে চলে লম্ফ দিয়ে-
যতই চলে ধরব ব’লে
ততই মুলো এগিয়ে চলে!
খাবার লোভে উদাস প্রাণে
কেবল ছোটে মুলোর টানে-
ডাইনে বাঁয়ে মুলোর তালে
ফেরেন গাধা নাকের চালে ।

Sukumar Ray-Ashambhab Noy

বিষম চিন্তা

মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার—
সবাই বলে, “মিথ্যে বাজে বকিস্‌নে আর খবরদার !”
অমন ধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব ?
বলবে সবাই, “মুখ্যু ছেলে”, বলবে আমায় “গো গর্ধভ !”
কেউ কি জানে দিনের বেলায় কোথায় পালায় ঘুমের ঘোর ?
বর্ষা হলেই ব্যাঙের গলায় কোত্থেকে হয় এমন জোর ?
গাধার কেন শিং থাকেনা, হাতির কেন পালক নেই ?
গরম তেলে ফোড়ন দিলে লাফায় কেন তাধেই ধেই ?
সোডার বোতল খুললে কেন ফঁসফঁসিয়ে রাগ করে ?
কেমন করে রাখবে টিকি মাথায় যাদের টাক পড়ে ?
ভূত যদি না থাকবে তবে কোত্থেকে হয় ভূতের ভয় ?
মাথায় যাদের গোল বেধেছে তাদের কেন “পাগোল” কয় ?
কতই ভাবি এসব কথা, জবাব দেবার মানুষ কই ?
বয়স হলে কেতাব খুলে জানতে পাব সমস্তই ।