গান ৬৯ – শীতের বনে / Song 69 – Sheeter Bone (In the Forest of the Winter)

rabindranath-thakur-sheetero-bone-2

আজ আমার সবচেয়ে প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলোর মধ্যে একটি। শীতের বনে  ঋতুটির আগমনের সাথে সাথে প্রকৃতির সবুজ সাজ ছাড়া নিয়ে একটি গান, তাই এক অর্থে সেটি শীতের আগমনী বার্তা। কিন্তু গানটি ঋতুটির রুক্ষতা ও শুষ্কতার বর্ণনা নিয়ে হলেও সেটির মধুর সুর কেন জানি আমাকে ছোটবেলার শীতকালগুলোর সুখস্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। হয়তো শীতের মলিন হিমের মাঝেই ছোট্ট আনন্দগুলো সবচেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ঠেকে, কিংবা হয়তো গানটির রুক্ষতার মাঝে মনে একটু কোমল পরশ বুলায়, তাই। যে কারণেই হোক পাঠকদের সাথে সেই অনুভূতিটুকু ভাগ করে নিতে তাই আজ এটির পংক্তিগুলো তুলে দেওয়া।

যারা শুনতে কিংবা গাইতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে নিচে গানটির দুটি সংস্করণ তুলে দিলাম – একটি মান্না দের গলায়, আর তাই শ্বাশত, আর অন্যটি যারা আধুনিকতার ভক্ত, তাদের জন্যে। শোনার আমন্ত্রণ থাকল।

Today, one of my favourite songs of the Rabindrasangeet genre. Sheetero Bone is a song about the Winter as I know it back home – dry and stern, yet raggedly beautiful and the evoker of a thousand memories from childhood. The lines narrate the changes that would announce the arrival of winter where I grew up – the trees shedding their foliage, the slight but perceptible Northern wind, the dryness tangible in the air… but more than that, they also remind me of what was gentle and sweet about those times – soaking in the warmth of the sun on our balcony, marveling at the dendrites that the trees had become, lighting our own fires out of dead twigs and leaves in the evening, to name a few… Life, with its sobering ways, takes us away from those moments and forces us to assume the mask of a grown-up, but sometimes, an unconscious hum or a prompted recitation is all it takes for us to drown in a flood of memories… Sometimes, it is okay to miss home.

Blow are two renditions of the song – a timeless one by the master, Manna Dey, and a contemporary one in Arnob’s (co)compostion and Warda’s voice – something to listen to or sing along with this winter. Enjoy!

শীতের বনে

শীতের বনে কোন্‌ সে কঠিন আসবে ব’লে
শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে॥
আম্‌লকি-ডাল সাজল কাঙাল,   খসিয়ে দিল পল্লবজাল,
কাশের হাসি হাওয়ায় ভাসি যায় সে চলে॥
সইবে না সে পাতায় ঘাসে চঞ্চলতা
তাই তো আপন রঙ ঘুচালো ঝুম্‌কোলতা।
উত্তরবায় জানায় শাসন,   পাতল তপের শুষ্ক আসন,
সাজ-খসাবার হায় এই লীলা কার অট্টরোলে॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রকৃতি  হতে সংগ্রহীত)

(সংস্করণ ১ – মান্না দে / Version 1 – Manna Dey)

(সংস্করণ 2 – অর্ণব এবং ওয়ার্দা / Version 2 – Arnob ft. Warda)

Advertisements

গল্প ৮৮ – ইছামতি / Story 88 – Ichamati

Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Ichamati 2

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Ichamati

ইছামতি – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কিছুদিন আগে এই সাইটে বিভূতিভূষণের গল্পগুলোতে “সময়ের শান্ত স্রোতে (চরিত্রদের জীবন) ধীরে ধীরে একটি নিরুদ্বেগ অবধারিতের” দিকে প্রবাহিত হওয়া নিয়ে লিখেছিলাম। সে সময় আলোচ্য লেখাটি ছিল আরণ্যক ইছামতি  উপন্যাসটিও সেক্ষেত্রে অনেকটা আরণ্যকের মতই, তবে এই গল্পটির পটভূমি বিহার নয়, বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে গেছে যে ইছামতি নদী, তারই ধারের পাঁচপোতা নামের একটি গ্রাম। অবিভক্ত ভারত তখনো ব্রিটিশদের দখলে, আর মোল্লাহাটির নীলকুঠির অবস্থাও তখন রমরমা। কুঠির দেওয়ান কুলীন ব্রাহ্মন রাজারাম রায়, যার প্রতাপে সারা গ্রাম তটস্থ থাকে। গল্পের শুরুতে রাজারামের তিন বোন তিলু, বিলু আর নিলুর বিয়ে হয় গ্রামে ঘুরতে আসা ভবানী বাড়ুয্যে নামের আরেকজন কুলীনের সাথে। আর যদিও বিভূতিভূষণের এই উপন্যাসটি বিশেষ কোন চরিত্রকে নিয়ে লেখা নয়, গল্পের পরবর্তীটুকুতে মূলত ভবানী ও তার স্ত্রীদের চোখ দিয়েই গ্রামটির সাথে ধীরে ধীরে আমাদের পরিচয় ঘটে।

ইছামতি  উপন্যাসটি যে সময়ের উপর ভিত্তি করে লেখা, তখন নদীপাড়ের জনপদগুলি সেকেলে বাঙ্গালী সমাজের মতই গোঁড়ামী আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। জাতপ্রথা আর নারীর অবদমন থেকে শুরু করে ভারতীয় সমাজের বৃটিশ-আরাধনা আর দুর্বলদের উপর নিপীড়ন – এর সবই উপন্যাসটিতে আমরা দেখি, কিন্তু তা সমালোচকের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং যেন পাঁচপোতার একটি নিতান্তই মানবিক দিনলিপির মাধ্যমে। গ্রামের বুড়ো ব্রাহ্মণদের পরনিন্দা-পরচর্চা, নীলকুঠির কর্মচারীদের দাদাগিরী, আর গ্রাম্যবধূদের গল্প – এসমস্ত রোজনামচার মধ্যে দিয়েই গল্পটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। অথচ তারই মধ্যে তিলুরা ঘোমটা ছাড়া রাস্তায় চলতে শেখে, গ্রামের ছেলেরা এক এক করে কলকাতায় পাড়ি জমায়, আর সাহেবদের সেই নীলকুঠি কিনে নেয় গ্রামেরই এক লালমোহন পাল, যে কম বয়সে কুঠির সাহেব মালিককে দেখে চাবুকের বাড়ি খাওয়ার ভয়ে রাস্তার উপর নিজের সওদাপাতি ফেলে পালিয়েছিল। শ্বাশত আর পরিবর্তনের মাঝে ভারসাম্য রেখে চলা সে অদৃশ্য ধারার গভীর সৌন্দর্যকে বিভূতিভূষণ যেন ইছামতির মাঝেই খুঁজে পান –

কত তরুণী সুন্দরী বধূর পায়ের চিহ্ন পড়ে নদীর দু’ধারে, ঘাটের পথে, আবার কত প্রৌঢ়া বৃদ্ধার পায়ের দাগ মিলিয়ে যায়… গ্রামে গ্রামে মঙ্গলশঙ্খের আনন্দধ্বনি বেজে ওঠে বিয়েতে, অন্নপ্রাশনে, উপনয়নে, দূর্গাপূজোয়, লক্ষীপূজোয়… সে সব বধূদের পায়ের আলতা ধুয়ে যায় কালে কালে, ধূপের ধোঁয়া ক্ষীণ হয়ে আসে… মৃত্যুকে কে চিনতে পারে? গরীয়সী মৃত্যু-মাতাকে? পথপ্রদর্শক মায়ামৃগের মতো জীবনের পথে পথে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে সে, অপূর্ব রহস্যভরা তার অবগুন্ঠন কখনো খোলে শিশুর কাছে, কখনো বৃদ্ধের কাছে… তেলাকুচো ফুলের দুলুনিতে অনন্ত সে সুর কানে আসে… কানে আসে বনৌষধির কটুতিক্ত সুঘ্রাণে, প্রথম হেমন্তে বা শেষ শরতে। বর্ষার দিনে এই ইছামতির কূলে কূলে ভরা ঢলঢল রূপে সেই অজানা মহাসমুদ্রের তীরহীন অসীমতার স্বপ্ন দেখতে পায় কেউ কেউ… কত যাওয়া আসার অতীত ইতিহাস মাখানো ঐ সব মাঠ, ঐ সব নির্জন মাঠের ঢিপি – কত লুপ্ত হয়ে যাওয়া মায়ের হাসি ওতে অদৃশ্য রেখায় আঁকা। আকাশের প্রথম তারাটি তার খবর রাখে হয়তো…

বিভূতিভূষণ ইছামতি লেখার পর সময়ের সাথে সাথে নদীপাড়ের গ্রামগুলি বদলে গেছে অনেক। তবে গ্রামীণ বাংলার যা কিছু চিরন্তন, তাতো আর বদলায়নি, মঙ্গলশঙ্খের আনন্দধ্বনি সময়ে সময়ে নদীপারের গ্রামগুলোতে বেজে ওঠে আজও, রূপসী বধূদের পদচিহ্ন এখনো নদীপারে খানিক্ষণের জন্যে আঁকা হয়ে মুছে যায়। সে মনে করেই বাংলার নদীপাড়ের মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর ভালবাসা নিয়ে বিভূতিভূষণের লেখা এই উপন্যাসটি আজ পাঠকদের জন্যে তুলে দিলাম।

Ichamati – Bibhutibhushan Bandyopadhyay

Following Aranyak, another of Bibhutibhushan Bandyopadhyay’s novels: Ichamati is a narrative of the life along the banks of a river of the same name.  In the early 20th Century, when the subcontinent was under British occupation and indigo plantations were strewn across the undivided Bangla, a plantation by a certain Panchpota village on the river was in its heyday. The owners of that plantation were Englishmen, but their power was wielded through Bangalees who commanded subservience across the entire region. Rajaram, the dewan (secretary) of the plantation, had married off his three sisters to a former ascetic, Bhavani Bandyopadhyay, and it is the latter’s polygynous yet happy family around which the novel develops. Like any other rural Bangalee community of the time, Panchpota was not without its share of superstition, wrongs and biases – but instead of being condemned in Ichamati, those are humanised through the characters. In the novel, the anticipating reader finds the usual village folk who do their usual work – hypocritical, elderly Brahman’s who only gossip idly and criticize others, the hired goons of the plantation who grab land, and the ‘off-the-rocker’ housewife who would say things no one would (or could). Yet, around the daily routines of these people occur silent but subversive changes – Bhavani’s wives learn to walk in public without a veil, and the boys of the village go off to Kolkata to work, one by one… even the ownership of the plantation shifts to a local man. Such changes continue to shape the Indian subcontinent even today. So in that sense, Ichamati helps us understand every Bangalee village then and now. But with its heart-softening narrative of the lives along the river bank, it also offers more than an analytical window into rural Bangla, it teaches us to love her.

কবিতা ২০ – আমাদের ছোটো নদী / Poem 20 – Amader Chhoto Nodi (Our Little River)

Rabindranath Thakur-Amader Chhoto Nodi

সম্পাদিত ছবিটির আদি প্রতিরূপটি নেওয়া হয়েছে ফারদিন ফেরদৌস এর ব্লগ থেকে / The original of the edited photo was taken from Fardieen Ferdous’s blog.

ছোট থাকতে রবি ঠাকুরের লেখাআমাদের ছোট নদী  কবিতাটি পড়েননি এমন কেউ যদি থেকে থাকেন, তাহলে বলব যে বাংলার প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই দেখা মেলা একটি চিরন্তন দৃশ্যের স্মরণীয় বর্ণনা থেকে তারা বঞ্চীত হয়েছেন। আর যারা পড়েছেন, তাদের যতবার কবিতাটি পড়া, ততবারই ভাল লাগার কথা। তাই আজকে সেটি তুলে দিলাম।

Amader Chhoto Nodi (Our Little River) is a beautiful narration of a scene that perhaps every Bangalee knows and loves – the sight of a little river meandering through a village. The lines, which flow so descriptively from the pen of Rabindranath, invoke in the reader the same joy that an observer feels while witnessing the nature and human scenery around the river. I feel that the poem should be close to the heart of everyone who loves Bengal’s rural expanses, hence this post.

আমাদের ছোট নদী

আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।

চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।
কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক,
রাতে ওঠে থেকে থেকে শেয়ালের হাঁক।

আর-পারে আমবন তালবন চলে,
গাঁয়ের বামুন পাড়া তারি ছায়াতলে।
তীরে তীরে ছেলে মেয়ে নাইবার কালে
গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।

সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে
আঁচল ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।
বালি দিয়ে মাজে থালা, ঘটিগুলি মাজে,
বধূরা কাপড় কেচে যায় গৃহকাজে।

আষাঢ়ে বাদল নামে, নদী ভর ভর
মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।
মহাবেগে কলকল কোলাহল ওঠে,
ঘোলা জলে পাকগুলি ঘুরে ঘুরে ছোটে।
দুই কূলে বনে বনে পড়ে যায় সাড়া,
বরষার উৎসবে জেগে ওঠে পাড়া।।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিতা ১ –  একটি শিশির বিন্দু / Poem 1 – Ekti Shishir Bindu (A Glistening Drop of Dew)

এবার এমন একটা কবিতা, যা বাঙ্গালীমাত্রেরই জীবনে অন্তত একবার হলেও শুনে থাকার কথা। মজার ব্যাপার হল, এই কবিতাটার সাথে দুটো বিখ্যাত নাম জড়িত – সত্যজিৎ রায় যখন ছোট্ট থাকতে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন, তখন রবিঠাকুর “এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে” বলে এই কবিতাটা লিখে দিয়েছিলেন তাকে। সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিচারণায় –

Rabindranath Thakur-Ekti Dhaner Shisher Upore Original

কবিতাটি ছাপার অক্ষরে এই –

বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ হতে সংগ্রহীত)

যারা কবিতাটির পংক্তিগুলোর মাঝে প্রকৃতিকে খুঁজে পান, তাদের জন্যে শান্তনু বিশ্বাসের ফ্লিকার পৃষ্ঠা হতে সম্পাদিত একটি ছবি তুলে দিলাম।

Rabindranath Thakur-Ekti Dhaner Shisher Upore 2

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে শান্তনু বিশ্বাসের ফ্লিকার পৃষ্ঠায় / The original of this edited photo was taken from Shantanu Bishwas’s Flickr page.)

Another change, this time, in the form of a poem that I feel every Bangalee must know by heart. Written by Rabindranath Thakur, the poem is beautiful enough in its own meaning, but it is also significant for another reason – the poem was written as an autograph for a young boy by the name of Satyajit Ray, who would go on to become one of the greatest movie directors in history and one of Bangla’s greatest cultural figures.

In English (translation not mine), it reads something like:

I travelled miles, for many a year,
Spent riches, in lands afar,
I’ve gone to see the mountains, the oceans I’ve been to view.
But I haven’t seen with these eyes
What two steps from my home lies
On a sheaf of paddy grain, a glistening drop of dew.

– Rabindranath Thakur (Collected from Sphulinga)