গল্প ১১৭ – ক্যাম্প / Story 117- Camp

jafar-iqbal-camp

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Zafar Iqbal – Camp

ক্যাম্প – জাফর ইকবাল

একটি যুদ্ধ, দুটি পক্ষ, কয়েকটি দৃষ্টিকোণ, আর একটি মৃত্যু – ক্যাম্প  মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ নিয়ে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখা আরেকটি উপন্যাস। পাঠকদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি, তারা নিশ্চই জাফর ইকবালকে চেনেন, আর হয়তো এও জানেন যে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনি পিতৃহারা হয়েছিলেনক্যাম্প উপন্যাসটি তাই যতটা কাল্পনিক, ততটাই বাস্তব এবং ব্যক্তিগত। যতদূর জানি, একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে ৪৭ বছরের রাজনীতি আর দলবাজির প্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেকটাই সরলীকরণের বলি হয়েছে, যেকারণে আজ যুদ্ধের দিনগুলোর চরিত্রগুলোকে হয় সাদা কিংবা কালোর কাতারে ফেলার প্রবণতা বেশ প্রবল। কিন্তু ক্যাম্প পড়লে বোঝা যায় যে সেই সময়কার বাস্তবতা ছিল অনেকটাই জটিল, আর এও বোঝা যায় যে একাত্তরের খলনায়ক ছিল যারা, আদর্শগত ভাবে ভিন্ন হলেও তাদের মত অনেকেই দুই বাংলায়ই আজও বর্তমান।

Camp – Zafar Iqbal

A war, two sides, a few perspectives, and a death – Camp is another story by Muhammad Jafar Iqbal that portrays lives during the liberation war of Bangladesh. Readers who are Bangladeshi need no introduction to Jafar Iqbal; for those who do not know, the writer lost his father during atrocities committed by the Pakistani army during the war. For a fiction, Camp is therefore a very real account, and more – it is personal.

From the little I know, 47 years of politics and factionalism have left the war-time history in post-war Bangladesh grossly oversimplified. Consequently, the tendency among many these days is to portray characters from those times in either black or white. Camp, however, reveals them to us in shades of gray, and makes us realize the worrying truth that even after all this time, people just like them still linger among us.

Advertisements

গান ৬৬ – জয় বাংলা, বাংলার জয় / Song 66 – Joy Bangla, Bangla’r Joy (Victory to Bangla)

ডিসেম্বরের শুরু আজ। আমাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি, তাদের মনে মাসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ – একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তো বাংলাদেশ বিজয় লাভ করেছিল এই মাসের ১৬তেই। বিজয়ের মাসে তাই বিজয়ের একটি গান – গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও আনোয়ার পারভেজ এর সুরে জয় বাংলা, বাংলার জয়  বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে একটি। একাত্তরে যখন বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে রেডিও তরঙ্গে ভেসে আসা জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি তাদের অনুপ্রেরণা যোগাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শেশ হয়ে গেছে ৪৫ বছর আগেই, কিন্তু যেসব কারণে যুদ্ধ, তার অনেককটিই দুই বাংলাতেই এখনো বর্তমান। সেসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণাস্বরূপ তাই আজ এই গানটি তুলে দেওয়া।

It’s December – a month of significance for Bangalees, and particularly, Bangladeshis. It was on the 16th of this month, in 1971, that the Bangladeshi militia (and the supporting Indian allies) defeated the Pakistani army and their associates after a nine month War of Independence. The war saw millions become refugees, and by some estimates, about 3 million deaths – needless to say, it was dark period for the Bangalees who lived through it. During those times, Muktijoddhas (freedom fighters) in the thick of war would draw inspiration from songs Bangladeshi refugee artists wrote and sung over the airwaves from India. Joy Bangla Bangla’r Joy (Victory to Bangla) is one of the most famous of those songs. Written by Gazi Majharul Anwar, it was simultaneously an expression of anger at the atrocities by the Pakistan army and a call to action against them. On this month and in these times of forgetfulness, it is only appropriate that this thrilling and patriotic song is added to this site.

জয় বাংলা, বাংলার জয়

জয় বাংলা, বাংলার জয়,
হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়
কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়।।

বাংলার প্রতি ঘরে ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে
আমাদের রক্ত টগবগ দুলছে মুক্তির দৃপ্ত তারুণ্যে
নেই ভয়, হয় হোক রক্তের প্রচ্ছদ পট
তবু করিনা করিনা করিনা ভয়।।

অশোকের ছায়ে যেন রাখালের বাঁশরী
হয়ে গেছে একেবারে স্তদ্ধ
চারিদিকে শুনি আজ নিদারুণ হাহাকার
আর ওই কান্নার শব্দ।

শাসনের নামে চলে শোষণের সুকঠিন যন্ত্র
বজ্রের হুঙ্কারে শৃঙ্খল ভাঙ্গতে সংগ্রামী জনতা অতন্দ্র
আর নয়, তিলে তিলে বাঙালীর এই পরাজয়
আমি করিনা করিনা করিনা ভয়।।

ভূখা আর বেকারের মিছিলটাকে যেন ওই
দিন দিন শুধু বেড়ে যাচ্ছে
রোদে পুড়ে জলে ভিজে অসহায় হয়ে আজ
ফুটপাতে তারা ঠাঁই পাচ্ছে।

বারবার ঘুঘু এসে খেয়ে যেত দেবনা তো আর ধান
বাংলার দুশমন তোষামুদী চাটুকার
সাবধান, সাবধান, সাবধান
এই দিন, সৃষ্টির উল্লাসে হবে রঙীন
আর মানিনা, মানিনা কোন সংশয়।।

মায়েদের বুকে আজ শিশুদের দুধ নেই
অনাহারে তাই শিশু কাঁদছে
গরীবের পেটে আজ ভাত নেই ভাত নেই
দ্বারে দ্বারে তাই ছুটে যাচ্ছে।

মা-বোনেরা পরণে কাপড়ের লেশ নেই
লজ্জায় কেঁদে কেঁদে ফিরছে
ওষুধের অভাবে প্রতিটি ঘরে ঘরে,
রোগে শোকে ধুকে ধুকে মরছে
অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই
অত্যাচারী শোষকদের আজ
মুক্তি নাই, মুক্তি নাই , মুক্তি নাই।

– গাজী মাজহারুল আনোয়ার
(সুর) আনোয়ার পারভেজ

কবিতা ৪২ – দগ্ধ গ্রাম / Poem 42 – Dagdho Gram (The Charred Village)

আজ পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের একটি কবিতা। কবির অনেক লেখার মত এটিও বাংলার গ্রামাঞ্চলকে নিয়ে, তবে দগ্ধ গ্রাম এর উপলক্ষ ও বর্ণনা একটু ভিন্ন – কবিতাটি জসীমউদ্দীন লিখেছিলেন ১৯৭১ সালে।

This time, a poem by the Rural Poet Jasimuddin. Like his other works, Dagdho Gram too narrates the scenery of rural Bangla, but one that is charred and devastated – the poem was written in 1971.

Jasimuddin-Dagdho Gram

দগ্ধ গ্রাম

এইখানে ছিল কালো গ্রামখানি, আম কাঁঠালের ছায়া,
টানিয়া আনিত শীতল বাতাস কত যেন করি মায়া।
তাহারই তলায় ঘরগুলি ভরে মমতা মুরতি হয়ে,
ছিল যে তাহারা ভাইবোন আর বউ ছেলেমেয়ে লয়ে।
সুখের স্বপন জড়ায়ে ঘুরায়েছিল যে তাদের বেড়ে,
আকাশ হইতে আসিত আশিস দেবর ভবন ছেড়ে।

গঞ্জের হটে সওদা বেচিতে বউ যে কহিত কানে,
“আমার জন্য নয়ানজুড়ির শাড়ি যেন কিনে আনে।”
হাটের ফিরতি পিতারে বেড়িয়া ছোট ছোট ছেলেমেয়ে,
হাসিত নাচিত বিস্কুট আর চিনির পুতুল পেয়ে।
গাজীর গানের বসিত আসর, গায়েনের সুর ধরি,
যুগ যুগান্ত পার হয়ে কত আসিত কাহিনী পরী।

কিসে কী হইল, পশ্চিম হতে নরঘাতকেরা আসি,
সারা গাঁও ভরি আগুন জ্বালায়ে হাসিল অট্টহাসি।
মার কোল হতে শিশুরে কাড়িয়া কাটিল যে খানখান,
পিতার সামনে মেয়েরে কাটিয়া করিল রক্তস্নান।
কে কাহার তরে কাঁদিবে কোথায়; যূপকাষ্ঠের গায়,
শত সহস্র পড়িল মানুষ ভীষণ খড়গ ধায়।

শত শিখা মেলি অগ্নিদাহন চাহি আকাশের পানে,
হয়তো-বা এর ফরিয়াদ করি ঊর্ধ্বে নিশ্বাস হানে।
আকাশে আজিকে নাহি কোনো পাখি, সুনীল আরোসি তার,
দিগন্তে মেলি এ ভীষণ রূপ দগ্ধি হে অনিবার।
মুহূর্তে সব শেষ হয়ে গেল ভস্মাবশেষ গ্রাম,
দাঁড়ায়ে রয়েছে বিষাদ-মলিন দগ্ধ দুটি আধপোড়া খাম।

ওইখানে ছিল কুলের গাছটি, স্খলিত দগ্ধ-শাখ,
পাড়ার যত-না ছেলেমেয়েদের নীরবে পড়িছে ডাক।
আর তো তাহারা ফিরে আসিবে না, নাড়িয়া তাহার ডাল,
পাড়িবে না ফল দস্যু ছেলেরা অবহেলি মার গাল।
সিঁদুরে আমের গাছ ছিল হোথা, বছরের শেষ সনে,
শাখা ভরা আম সিঁদুর পরিয়া সাজিত বিয়ের কনে।
সে গাছে তো আর ধরিবে না আম বোশেখ মাসের ঝড়;
সে ছেলেমেয়েরা আসিবে না পুনঃ আম কুড়াবার তরে।
সারা গাঁওখানি দগ্ধ শ্মশান, দমকা হাওয়ার ঘায়,
দীর্ঘনিশ্বাস আকাশে পাতালে ভস্মে উড়িয়া যায়।

– জসীমউদ্দীন

কবিতা ২৬ – স্বাধীনতা তুমি / Poem 27 – Swadhinata Tumi (An Ode to Independence)

Shamsur Rahman-Swadhinata Tumi 2

Photo : Highway to Heaven by Abhijit Bhattacharyya

বাঙ্গালীদের মধ্যে যারা বাংলাদেশী, তাদের কাছে ‘২৬’ সংখ্যাটির একটি বিশেষ তাৎপর্য থাকার কথা। হাজার হোক, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা তো করেছিল ১৯৭১ এর মার্চের ২৬তম দিনটিতেই। এই সাইটে কবিতা নিয়ে লেখাগুলোর মধ্যে এই পোস্টটিও ২৬তম, তাই এই ছোট্ট উপলক্ষে আধুনিক বাংলা কবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শামসুর শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা তুমি কবিতাটি তুলে দিলাম।

To Bangalees in Bangladesh, the number ’26’ bears a special significance. After all, it was on this day of March in 1971 that Bangladesh was declared independence. This piece happens to be the 26th of the poetry-related posts on this blog. So in remembrance, here is Swadhinata Tumi (An Ode to Independence), a poem written by one of the greater Bangalee poets of the modern era – Shamsur Rahman.

স্বাধীনতা তুমি

স্বাধীনতা তুমি
রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-
স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা
স্বাধীনতা তুমি
পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।
স্বাধীনতা তুমি
ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।
স্বাধীনতা তুমি
রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।
স্বাধীনতা তুমি
মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী।
স্বাধীনতা তুমি
অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।
স্বাধীনতা তুমি
বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর
শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।
স্বাধীনতা তুমি
চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।
স্বাধীনতা তুমি
কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা।
স্বাধীনতা তুমি
শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক
স্বাধীনতা তুমি
পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।
স্বাধীনতা তুমি
উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।
স্বাধীনতা তুমি
বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।
স্বাধীনতা তুমি
বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।
স্বাধীনতা তুমি
গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।
স্বাধীনতা তুমি
খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,
খুকীর অমন তুলতুলে গালে
রৌদ্রের খেলা।
স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।

– শামসুর রাহমান

গল্প ৪০ – আমার বন্ধু রাশেদ / Story 40 – Amar Bondhu Rashed (Rashed, My Friend)

Jafar Iqbal-Amar Bandhu Rashed

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Zafar Iqbal-Amar Bandhu Rashed

আমার বন্ধু রাশেদ – জাফর ইকবাল

 “তুই মশাল মিছিলে যাবি?”
“হ্যা। ছোট বলে হাতে মশাল দিতে চায় না। আগে গিয়ে অনেক সাধাসাধি করতে হবে।”
ফজলু চোখ ছোট ছোট করে বলল, “ইশ! আমি যদি তোর সাথে যেতে পারতাম!”
রাশেদ বলল, “চল যদি যেতে চাস।”
ফজলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দিলীপ বলল, “ফজলু যাবে মশাল মিছিলে? তাহলেই হয়েছে। কাকা তোকে পিটিয়ে লম্বা করে দেবে না?”
ফজলু বিষণ্ন মুখে মাথা নাড়ল। আশরাফ গম্ভীর গলায় বলল, “বড় না হওয়া পর্যন্ত মিছিলে যোগ দেওয়া ঠিক না। রাজনৈতিক দল ভুলপথে নিয়ে যাবে।”
রাশেদ আবার বড় মানুষের মত বলল, “পথে তো নামতে হবে আগে, না হলে জানবি কেমন করে কোনটা ভুলপথ কোনটা ঠিক পথ?”

আমরা যখন বড় হই, তখন আর অন্য অনেক কিছুর সাথে সাথে সাহিত্যরুচিও বদলায়। ছোটবেলায় যেসব গল্পগুলো পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম, সেইগুলোই হয়ত বড় হওয়ার পর হাস্যকর আর ছেলেমানুষীতে ভরা বলে মনে হয়। অবশ্য এমন সব গল্পও থাকে, যেগুলো সময় বয়ে যাওয়া সত্ত্বেও মনকে আগের মতই টানে। আমার বন্ধু রাশেদ গল্পটি যখন প্রথম পড়ি, তখন আমি নেহাৎই ছোট। তখনকার কথা ভাবতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের এক ছোট্ট শহরে চারজন কিশোরের বন্ধুত্ব আর সাহস নিয়ে লেখা গল্পটি পড়তে পড়তে নিজেও কেমন করে গুপ্তযোদ্ধা হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, তা মনে পড়ে। এত দিন পর জাফর ইকবালের লেখা এই গল্পটি যে তার অন্যান্য ছোটগল্প খোঁজার সময় হঠাৎ করে খুঁজে পাব, তা ভাবতে পারিনি। কিশোর বয়সে যেমন ‘বড়’ হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, তার কিছুটা তো গত ক’বছরে হয়েছি, তাই এত দিন পর ভাল লাগবে কিনা, সেই দ্বিধা নিয়েই গল্পটি পড়তে বসেছিলাম। বুঝতে পারি নি যে এত বছর পরেও গভীর অভিমান নিয়ে শেষ হওয়া এই গল্পটি আমাকে আগের মতোই আবেগাপ্লুত করে তুলবে।

আমার মত পাঠকদেরও গল্পটি পড়ে তেমনই লাগবে, সেই বিশ্বাসে মুক্তিযুদ্ধ আর কৈশোর নিয়ে লেখা একাত্তরের এই অসাধারণ প্রতিচ্ছবিটি তুলে দিলাম – আমার বন্ধু রাশেদ , যা আমার মতে জাফর ইকবালের সেরা লেখাগুলোর মধ্যে একটি, আর যা দুই বাংলার যুদ্ধপরবর্তী প্রজন্মদের জন্যে একটি অবশ্যপাঠ্য।

Amar Bondhu Rashed (Rashed, My Friend) – Zafar Iqbal

Of the things that change with our growing up, taste in literature is one. Personally, I have always been intrigued by how the same works that many of us so looked forward to reading when we were young seem childish and laughable when we grow up. Some stories, however, still retain the old appeal over time, and I find Zafar Iqbal’s Amar Bandhu Rashed (Rashed, My Friend) to be one such story. Set in a Bangladeshi town during the liberation war of 1971, it narrates the adventures of four boys who risk their lives to liberate their town from the Pakistani military. Rashed, of course, is the leader of the pack, and his wit and bravery represent the romanticized archetype of the young Bangalee freedom fighter who fought for his land. Perhaps the masterwork by Zafar Iqbal, Amar Bandhu Rashed is probably the best introduction for young Bangalees to wartime literature, and a must read for post-war generations of both Bengals.

আত্মজীবনী ১ – জাফর ইকবাল – রঙিন চশমা / Autobiography 1 – Jafar Iqbal – Rangin Chashma (Tinted Glasses)

Jafar Iqbal-Rangin Chashma

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Zafar Iqbal-Rangin Chashma

রঙিন চশমা – জাফর ইকবাল

এতদিন ধরে যেসব গল্প এই সাইটে তুলেছি, সেগুলোর মধ্যে আত্মজীবনীমূলক লেখা একটিও নেই, তাই এইবারে বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক জাফর ইকবালের রঙিন চশমা  তুলে দিলাম। ১১১ পৃষ্ঠায় ফুটিয়ে তোলা ছাত্রজীবনের গল্প আহামরী লম্বা কিছু নয়, তবে আজকাল মানুষের সময় অল্প, তাই এটুকু আশা করব যে পাঠকরা দৈনন্দিন জীবনের ফাঁকে ফাঁকে গল্পটি পড়বেন। রঙিন চশমা গল্পটির শুরু হয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের শেষে, যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে জাফর ইকবালকে নেহাৎই একজন কিশোর। তার পর ধাপে ধাপে তার বেড়ে ওঠা – যুদ্ধে মৃত বাবাকে কবর দেওয়া, সিগারেট খাওয়া (যা নিচে উদ্ধৃত করেছি), কলেজে থাকাবস্থায় পাগলামী, কার্টুন একে নিজের খরচ চালানো, সিল্ভার নাইট্রেট দিয়ে হাতে মাছ আঁকতে গিয়ে মরতে বসা, আর অ্যামেরিকায় পড়তে যাওয়া – আর অনেক কিছু নিয়েই একটি হাল্কা স্মৃতিচারণা। আজকের জাফর ইকবালকে অনেকটুকুই বোঝা যায় এই লেখাটি পড়লে।

“আমার বাবা অত্যন্ত সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন। তাকে সবচেয়ে সুন্দর দেখাত যখন তিনি সিগারেট খেতেন। তার সিগারেট খাওয়ার একটা সুন্দর ভঙ্গি ছিল যেটা আমি আর কোথাও দেখিনি। মধ্যমা আর তর্জনীর মাঝখানের অংশটুকু মুখে লাগিয়ে সিগারেট টানতেন। বাবা একটু ভাবুক প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, তাই বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক হাত কোমরে রেখে অন্য হাতে সিগারেট টানতে টানতে আকাশের দিকে তাঁকিয়ে একটু আনমনা হয়ে যেতেন। সেই ভঙ্গিটি এক কথায় ছিল অপূর্ব। তাই আমি একেবারে অনেক ছোট থাকতেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে যখন বড় হব তখন আমি বাবার মতো করে সিগারেট খাব।

বড় হওয়ার জন্য অনেকদিন অপেক্ষা করেছি। যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি তখন মনে হল এখন নিশ্চই বড় হয়েছি, এখন সিগারেট খাওয়া শুরু করতে হয়। তাই খুব কষ্ট করে আমি সিগারেট খাওয়া শেখার চেষ্টা করতে লাগলাম। দামি সিগারেট খাওয়ার পয়সা নেই তাই সস্তা সিগারেট দিয়ে সিগারেট খাওয়া শিখছি। সেটা যে কি কষ্ট আমি বলে বোঝাতে পারব না। বিদঘুটে গন্ধ, সিগারেটের ধোঁয়া বুকের ভেতর নিয়ে খকখক করে কাশি, মনে হয় নাড়ি উল্টে আসবে, কিন্তু আমি হাল ছেড়ে দিলাম না।

শেষ পর্যন্ত আমি সিগারেট খাওয়া শিখে গেলাম। সিগারেট খেতে যত আনন্দ তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দ সেটা দশজনকে দেখিয়ে।

একদিন কোথায় জানি যাচ্ছি, হঠাৎ সিগারেট খাবার ইচ্ছে করল। আমি রাস্তার পাশের একটা দোকান থেকে একশলা সিগারেট কিনে মুখে লাগিয়ে আয়েশ করে একটা টান দিয়েছি তখন একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটল। রাস্তার পাশে একটা গাড়ি থেমেছে এবং সেই গাড়ি থেকে দুজন ভদ্রমহিলা নেমে এলেন। তারা অন্য কোথাও যাচ্ছিলেন কিন্তু একজন আমাকে দেখে থেমে গেলেন। কেমন যেন একটা বিস্মিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে আহত গলায় বললেন, “তুমি এত ছোট ছেলে সিগারেট খাও?”

আমি একেবারে থতমত খেয়ে গেলাম। রাস্তার মাঝখানে একজন আমাকে এভাবে সিগারেট খাওয়ার জন্য ধমক দিতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারি নি। কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “আমি মোটেও ছোট ছেলে না। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ি।”

আমার কথায় কোন কাজ হল না। ভদ্রমহিলা কেমন যেন ব্যথিত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন, বললেন, “না। এত ছোট ছেলে তুমি সিগারেট খাবে না।”

আমি কোনমতে তার দৃষ্টি থেকে সরে এলাম – সিগারেট টানতে টানতেই।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় সেই ভদ্রমহিলার সাথে এখন দেখা হলে বলতাম, “এই দেখেন! আমি এখন আর ছোট ছেলে না – আমি কিন্তু আর সিগারেট খাই না।”

কিন্তু তার সাথে আর কখনো দেখা হয়নি।”

Rangin Chashma – Zafar Iqbal

The works that I have uploaded so far on this site have not included any autobiographies, hence, as a first, this upload. Rangin Chashma (Tinted Glasses) written by the popular Bangladeshi author Zafar Iqbal, contains the memoirs of his life as a youth in the 70’s Bangladesh, when the country was just finding its feet after the War of Independence. Anecdotes, emotions and nostalgia – of the days of burying his war-dead father, of hardship, smoking for the first time (quoted below), working as a cartoonist to support himself, and finally going to the US for higher studies – make this book not only a heartwarming read but also a doorway into understanding the author as we know him today.