গান ৭৯ – আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম / Song 79 – Aaj Pasha Khelbo Re Shyam (Today You are all ours, Shyam)

আজ বাংলার উত্তর-পূর্বাঞ্চল হতে আসা একটি জনপ্রিয় বাউল গান। আজ পাশা খেলব রে শ্যাম গানটির উৎপত্তি হয় উনবিংশ-শতাব্দীর সিলেটে, যেখান হতে সেটি ক্রমান্বয়ে ধর্মীয় ও ভৌগলিক সীমা পেরিয়ে পূর্ববাংলার অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গানে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য বৈষ্ণব বাউলসঙ্গীতের মত রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থের লেখা এই গানটিও মানুষের মনে ঈশ্বরকে পাওয়ার আকাঙ্খাটুকুকে খেলার ছলে ব্যক্ত করে লেখা। গানটির পংক্তিগুলো আপাতদৃষ্টিতে সহজ ও গ্রাম্য মনে হতে পারে, কিন্তু ভেবে দেখলে কি গভীর অর্থ লুকিয়ে আছে সেগুলোর মাঝে, তা বোঝা যায়। ‘পাশা’ খেলার তাৎপর্যটুকু ধরা যাক – সখারূপে ঈশ্বরকে হয়তো আমরা বাঁধতে পারি, কিন্তু পাশাখেলায় জিতে তাঁকে সত্যিই পাওয়া, সেটা কি তাঁরই ইচ্ছের উপর নির্ভরশীল নয়? অসীমতার সামন্তে আমাদের আর অসহায়তাটুকু এমন সরল ও সুন্দর রূপে অন্য সাহিত্যে কি আমরা সহজে খুঁজে পাই? পাঠকদের ভাল লাগবে, সেই আশায় পংক্তিসহ সেটি আজ তুলে দেওয়া।

Today, a very popular Baul song from the northeast corner of Bengal, Sylhet. Written and composed by the 19th century Vaishnav baul Radharaman Datta Purakayastha, Aaj Pasha Khelbo Re Shyam (Today, You are all ours Shyam) describes a devotee’s desire to be in the presence of God by the ruse of playing dice with Him. At times playful and at times longing, the song has much deeper meanings that are only hinted at by metaphors. Playing dice is an example – we might corner God into playing with us, but even then, it is a game where, in our pursuit of him, we have everything to lose. Simple in its words, and yet profound in its meaning, Aaj Pasha Khelbo Re Shyam has traversed geographic and religious boundaries to become one of the most well-known folk-songs in and beyond Bangladesh. For your reading and listening pleasure, the lyrics and a YouTube rendition is presented below.

আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম

ও শ্যাম রে তোমার সনে
একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম
এই নিঠুর বনে
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম

একেলা পাইয়াছি হেতা পলাইয়া যাবে কোথায় ।।
চৌদিকে ঘিরিয়ারে রাখবো ।।
সব সখি সনে
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম

আতর গোলাপ চন্দন মারো বন্ধের গায় ।।
ছিটাইয়া দাও ছোঁয়া চন্দন ।।
ঐ রাঙ্গা চরণে
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম

দীনহীন আর যাবে কোথায়
বন্ধের চরণ বিহনে ।।
রাঙ্গা চরণ মাথায় নিয়া দীন হীন কান্দে ।।
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম

ও শ্যাম রে তোমার সনে
একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম
এই নিঠুর বনে
আজ পাশা খেলবো রে শ্যাম…

– রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ

পুনশ্চ – নিচে সংযুক্ত ইউটিউব ভিডিওটি একটি বাংলাদেশি ছায়াছবি হতে নেওয়া হয়েছে। গানটির সাথে সেটির দৃশ্যের কতটুকু মিল আছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু সুর ও কথার দিক দিয়ে এটিই আমার কাছে সবচেয়ে ভাল মনে হয়েছে, তাই তুলে দেওয়া। / P.s. The YouTube rendition of the song was taken from a Bangladeshi movie. If you ask me, how much the video relates to the song is questionable, but with regard to music and vocals, the audio seems to have most Bangalee flavor to it, hence the link.

Advertisements

গান ৭৭ – ও নদীরে / Song 77 – O Nodi Re (O River)

আজ একটি গান, যা সেই ছেলেবেলা থেকে আজ পর্যন্ত গেয়ে আসছি। ও নদীরে গানটি ছোটবেলা থেকেই আমার কেন এত ভাল লাগে জানিনা – হয়তো নদীর অসীমের দিকে নিরন্তর বয়ে চলা, তা দেখে ছেলেবেলার বিষ্ময় আর পরিণত বয়সের প্রশ্নগুলোয় সেটি ভাষা ও সুর যোগায় বলে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলায় গাওয়া এই গানটি প্রায়ই মনে মনে গুনগুন করি, কিন্তু তুলব তুলব করেও কেন জানি এতদিন তুলে দেওয়া হয়নি। আজ খানিকটি অবসরের মাঝে হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ায় অনেক দিনের বিরতি ভেঙ্গে আজ গানটি তুলে দিলাম – গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কলমে আর হেমন্তের গলায় ও নদীরে – আশা করি পাঠকদের ভাল লাগবে।

পুনশ্চ – গান শুনতে যারা ভালবাসেন, তাদের জন্যে ইউটিউব থেকে গানটির একটি সংস্করণ নিচে তুলে দিলাম।

Today, a song that I have known and loved since childhood. I don’t remember when I first heard O Nodire (O River), but every time I hear the song, I fall in love with it all over again. Written by Gauriprasanna Mazumdar and sung by the most wonderful of singers, Hemanta Mukhopadhyay, the song is Man’s eternal and wondering question to the River about why she is and her purpose. She does not reply back, however. Perhaps fittingly… some questions are meant to be answered from within, after all. Anyways, I hope you will like this song of the meandering river as much as I love it. A YouTube link is attached below, and if you wish to sing to the tune, the lyrics are given as well.

ও নদীরে…

ও নদীরে,
একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে
বলো কোথায় তোমার দেশ
তোমার নেই কি চলার শেষ
ও নদীরে…

তোমার কোনো বাঁধন নাই তুমি ঘর ছাড়া কি তাই ।।
এই আছো ভাটায় আবার এই তো দেখি জোয়ারে
বলো কোথায় তোমার দেশ
তোমার নেই কি চলার শেষ
ও নদীরে…

এ কূল ভেঙে ও কূল তুমি গড়ো
যার একূল ওকূল দুকূল গেল তার লাগি কি করো?

আমায় ভাবছো মিছেই পর, তোমার নেই কি অবসর
সুখ দুঃখের কথা কিছু কইলে না হয় আমারে …
বলো কোথায় তোমার দেশ
তোমার নেই কি চলার শেষ
ও নদীরে…

শিল্পীঃ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
সুরকারঃ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়
গীতিকারঃ গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার

গান ৭৫ – হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল / Song 75 – Hari Din to Gelo Sandhya Holo (Carry me Across, O Lord)

আজ পাঠকদের জন্যে আমার প্রিয় একটি গান। হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল  বৃহত্তর বাংলার, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের, সবচেয়ে জনপ্রিয় ভক্তিমূলক গানগুলোর মধ্যে একটি। লালনশিষ্য কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের লেখা এই গানটি এক কথায় ঈশ্বরের কাছে পৃথিবীর মোহ হতে মুক্ত কিংবা দুঃখভারে ভেঙ্গে পড়া মানুষের চিরন্তন আর্তি – একূল আর ও কূলের মাঝে যে অসীম সাগর, তা পার করে তাকে পরপারে নেওয়ার। বাংলার লোকসঙ্গীতের মাঝে যে কত গভীর আধ্যাত্মিকতা নিহিত আছে, তার একটি উদাহারণ এই গান।

বাংলা লোকসঙ্গীতের সাথে যারা পরিচিত, তারা হয়তো এই গানটির ঈশ্বরকে মাঝি রূপে কল্পনার সাথে অন্যান্য লোকগানের সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন। সেটি আশ্চর্য নয়। নদীমাতৃক বাংলার কবিরা যে মর্ত্য আর পরলোকের সংযোগকারীর উপমা খেয়াঁর মাঝির মাঝে খুঁজে পাবেন, তাই তো হওয়ার কথা।

যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে আরতি মুখোপাধ্যায়ের গলায় গানটির একটি ইউটিউব সংস্করণ নিচে তুলে দিলাম।

Today, a heartfelt song of faith – one that you must have heard if you are a Bangalee on the western side of the border, or a listener of Bangla folk music on the eastern side. Written by Kangal Harinath Majumdar, Hari Din to Gelo (Carry me Across, O Lord) is a soulful call to God by a seeker who is in the twilight of his/her life. Weary of the world on this shore, (s)he wishes to cross over to the other side – a realm truer and more profound than holy texts can convey. But lacking the piety that would allow him/her to cross the waters, the seeker can only appeal keeping fatih in God’s mercy – something that is beautifully expressed in this song.

If you are familiar with Bangla devotional songs, you should find Hari Din to Gelo to be a classic Bangalee representation of God as a boatman. It should not be surprising – Bangla, after all, is a land crisscrossed by a thousand rivers. Who else could carry us away from that we want to leave, but a boatman?

হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল

হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !
তুমি পারের কর্তা শুনে বার্তা
ডাকি হে তোমারে ।
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

আমি আগে এসে
ঘাটে রইলাম বসে –
ওহে – আমায় কি পার করবেনা হে ?
আমায় কি পার করবেনা হে ?
আমি অধম বলে –
যারা পাছে এল আগে গেল
আমি রইলাম পড়ে !
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

শুনি কড়ি নাই যার
তুমি তারেও কর পার !
আমি সেই কথা শুনে ঘাটে এলাম হে
সেই কথা শুনে ঘাটে এলাম হে
কড়ি নাই যার
তুমি তারেও কর পার !
আমি দিন ভিখারি নাইকো কড়ি
দেখ ঝুলি ঝেড়ে !
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

আমার পারের সম্বল
দয়াল নামটি কেবল !
তাই দয়াময় বলে ডাকি তোমায় হে
অধম তারণ বলে ডাকি তোমায় হে
পারের সম্বল
দয়াল নামটি কেবল !
ফিকির কেদে আকুল
পড়ে অকুল পাথারে সাঁতারে !

হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !
তুমি পারের কর্তা শুনে বার্তা
ডাকি হে তোমারে ।
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

– কাঙাল হরিনাথ মজুমদার

গান ৭৪ – বাড়ির কাছে আরশিনগর / Song 74 – Barir Kachhe Aarshinagar (City of Mirrors)

আজকের ভণিতার বিষয়টুকু বেশ জটিল। একই তত্ত্বের সাধক বা একই পথের যাত্রী যারা, তাদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব কিংবা রেষারেষি থাকবে, তা আশ্চর্য নয়, কিন্তু সম্পর্কটি যদি নারী ও পুরুষের মাঝে হয়? বিপরীত লিঙ্গের মধ্যেকার সহজাত আকর্ষণটুকু কি সেই সাধনা বা যাত্রাটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়, নাকি সেগুলোর অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়?

প্রশ্নগুলো করছি কারণ বাউলসম্রাট লালন সাঁইয়ের বাড়ির কাছে আরশিনগর  কবিতাটি পড়তে গিয়ে সেগুলো মনে এলো। বাউলদের আমরা সাধক বলে জানি, কিন্তু তাঁরা যে মানবিক প্রবৃত্তির প্রভাবগুলো হতে পুরোপুরি মুক্ত, তা কি সত্যি? লালন সাঁইয়ের ভাষায় –

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত, দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁকে রে।।

হয়তো আমাদের কেউই পুরোপুরি মুক্ত নই, কিংবা আমিই হয়তো আধ্যাত্মিক মিলনের আকাঙ্খাকে সাধারণ মানুষের আসক্তি ভেবে ভুল করছি। যাই হোক, ক্ষুদ্র মনের অনুধাবনের বাইরের প্রশ্নগুলি বাউলসম্রাটের কবিতাটিসহ পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে, এই আশায় তুলে দিলাম।

A few questions for my readers today: In our pursuits of divine truths or higher goals, how do our relationships with fellow pursuers of the opposite gender matter? Does the sexuality that is entwined with gender intensify the camaraderie (or competition) between travelers on the same path? And does it influence, or perhaps taint, the very pursuit itself?

I write the questions because reading Lalon Sain’s Barir Kachhe Aarshinagar (City of Mirrors) made me think of those. Quoting from the source of the translation:

Bauls hold women in high esteem. They are essential to the male practitioner’s success in sadhana. This is one of Lalon’s many songs that secretly refer to the sadhika (female practitioner) or to the sahaj manus (natural person) within her.

Yet to me, the explanation seems to merely be a summarization of something more profound. Perhaps you know what I mean? The questions asked are far from simple, and a discussion of those require more than a blog post, and more than a knowledge of literature. So let me leave those for your weekend tea-parties – you will need more than a cup, I am sure :).

A translation of the poem by the Bangla scholar, Dr. Carol Salomon, is provided below.

বাড়ির কাছে আরশিনগর

বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শি বসত করে।
আমি একদিন না দেখিলাম তারে।।
গিরাম বেড়ে অগাধ পানি
ও তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে
মনে বাঞ্ছা করি দেখব তারে
কেমনে সে গাঁয় যাই রে।।
বলবো কী সেই পড়শির কথা
ও তার হস্তপদ স্কন্ধমাথা, নাই রে
ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর
ক্ষণেক ভাসে নীরে।।
পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত, দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁকে রে।।

– লালন সাঁই

Barir Kachhe Aarshinagar (The City of Mirrors)
(Translated by Carol Salomon)

I have not seen her even once–
my neighbor
who lives in the city of mirrors
near my house.
Her village is surrounded
by deep boundless waters,
and I have no boat
to cross over.
I long to see her,
but how can I reach
her village?
What can I say
about my neighbor?
She has no hands, no feet,
no shoulders, no head.
Sometimes she floats high up in the sky,
sometimes in the water.
If my neighbor only touched me,
she would send the pain of death away.
She and Lalon are in the same place,
yet five hundred thousand miles apart.

– Lalon Sain

গান ৭২ – পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে / Song 72 – Prithibita Naki Chhoto Hote Hote (Light-years Apart in a Shrinking World)

লম্বা একটি বিরতির পর আজকে একটু অন্যরকম একটা পোস্ট – পৃথিবীটা নাকি গানটি এই সাইটে তোলা অন্যান্য গানগুলোর চাইতে বিষয় ও ধারা, দু দিক দিয়েই একটু আলাদা। আজকের এই যুগে ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা কতভাবেই না অন্যদের সাথে সংযুক্ত, কিন্তু সেই প্রযুক্তির হাত ধরেই আপনজনদের কাছ থেকে যে আমরা কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি বা গেছি, তা কি আমরা মনে রাখি? পাঠকদের মধ্যে যারা শহুরে, তাদের হয়তো সেই একাকিত্বটুকু একটু বেশিই বাস্তব হয়ে ঠেকে। নগরায়ণ আর প্রযুক্তিগত সংযোগের মাঝে সেই  নিঃসঙ্গতাই ফুটে উঠেছে এই গানটিতে – মহীনের ঘোড়াগুলির পৃথিবীটা নাকি

গানটির কথা যখন লিখলাম, তখন মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। পাঠকদের অনেকেই হয়তো জানেন যে মহীনের ঘোড়াগুলি উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রক ব্যান্ডগুলোর মধ্যে একটি। জীবনানন্দ যেমন তাঁর সময়ে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন সাহিত্যধারাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডটিও বাংলার সঙ্গীতজগতে অনেকটা সেভাবেই রক সঙ্গীতধারার প্রচলিত করে। ব্যান্ডটির নাম যে জীবনানন্দের কবিতা থেকেই নেওয়া, তা আর বিস্ময়ের কি? বাংলা ও উপমহাদেশীয় ব্যান্ড সঙ্গীতধারার উপর মহীনের ঘোড়াগুলির প্রভাব যে কি বিশাল, তা বোঝানোর জন্যেপৃথিবীটা নাকি গানটিই যথেষ্ট – গানটি প্রকাশের পরবর্তী বছরগুলোতে সীমান্তের এপার আর ওপার, দুই বাংলারই অনেক গায়কেরা গানটি গেয়েছেন বা সেটি দ্বারা অনুপ্রাণিত করেছেন। বাংলাদেশের নগরবাউল ব্যান্ডের জেমস এর গাওয়া বলিউড সঙ্গীত ভিগি ভিগি  গানটি শুনলেই সেটি বোঝা যায়।

গান শুনতে যারা ভালবাসেন, তাদের জন্যে গানটির পংক্তির সাথে সাথে নিচে একটি ইউটিউব ভিডিও সংযুক্ত করে দিলাম। আশা করি সবার ভাল লাগবে।

In a way of breaking what has been an extended hiatus, a song that I have been thinking of putting up for quite some time. If you are a reader who grew up listening to rock songs in the eighties’ or nineties’ Bangla, you probably know about Moheener Ghoraguli (Moheen’s Horses), if not, you should! One of the first rock bands in the subcontinent, they played a pioneering role in establishing Rock as a genre in the Bangla music, and have had an immense influence on the bands which followed, and continue to follow their footsteps even today. Case on point: Prithibita Naki Chhoto Hote hote (Light-years Apart in a Shrinking World) – a song of citidwelling lovers who grow light-years apart because of the very technology that is supposed to connect them. In this era of Facebook, Twiter and WhatsApp, does that sound familiar? One of their most famous hits, the song has been covered by many famous singers in both Bangladesh and India, and has influenced many famous hits as well. Listen to the song on Youtube below, and then check out the Bollywood hit Bheegi Bheegi sung by the Bangladesh rockstar James, and you will know exactly what I mean. Old stuff, gold stuff – Prithibita Naki a truly interesting example of art moving across boundaries and cultures.

পৃথিবীটা নাকি

পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে
স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে
ড্রয়িং রুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে
যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে
ঘুঁচে গেছে দেশ কাল সীমানার গণ্ডি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

সারি সারি মুখ আসে আর যায়
নেশাতুর চোখ টিভি পর্দায়
পোকামাকড়ের আগুনের সাথে সন্ধি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
পাশাপাশি বসে একসাথে দেখা
একসাথে নয় আসলে যে একা
তোমার আমার ভাড়াটের নয়া ফন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

স্বপ্ন বেচার চোরা কারবার
জায়গা তো নেই তোমার আমার
চোখ ধাঁধানোর এই খেলা শুধু বন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
তার চেয়ে এসো খোলা জানালায়
পথ ভুল করে ভুল রাস্তায়
হয়ত পেলেও পেতে পারি আরো সঙ্গী,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

– মহীনের ঘোড়াগুলি
.

গান ৬৯ – শীতের বনে / Song 69 – Sheeter Bone (In the Forest of the Winter)

rabindranath-thakur-sheetero-bone-2

আজ আমার সবচেয়ে প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলোর মধ্যে একটি। শীতের বনে  ঋতুটির আগমনের সাথে সাথে প্রকৃতির সবুজ সাজ ছাড়া নিয়ে একটি গান, তাই এক অর্থে সেটি শীতের আগমনী বার্তা। কিন্তু গানটি ঋতুটির রুক্ষতা ও শুষ্কতার বর্ণনা নিয়ে হলেও সেটির মধুর সুর কেন জানি আমাকে ছোটবেলার শীতকালগুলোর সুখস্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। হয়তো শীতের মলিন হিমের মাঝেই ছোট্ট আনন্দগুলো সবচেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ঠেকে, কিংবা হয়তো গানটির রুক্ষতার মাঝে মনে একটু কোমল পরশ বুলায়, তাই। যে কারণেই হোক পাঠকদের সাথে সেই অনুভূতিটুকু ভাগ করে নিতে তাই আজ এটির পংক্তিগুলো তুলে দেওয়া।

যারা শুনতে কিংবা গাইতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে নিচে গানটির দুটি সংস্করণ তুলে দিলাম – একটি মান্না দের গলায়, আর তাই শ্বাশত, আর অন্যটি যারা আধুনিকতার ভক্ত, তাদের জন্যে। শোনার আমন্ত্রণ থাকল।

Today, one of my favourite songs of the Rabindrasangeet genre. Sheetero Bone is a song about the Winter as I know it back home – dry and stern, yet raggedly beautiful and the evoker of a thousand memories from childhood. The lines narrate the changes that would announce the arrival of winter where I grew up – the trees shedding their foliage, the slight but perceptible Northern wind, the dryness tangible in the air… but more than that, they also remind me of what was gentle and sweet about those times – soaking in the warmth of the sun on our balcony, marveling at the dendrites that the trees had become, lighting our own fires out of dead twigs and leaves in the evening, to name a few… Life, with its sobering ways, takes us away from those moments and forces us to assume the mask of a grown-up, but sometimes, an unconscious hum or a prompted recitation is all it takes for us to drown in a flood of memories… Sometimes, it is okay to miss home.

Blow are two renditions of the song – a timeless one by the master, Manna Dey, and a contemporary one in Arnob’s (co)compostion and Warda’s voice – something to listen to or sing along with this winter. Enjoy!

শীতের বনে

শীতের বনে কোন্‌ সে কঠিন আসবে ব’লে
শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে॥
আম্‌লকি-ডাল সাজল কাঙাল,   খসিয়ে দিল পল্লবজাল,
কাশের হাসি হাওয়ায় ভাসি যায় সে চলে॥
সইবে না সে পাতায় ঘাসে চঞ্চলতা
তাই তো আপন রঙ ঘুচালো ঝুম্‌কোলতা।
উত্তরবায় জানায় শাসন,   পাতল তপের শুষ্ক আসন,
সাজ-খসাবার হায় এই লীলা কার অট্টরোলে॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রকৃতি  হতে সংগ্রহীত)

(সংস্করণ ১ – মান্না দে / Version 1 – Manna Dey)

(সংস্করণ 2 – অর্ণব এবং ওয়ার্দা / Version 2 – Arnob ft. Warda)

গান ৬৬ – জয় বাংলা, বাংলার জয় / Song 66 – Joy Bangla, Bangla’r Joy (Victory to Bangla)

ডিসেম্বরের শুরু আজ। আমাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি, তাদের মনে মাসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ – একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তো বাংলাদেশ বিজয় লাভ করেছিল এই মাসের ১৬তেই। বিজয়ের মাসে তাই বিজয়ের একটি গান – গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও আনোয়ার পারভেজ এর সুরে জয় বাংলা, বাংলার জয়  বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে একটি। একাত্তরে যখন বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে রেডিও তরঙ্গে ভেসে আসা জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি তাদের অনুপ্রেরণা যোগাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শেশ হয়ে গেছে ৪৫ বছর আগেই, কিন্তু যেসব কারণে যুদ্ধ, তার অনেককটিই দুই বাংলাতেই এখনো বর্তমান। সেসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণাস্বরূপ তাই আজ এই গানটি তুলে দেওয়া।

It’s December – a month of significance for Bangalees, and particularly, Bangladeshis. It was on the 16th of this month, in 1971, that the Bangladeshi militia (and the supporting Indian allies) defeated the Pakistani army and their associates after a nine month War of Independence. The war saw millions become refugees, and by some estimates, about 3 million deaths – needless to say, it was dark period for the Bangalees who lived through it. During those times, Muktijoddhas (freedom fighters) in the thick of war would draw inspiration from songs Bangladeshi refugee artists wrote and sung over the airwaves from India. Joy Bangla Bangla’r Joy (Victory to Bangla) is one of the most famous of those songs. Written by Gazi Majharul Anwar, it was simultaneously an expression of anger at the atrocities by the Pakistan army and a call to action against them. On this month and in these times of forgetfulness, it is only appropriate that this thrilling and patriotic song is added to this site.

জয় বাংলা, বাংলার জয়

জয় বাংলা, বাংলার জয়,
হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়
কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়।।

বাংলার প্রতি ঘরে ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে
আমাদের রক্ত টগবগ দুলছে মুক্তির দৃপ্ত তারুণ্যে
নেই ভয়, হয় হোক রক্তের প্রচ্ছদ পট
তবু করিনা করিনা করিনা ভয়।।

অশোকের ছায়ে যেন রাখালের বাঁশরী
হয়ে গেছে একেবারে স্তদ্ধ
চারিদিকে শুনি আজ নিদারুণ হাহাকার
আর ওই কান্নার শব্দ।

শাসনের নামে চলে শোষণের সুকঠিন যন্ত্র
বজ্রের হুঙ্কারে শৃঙ্খল ভাঙ্গতে সংগ্রামী জনতা অতন্দ্র
আর নয়, তিলে তিলে বাঙালীর এই পরাজয়
আমি করিনা করিনা করিনা ভয়।।

ভূখা আর বেকারের মিছিলটাকে যেন ওই
দিন দিন শুধু বেড়ে যাচ্ছে
রোদে পুড়ে জলে ভিজে অসহায় হয়ে আজ
ফুটপাতে তারা ঠাঁই পাচ্ছে।

বারবার ঘুঘু এসে খেয়ে যেত দেবনা তো আর ধান
বাংলার দুশমন তোষামুদী চাটুকার
সাবধান, সাবধান, সাবধান
এই দিন, সৃষ্টির উল্লাসে হবে রঙীন
আর মানিনা, মানিনা কোন সংশয়।।

মায়েদের বুকে আজ শিশুদের দুধ নেই
অনাহারে তাই শিশু কাঁদছে
গরীবের পেটে আজ ভাত নেই ভাত নেই
দ্বারে দ্বারে তাই ছুটে যাচ্ছে।

মা-বোনেরা পরণে কাপড়ের লেশ নেই
লজ্জায় কেঁদে কেঁদে ফিরছে
ওষুধের অভাবে প্রতিটি ঘরে ঘরে,
রোগে শোকে ধুকে ধুকে মরছে
অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই
অত্যাচারী শোষকদের আজ
মুক্তি নাই, মুক্তি নাই , মুক্তি নাই।

– গাজী মাজহারুল আনোয়ার
(সুর) আনোয়ার পারভেজ

গান ৬৪ – হৃদ-মাঝারে রাখিব (কত লক্ষ জনম ঘুরে) / Song 64 – Hrid Majhare Rakhibo (Kato Lakkho Janom Ghure/After A Million Incarnations)

বাংলা সাহিত্য আর সঙ্গীত নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করলেও সে বিষয়গুলোতে যে নিজের জ্ঞান কতটা সীমিত, তা আজকের লেখাটি যেই গানটিকে নিয়ে, সেটি শুনে নতুন করে মনে পড়ে গেল। ইউটিউবে ঘোরাঘুরি করতে করতে দ্বিজ ভূষণ এর লেখা আর আনুশেহ অনাদিল এর গলায় এই বৈষ্ণবগীতিটি খুঁজে পাই। গানটা তারপর থেকেই মনে বেজে চলেছে, তাই শোনার আনন্দটুকু পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিতে আজ এই সাইটে পংক্তিসহ সেটি তুলে দেওয়া। দ্বিজ ভূষণ সম্বন্ধে আমার বেশি জানা নেই, তবে যা মনে হয়, তিনি লালনের সমসাময়িক একজন গীতিকার। পাঠকদের জানা থাকলে অনুগ্রহ করে এই পোস্টে মন্তব্য করবেন। বাংলা লোকগীতি যারা শোনেন, তাদের হয়ত আনুশেহ অনাদিলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। যারা নতুন, তাদের উপরে সংযুক্ত করা গানটি শোনার আমন্ত্রণ রইল। বাংলার লোকগানের সাথে শ্বাস্ত্রীয় আর খানিকটা পশ্চিমা সুরের অপূর্ব সুন্দর সমন্বয় রয়েছে এতে – দ্বিজ ভূষণ এর কত লক্ষ জনম ঘুরে – যা এক অর্থে ভক্তিমূলক, আর অন্য অর্থে ভালবাসার মানুষটিকে ছাড়তে না চাওয়ার গান।

In the course of my work on this site, the occassional epiphanies that I know very little about Bangla literature and songs are, more often than not, humbling. Sometimes, however, it comes with the unadulterated joy of a piece never read, or a song never heard before. Today, while surfing across YouTube, I came across Dwij Bhushan’s Kato Lakkho Janom Ghure (After A Million Incarnations), and the song has been resonating in my mind since. Whether that is because of Dwij Bhushan’s words, or Anusheh Anadil’s soulful voice, or the superb incorporation of the esraj into a folk song, I do not know, but in the hope that you too will find what I found in the song, this post. For your listening pleasure, a YouTube link is provided above, and if you wish to pour your heart into a chorus, the lyrics are given below – Dwij Bhushan’s Kato Lakkho Janom Ghure, a song of not letting go.

(In case you are not familiar with the Bangla script, a transliteration can be found here.)

কত লক্ষ জনম ঘুরে

কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে, মনরে……মনরে……
কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে, আমরা পেয়েছি ভাই মানব জনম
এ জনম চলে গেলে, এ জনম চলে গেলে আর পাবো না
না না না আর মিলবে না
তাই হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
আমরা আর পাব না, আর পাব না।
“তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না” (২)

ভূবনো মোহনো গোরা, কোন মণিজনার মনোহরা
মণিজনার মনোহরা
ওরে রাধার প্রেমে মাতোয়ারা চাঁদ গৌড়
ধূলায় যাই ভাই গড়াগড়ি
যেতে চাইলে যেতে দেবো না, না না না। (২)
যেতে দেবো না।
তোমায় হৃদয় মাঝে……
তোমায় হৃদয় মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

“যাবো ব্রজের কুলে কুলে” (২)
আমরা মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
ওরে পাগল মন…
যাবো ব্রজের কুলে কুলে
মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
“ওরে নয়নেতে নয়ন দিয়ে রাখবো তারে” (২)
চলে গেলে… চলে গেলে যেতে দেবো না,
না না… যেতে দেবো না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

যে ডাকে চাঁদ গৌড় বলে, ওগো ভয় কিগো তার ব্রজের কুলে
যে ডাকে চাঁদ গৌড় বলে, ভয় কিগো তার ব্রজের কুলে
ভয় কি তার ব্রজের কুলে
“ওরে দ্বিজ ভূষণ চাঁদ বলে” (২)
চরন ছেড়ে দেবো না, না না না……
ছেড়ে দেবো না
তোমায় বক্ষ মাঝে……
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড় আর পাবো না
ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
আর পাব না না না না, আর পাব না।
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় হৃদ মাঝারে…

– দ্বিজ ভূষণ

গান ৬২ – আনন্দধারা বহিছে ভুবনে / Song 62 – Anondodhara Bohichhe Bhubone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe)

rabindranath-thakur-anandodhara-bohichhe-bhubone

পূজোর মৌসুম আজ, তাই এই সাইটে সচরাচর যা তুলি, আজ তার চাইতে খানিকটা আলাদা একটি কবিতা – নিজেদের ক্ষুদ্রচিন্তা ও স্বার্থপরতাকে উপেক্ষা করে এই মহাসৃষ্টির অপার সৌন্দর্য্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার অনুপ্রেরণাস্বরূপ – রবিঠাকুরের আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। গান শুনতে যারা ভালবাসেন, তাদের জন্য অদিতি মহসীনের গলায় গাওয়া গানটির একটি মধুর সংস্করণ নিচে সংযুক্ত করে দিলাম।

শারদীয় শুভেচ্ছা সবাইকে।

For many Bangalees, it is that joyous time to which they have been counting down for months, and in keeping with the festivities, a spiritual prompt to shed the self-centredness that fills our lives with trivial sorrows and sip joyously instead from the cosmic cascade that flows all around us. In more implicit ways than I can fathom (I certainly overlook more than I grasp), Rabi Thakur’s Anondodhara Bohichhe Bhubone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe) is a masterful distillation of a beautiful and profound understanding of this universe, and one that invokes hope and awe within us in equal measure. I do not know of poems that add dimension to celebration as Anondodhara Bohichhe Bhubone does, but knowing this one poem leaves me immensely glad. On this onset of Puja festivities, I can only share that feeling with you, and I will hope you feel the same way when you read the lines.

P.s.: The translation below is an adaptation of one written by Rumela Sengupta, and therefore reflects my literary inclinations (or lack of taste). You can find the unadulterated version here. For those of you who prefer listening, a beautiful rendition of the song by Aditi Mohsin is linked below.

Autumnal greetings, everyone.

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,
দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে ॥
পান করে রবি শশী অঞ্জলি ভরিয়া–
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি–
নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে ॥

বসিয়া আছ কেন আপন-মনে,
স্বার্থনিমগন কী কারণে?
চারি দিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহীত)

Anondodhara Bohichhe Bhubhone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe)
(Translation inspired by a version written by Rumela Sengupta in the Gitabitan website)

A cascade of joy flows through the universe
night and day – an ambrosia spilling from the heavens above.
The sun and the moon drink up the sweet nectar
in handfuls, ever luminous in their inextinguishable glow
which falls upon the earth – brimming with life and light.

Why do you sit there, lost in thought,
What keeps you immersed in your selfishness?
Let your heart spread its wings, and look around.
Value little, this trifling pain of yours
And let love permeate the void in your life.

– Rabindranath Thakur (Collected from Puja)

গান ৪৮ – মিলন হবে কত দিনে / Song 48 – Milan Habe Kato Dine (When will I be united?)

আরেকবার লালন, আর এবার মনের মানুষের সাথে মিলিত হওয়ার গভীর আকাঙ্খা নিয়ে একটি গান। লালন সাঁই তার গানগুলির অনেককটিই রচনা করেছিলেন লোকজ হিন্দু কিংবা মুসলিম আধ্যাত্মিকতার উপর ভিত্তি করে। মিলন হবে কত দিনে  তারই একটি উদাহরণ – গানটি লালন খুব সম্ভবত লিখেছিলেন প্রতিটি মানুষের অন্তঃস্থলে সেই রাধাকে দেখতে পেয়ে, যে তার কৃষ্ণের জন্য আকুল হয়ে অপেক্ষা করে থাকে। আরাধ্যজনের প্রতি গভীর প্রেম ও ভক্তি নিয়ে লেখা এই গানটি আজও সমগ্র বাংলাজুড়ে মানুষের মুখে মুখে ফেরে, তাই অনবদ্য এই সংযোজনটুকু আজ ডঃ ক্যারল স্যালোমন এর অনুবাদসহ এখানে তুলে দিলাম। আশা করি পাঠকদের ভাল লাগবে।

পুনশ্চ – ইউটিউবে খোঁজ করতে গিয়ে নিচে সংযোজিত গানটি খুঁজে পেলাম। একজন বাঙ্গালী হিসেবে বাউলগীতির সাথে হিন্দী মেশানোটা আদৌ কাঙ্খিত কিনা, আমার কাছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে হাজার হোক, লালনের গান এটি, ভাষা ও জাতপাতের বিচারটুকু নাহয় আজ তুলেই রাখি। তাছাড়া প্রথাগতের সাথে নতুন সুরের সংমিশ্রণটুকুও মন্দ লাগেনি, তাই গানটি এখানে তুলে দেওয়া।

Again, a song written by the King among Bauls, and this time, one in which the singer seeks union with the one who holds his/her heart. Lalon often heavily borrowed from Hindu and Muslim mystic thought when writing his songs, and Milan Habe Kato Dine (When will I be united) is one of the most beautiful examples of such borrowal. In the song, Lalon speaks as Radha, who is pining away for her Krishna, but it could not be clearer that in doing so, he is giving voice to the yearning self – or the Radha, if you prefer – within each of us. As I once mentioned in an earlier post, Lalon’s songs were meant to be sung from deep within us, so for your heart and your senses, a rather modern rendition of the song, along with the orginal Bangla lyrics and an English translation by the late Dr. Carol Salomon. Sing along. 🙂

P.s. One might wonder if the addition of Hindi lyrics in the rendition below is amounts to bastardization, but aren’t Lalon’s songs all about transcending religious, caste and cultural barriers? Perhaps such arguments are best reserved for other genres, because however we sing the Baul Samrat’s songs, the message remains unsullied, and the songs remain Lalon’s alone.

মিলন হবে কত দিনে / Milan Habe Kato Dine (When will I be united)

মিলন হবে কত দিনে
আমার মনের মানুষের ও সনে ।।

চাতক প্রায় অহর্নিশি
চেয়ে আছে কালো শশী
হবো বলে চরন দাসী
ও তা হয়না কপাল গুনে ।।

মেঘের বিদ্যুৎ মেঘে যেমন
লুকালে না পাই অন্বেষণ
কালারে হারায়ে তেমন
ঐ রূপ হেরিয়ে দর্পণে।।

যখন ও রূপ স্মরণ হয়
থাকে না লোক লজ্জার ও ভয়
লালন ফকির ভেবে বলে সদাই
প্রেম যে করে সে জানে।

(Translation by Dr. Carol Salomon)

When will I be united with the Man of my Heart?
Day and night like a rainbird I long for the Dark Moon,
hoping to become his maidservant.
But this is not my fate.

I caught a glimpse of my Dark Lord in a dream,
and then he was gone like a flash of lightning
vanishing into the cloud it came from, leaving no trace.
Meditating on his image I lose all fear of disgrace.

Poor Lalon says, he who always loves, knows.

– লালন সাঁই / Lalon Sain

 

গান ৪৭ – আমি বাংলায় গান গাই / Song 47 – Ami Banglay Gan Gai (In Bangla I Sing)

Pratul Mukhopadhyay-Ami Banglay Gaan Gai (2)

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি তুলেছিলেন ডিক ডুর‍্যান্স / Original of the edited photo was taken on the Turag River in Bangladesh by Dick Durrance II)

খুব প্রিয় একটা গান মনে বাজছে বেশ কিছুদিন ধরে, তাই আজ এই লেখাটি। আমি বাংলায় গান গাই  একই সাথে বাংলা দেশ ও বাংলা ভাষাকে নিয়ে। লোকসঙ্গীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা ও সুর করা এই গানটি অনেকদিন আগে থেকে দুই বাংলাতেই জনপ্রিয়, আর সম্প্রতিকালে মাহমুদুজ্জামান বাবুর গাওয়া গানটির একটি আধুনিক সংস্করণও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে। বাংলাকে যারা দেখেছেন, শুনেছেন ও ভালবেসেছেন, এই গানটিতে বাংলাকে ঘিরে তাদের অনুভূতিগুলোই যেন ব্যক্ত হয়েছে, তাই সেসব মানুষদের মনে অনুরণনিত হওয়া সুরে ভাষা যোগাতেই নিচে পংক্তিগুলোসহ গানটির ইউটিউব ভিডিওটি আজ তুলে দিলাম। আশা করি সবার ভাল লাগবে।

In choosing songs and poems and stories to share, I only inflict my biases on you. This song, however, I put up without guilt. If you are a Bangalee, you will know why.

আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই
আমি আমার আমিকে চিরদিন-এই বাংলায় খুঁজে পাই।।
আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর
আমি এই বাংলার মায়া ভরা পথে, হেটেছি এতটা দূর,
বাংলা আমার জীবনানন্দ, বাংলা প্রাণের সুখ
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।।

আমি বাংলায় কথা কই, আমি বাংলার কথা কই
আমি বাংলায় ভাসি, বাংলায় হাসি, বাংলায় জেগে রই
আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
আমি সব দেখেশুনে খেপে গিয়ে-করি বাংলায় চিৎকার,
বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান, ক্ষিপ্ত তীর ধনুক
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।।

আমি বাংলায় ভালোবাসি, আমি বাংলাকে ভালোবাসি
আমি তারই হাত ধরে সারা পৃথিবীর-মানুষের কাছে আসি
আমি যা কিছু মহান বরণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়
মিশে তেরো নদী, সাত সাগরের জল গঙ্গায়-পদ্মায়
বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।।

– প্রতুল মুখোপাধ্যায়

গান ৪৬ – আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে / Song 46 – Aaj Jyotsna-raate Sabai Gechhe Bone (On This Moon-soaked Night)

Rabindranath Thakur-Aaj Jyotsnaraate (2)

বেশ কিছুদিন ধরেই রবিঠাকুরের লেখাগুলোর মাঝে ডুবে আছি, তাই এই সাইটটির সাম্প্রতিক সংযোজনগুলোর ধারাবাহিকতায় আজ কবিগুরুর আরেকটি কবিতা। আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে  গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন বোলপুরে থাকাকালে কোন এক জ্যোৎস্নালোকিত রাতে, সাহিত্যিক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়

“কোন এক উৎসব উপলক্ষে আমরা বহু লোক বোলপুরে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভব ‘রাজা’ নাটক অভিনয় উপলক্ষে। বসন্তকাল, জ্যোৎস্না রাত্রি। যত স্ত্রীলোক ও পুরুষ এসেছিলেন তাঁদের সকলেই প্রায় পারুলডাঙ্গা নামক এক রম্য বনে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কেবল আমি যাইনি রাত জাগবার ভয়ে।… গভীর রাত্রি, হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, মনে হল যেন ‘শান্তিনিকেতনের’ নীচের তলার সামনের মাঠ থেকে কার মৃদু মধুর গানের স্বর ভেসে আসছে। আমি উঠে ছাদে আলসের ধারে গিয়ে দেখলাম, কবিগুরু জ্যোৎস্নাপ্লাবিত খোলা জায়গায় পায়চারি করছেন আর গুন্‌গুন্‌ করে গান গাইছেন। আমি খালি পায়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলাম, কিন্তু তিনি আমাকে লক্ষ করলেন না।, আপন মনে যেমন গান গেয়ে গেয়ে পায়চারি করছিলেন তেমনি পায়চারি করতে করতে গান গাইতে লাগলেন। গান গাইছিলেন মৃদুস্বরে।  তিনি গাইছিলেন ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে…”।

পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে কোন এক জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রিতে তাঁকে মনে করে রবিঠাকুর এই গানটি লিখেছিলেন, এমন একটি ইতিকথা বাঙ্গালীদের মাঝে প্রচলিত। কিন্তু গানটি সত্যিই ঐ প্রেক্ষাপটে লেখা কিনা আমি জানিনা। কিন্তু এটুকু মনে হয় যে প্রিয় কিংবা আরাধ্য কোনও জনের জন্য গভীর ভালবাসা আর বেদনাভরা অপেক্ষা এমন আবেগভরে বোধহয় আর কোনও লেখায় বর্ণিত হয়নি। পাঠকদের মন আর্দ্র করে দিতে তাই গানের পংক্তিগুলো আজ এখানে তুলে দিলাম।

পুনশ্চ – গানটির উপরোক্ত ইতিহাস, এবং এডওয়ার্ড থমসনের লেখা সেটির নিম্নোক্ত ইংরেজি অনুবাদ আমি পেয়েছি গীতবিতান.নেট ওয়েবসাইটটিতে। রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপারে যারা বিস্তারিত জানতে চান, তাদের পৃষ্ঠাটিতে ঘুরে আসার আমন্ত্রণ ও অনুরোধ রইল। তাছাড়া যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে ইউটিউবে পাওয়া গানটির একটি ভিডিও নিচে সংযুক্ত করে দিলাম।

In continuation of my recent immersion in Rabindranath Thakur’s works, another of his songs. From anecdotal evidence, we know that Aaj Jyotsnaraate Sabai Gechhe Bone (On This Moon-soaked Night) was written by Thakur on a moonlit night in Bolpur, but whether it was written from grief at the loss of his younger son Shamindranath, we will perhaps never know. One can be sure, however, that that few works, if any, express with such tenderness the yearning and pain that accompanies Man’s separation from and wait to find a cherished someone (or perhaps God Himself, depending on how you read the poem) he has lost. For the softer corner of your heart, therefore, this song.

P.s. For non-native speakers, I have included two English translations of the song below. The anecdotes about the poem and the translation by Edward Thomson were found in http://www.gitabitan.net, which has a beautiful collection of Thakur’s songs and associated materials. Do take a peek. Also, if you prefer the words sung, you will find a YouTube video of a rendition at the end of this post.

আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে

আজ    জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥
যাব না গো যাব না যে,   রইনু পড়ে ঘরের মাঝে–
এই নিরালায় রব আপন কোণে।
যাব না এই মাতাল সমীরণে ॥

আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে
ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।
আমারে যে জাগতে হবে,   কী জানি সে আসবে কবে
যদি আমায় পড়ে তাহার মনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Aj Jyotsnarate Shabai Geche Bone (On This Moon-soaked Night)

Translation – Version 1- Edward Thomson
(Rabindranath Tagore: The Augustan Books of Modern Poetry, Ernest Benn Ltd. London, 1925)

They have all gone to the woods in this moonlit night,
In the south wind drunken with Spring’s delight.
But I will not go, will not go;
I will stay in the house, and so
Wait in my lonely corner-this night
I will not go in this south wind drunk with delight.

Rather, this room with care
I must scour and cleanse and prepare;
For … if He remembers me, then
He will come, though I know not when;
They must wake me swiftly. I will not fare
Out where the drunk wind reels through the air.

Translation – Version 2

On this moon-soaked night,
they have all gone to frolic in the forest.
The drunk spring breeze beckons, “Come!”
but heed it I will not.
In this desolate corner of my house, I will remain.
No I will not go into this intoxicating night.

I will stay behind
and clean my room with care.
Who knows when he may come?
Remain I must, perchance he remembers me,
and the drunk winds bring him here,
in this moonlit night.
I must stay awake.

– Rabindranath Thakur

গান ৪৫ – যদি প্রেম দিলে না প্রাণে / Song 45 – Jodi Prem Dile Na Praane (If Love Be Denied Me)

Rabindranath Thakur-Jodi Prem Dile Na Praane (1)

ঈশ্বরের কাছে আর্তিমাখা কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর তাঁর নীরবতার মাঝেই আমাদের খুঁজে নিতে হয়। আজ মন খারাপের বৃষ্টিভেজা একটি দিন, তাই।

On questions which God only answers through His silence, a few beautifully written lines by Rabindranath Thakur – for the days when it drizzles in your mind.

যদি প্রেম দিলে না প্রাণে

যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে?।
কেন তারার মালা গাঁথা,
কেন ফুলের শয়ন পাতা,
কেন দখিন-হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে?।
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন আকাশ তবে এমন চাওয়া চায় এ মুখের পানে?
তবে ক্ষণে ক্ষণে কেন
আমার হৃদয় পাগল-হেন
তরী সেই সাগরে ভাসায় যাহার কূল সে নাহি জানে?।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Jodi Prem Dile Na Praane (If love be denied me)

If love be denied me
then why does the morning break its heart in songs,
and why are these whispers
that the south wind scatters among the new- born leaves?
If love be denied me then why does the midnight
bear in yearning silence the pain of the stars?
And why does this foolish heart
recklessly launch its hope on the sea whose end it does not know?

– Rabindranath Thakur
(Collected from Crossing/Puja. Translated by the poet himself)

গান ৪৪ – কে বোঝে মওলার আলেকবাজি / Song 44 – Ke Bojhe Maular Alekbaji (Who Understands God’s Designs)

আজ এই সাইটে প্রথমবারের মত লালন সাঁইয়ের একটি গান। কে বোঝে মওলার আলেকবাজি  গানটির পংক্তিগুলো লালন এর অন্যান্য অনেক গানের মতই সরল ভাষায় লেখা, কিন্তু ঈশ্বরের ক্রিয়ার রহস্যকে বুঝতে গিয়ে মানুষের অসহায়তা বাউল সম্রাট এতে যেভাবে তুলে ধরেছেন, সেটির ব্যাখ্যা দেওয়া আমার সাধ্যের বাইরে। লালন সাঁইয়ের গানগুলো বুঝতে গেলে সেগুলো প্রথমে নিজের মর্মে অনুভব করতে হয়, অন্তত আমার তাই ধারণা। তাই আর ভণিতা না করে পাঠকদের জন্যে উপরোক্ত গানটি তুলে দিলাম।

পুনশ্চ – এই গানটির পংক্তিগুলো আমি খুঁজে পেয়েছি https://lalonsain.wordpress.com সাইটটিতে, যাতে লালন সাঁই এর আরো অনেক গানকে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

Today, a song by the Baul among Bauls, Lalon Shain. Like his other songs, Ke Bojhe Maular Alekbaji is written in simple language, but it is beyond me to explain how, Lalon describes Man’s struggles to understand God’s designs in the songs. If you ask me, his songs are best understood when felt at heart. Hence the lines that follow, for your contemplation.

P.s. – I found the lyrics to the song at https://lalonsain.wordpress.com, which has a wonderful collection of Lalon’s works.

কে বোঝে মওলার আলেকবাজি

Lalon Sain-Ke Bojhe Maula Alekbaji

কে বোঝে মওলার আলেকবাজি।
করছে রে কোরানের মানে
যা আসে যার মনের বুঝি।।

একই কোরান পড়াশুনা
কেউ মৌলবি কেউ মওলানা
দাহেরা হয় কত জনা
সে মানে না শরার কাজি।।

রোজ কেয়ামত বলে সবাই
কেউ বলে না তারিখ নির্ণয়
হিসাব হবে কি হচ্ছে সদাই
কোন কথায় মন রাখি রাজি।।

মলে জান ইল্লিন সিজ্জিন রয়
যতদিন রোজ হিসাব না হয়
কেউ বলে জান ফিরে জন্মায়
তবে ইল্লিন সিজ্জিন কোথায় আজি।।

আর এক বিধান শুনিতে পাই
এক গোর মানুষের মউত নাই
আ-মরি কি ভজন রে ভাই
বাঞ্ছে লালন কারে পুঁছি।।

– বাউল সম্রাট লালন সাঁই

গান ৪৩ – আমার সোনার হরিণ চাই / Song 43 – Amar Sonar Horin Chai (The Golden Deer I want)

রবীন্দ্রনাথের আরেকটি কবিতা – জীবনে অব্যাখ্যনীয় আকাঙ্ক্ষাগুলোর বশে যেটি পাওয়ার নয়, সব কিছু ভুলে তার পিছনে ছোটা নিয়ে।

On unfathomable desires and our vain pursuits of those, a poem by Rabi Thakur. A slightly modified version of a wonderful translation by Anindya Chaudhuri follows. The first link also features a translation by Rumela Sengupta, who, along with a few others, have written exquisite translations of Thakur’s works here.

Rabindranath Thakur-Tora Je Ja Bolish Bhai (2)

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে কাউবয়ফাঙ্ক এর ওয়েব পাতায় / Original artwork by Cowboifunk)

আমার সোনার হরিণ চাই

তোরা  যে যা বলিস ভাই,      আমার সোনার হরিণ চাই।
মনোহরণ চপলচরণ সোনার হরিণ চাই॥
সে-যে  চমকে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায়, যায় না তারে বাঁধা।
সে-যে  নাগাল পেলে পালায় ঠেলে, লাগায় চোখে ধাঁদা।
আমি    ছুটব পিছে মিছে মিছে পাই বা নাহি পাই–
আামি   আপন-মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই॥
তোরা  পাবার জিনিস হাতে কিনিস, রাখিস ঘরে ভরে–
যারে    যায় না পাওয়া তারি হাওয়া লাগল কেন মোরে।
আমার  যা ছিল তা গেল ঘুচে যা নেই তার ঝোঁকে–
আমার  ফুরোয় পুঁজি, ভাবিস, বুঝি মরি তারি শোকে?
আমি    আছি সুখে হাস্যমুখে, দুঃখ আমার নাই।
আমি    আপন-মনে মাঠে বনে উধাও হয়ে ধাই॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রেম হতে সংগ্রহীত)

Amar Sonar Harin Chai (The Golden Deer I want)

Say what you may, the golden deer I want
Elusive it may be, a futile hunt
One who enthrals with her presence but evades my sight
One whom no chains can bind
One who evades my reach from morn to night
I see her hither thither and again I go blind
I wander in pursuit –I know it isn’t right
Darkness around me in broad day light.
You spend your fortune acquiring the cheap
I sow the seeds which no man can reap.
What I had, I wasted
In pursuit of the vain
Think not that I lament
That I am left with no grain
I live life I have a laugh
I am miles away from pain

– Rabindranath Thakur (Translation by Anindya Chaudhuri)

গান ৪০ – এসো হে বৈশাখ / Song 40 – Esho He Boishakh (Come O Boishakh)

Print(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি এঁকেছেন মোস্তাফিজ রহমান / Original artwork by Mostafiz Rahman)

আসছে ১৪২৮। শেষ হতে চলা বছরের হতাশা আর দুঃখগুলোকে পিছনে ফেলে আরেকবার আশায় বুক বাঁধার সময় এখন, তাই পাঠকদের নববর্ষের আগাম শুভেচ্ছা জানাতেই, পহেলা বৈশাখের চিরাচরিত গান – রবি ঠাকুরের এসো হে বৈশাখ – তুলে দিলাম। যারা সুরের মানুষ, তাদের জন্যে নিচে গানের ঢং এ লেখা কলিসহ ইউটিউব হতে গানটি তুলে দেওয়া হলো।

শুভ নববর্ষ !

As Bangla Year 1423 draws to a close, it is time for us to let go of the negatives of this year and start 1424 anew. So, in a way of greeting my readers on the occasion, a post featuring Thakur’s Esho He Boishakh – the quintessential Bangla song of renewal. For those who love music, I have attached a YouTube link to a performance of the song.

Shubho Nabobarsho (Happy New Year) !

এসো হে বৈশাখ

এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ।
তাপসনিশ্বাসবায়ে   মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পুরাতন স্মৃতি,   যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি   শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ।
মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রকৃতি হতে সংগ্রহীত)

(গানের ঢং এ কলিগুলো)

এসো হে বৈশাখ, এসো এসো
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে
মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক
এসো এসো… যাক পুরাতন স্মৃতি
যাক ভুলে যাওয়া গীতি
যাক অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক
যাক যাক
এসো এসো… মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা
অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা
রসের আবেশ রাশি
শুষ্ক করি দাও আসি
আনো আনো, আনো তব প্রলয়ের শাঁখ
মায়ার কুঁজঝটি জাল যাক, দূরে যাক যাক যাক
এসো এসো…

 

গান ৩৮ – এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে / Song 38 – Ekul Bhange Okul Gare (The River of Fate)

Kazi Nazrul Islam-Nodi E-Kul Bhange (2)

অনেকদিন পর নজরুল, তবে এই লেখাটি বিদ্রোহ নয়, বরং বিশাল এই জগতে মানুষের অসহায়ত্ব আর ক্ষুদ্রতা নিয়ে। গানটার প্রথম লাইন ক’টি জানতাম অনেকদিন ধরেই, কিন্তু এটি যে নজরুলের বহুমুখী প্রতিভার একটি উদাহারণ, আজ তা জানতে পেরে আমার শ্রদ্ধান্বিত বিস্ময়টুকু পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিলাম।

After a long time, a poem by Nazrul, and one of his poignant ones at that. Unlike his more celebrated poems that inspire rebellion, E-kul Bhange O-Kul Gare (The River of Fate) depicts the our weakness and insignificance in the grand scheme of things, and is a wonderful testament to Nazrul’s multifaceted talent as a poet.

এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা

এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা।
সকাল বেলা আমির, রে ভাই (ও ভাই) ফকির, সন্ধ্যাবেলা॥
সেই নদীর ধারে কোন্ ভরসায়
বাঁধলি বাসা, ওরে বেভুল, বাঁধলি বাসা, কিসের আশায়?
যখন ধরলো ভাঙন পেলি নে তুই পারে যাবার ভেলা।
এই তো বিধির খেলা রে ভাই এই তো বিধির খেলা॥
এই দেহ ভেঙে হয় রে মাটি, মাটিতে হয় দেহ
যে কুমোর গড়ে সেই দেহ, তার খোঁজ নিল না কেহ (রে ভাই)।
রাতে রাজা সাজে নাচমহলে
দিনে ভিক্ষা মেগে বটের তলে
শেষে শ্মশান ঘাটে গিয়ে দেখে সবাই মাটির ঢেলা
এই তো বিধির খেলা রে ভাই ভব নদীর খেলা॥

– কাজী নজরুল ইসলাম

গান ৩৭ – আমার হিয়ার মাঝে / Song 37 – Amar Hiyar Majhe (You Hid in My Heart)

আমাদের সমস্ত সুখ-দুঃখ আর ভালবাসাসহ সকল অনুভূতির অন্তরালে যেই ঈশ্বর আমাদের চীরসঙ্গী ও আশ্রয় হয়ে থাকেন, মানবিক প্রবৃত্তির বশে তাঁকে কত সহজেই না আমরা অগ্রাহ্য করি, আবার কত সহজেই যে জীবনের নিত্য জাগতিকতার মধ্যে তাঁকে খুজে পাই !রবিঠাকুরের এই কবিতাটি সম্বন্ধে বেশি কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই, তবে এটুকু বলতে পারি যে ঈশ্বরের কাছে ভক্তি আর ভালবাসায় আর্দ্র কোনো স্বীকারোক্তি যদি মানুষের করার থেকে থাকে, তবে সেটি এই।

(যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে  নিচে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার স্বর আর কবিগুরুর সুরে গাওয়া পংক্তিগুলো সংযুক্ত করে দিলাম।)

In the quagmire of emotions in which we are all immersed so deep, how carelessly we forget the presence of the God who remains our companion and refuge throughout our journeys, and yet, how easily we find Him in the sample and mundane aspects of our lives! There is little I could say that would do this poem justice, but to me, if there ever is a confession to God that is soaked in love and devotion, this is it. For those who prefer the words sung, I have attached a YouTube link below.

আমার হিয়ার মাঝে

আমার    হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাই নি।
বাহিরপানে চোখ মেলেছি
হৃদয়পানেই চাই নি।
আমার সকল ভালোবাসায়,
সকল আঘাত, সকল আশায়,
তুমি ছিলে আমার কাছে,
তোমার কাছে যাই নি।

তুমি মোর আনন্দ হয়ে
ছিলে আমার খেলায়।
আনন্দে তাই ভুলে ছিলেম,
কেটেছে দিন হেলায়।
গোপন রহি গভীর প্রাণে
আমার দুঃখ-সুখের গানে
সুর দিয়েছ তুমি,আমি
তোমার গান তো গাই নি।

ওদের কথায় ধাঁদা লাগে
তোমার কথা আমি বুঝি।
তোমার আকাশ তোমার বাতাস
এই তো সবি সোজাসুজি।
হৃদয়-কুসুম আপনি ফোটে,
জীবন আমার ভরে ওঠে,
দুয়ার খুলে চেয়ে দেখি
হাতের কাছে সকল পুঁজি।

সকাল-সাঁঝে সুর যে বাজে
ভুবনজোড়া তোমার নাটে,
আলের জোয়ার বেয়ে তোমার
তরী আসে আমার ঘাটে।
শুনব কী আর বুঝব কী বা,
এই তো দেখি রাত্রিদিবা
ঘরেই তোমার আনাগোনা,
পথে কী আর তোমায় খুঁজি?

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Amar Hiyar Majhe (You Hid In My Heart)

Suddenly the window of my heart flew open this morning, the window that looks out on your heart.
I wondered to see that the name by which you know me is written in April leaves and flowers, and I sat silent.
The curtain was blown away for a moment between my songs and yours.
I found that your morning light was full of my own mute songs unsung;
I thought that I would learn them at your feet-and I sat silent.

– Rabindranath Thakur (Collected from Fruit-Gathering. Translated by the poet himself)

An alternative interpretation of the last two stanzas of the song

Some have thought deeply and explored the meaning of thy truth
and they are great;
I have listened to catch the music of thy play
and I am glad.

– Rabindranath Thakur (Collected from Fireflies)

কবিতা ৩৬ – পরিচয় / Poem 36 – Porichay (Identity)

Rabindranath Thakur-Porichoy (2)

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি তুলেছেন মশিউর রহমান মেহেদী / Original of the edited photo by Moshiur Rahman Mehedi)

মাঝে মাঝে মনে হয় যে জীবনে যে অনুভূতিই আসুক না কেন, রবিঠাকুরের তা নিয়ে লেখা কোন না কোন কবিতা ঠিকই লিখেছেন। গুরুদেবের কবিতা যা কিছু পড়েছি, তা অল্পই, আর যেটুকু বুঝেছি তা তো আরোই কম। তবু তার লেখার অর্থগুলো খানিকটা অনুভব করতে পেরেছি বলে ভাবতে ভাল লাগে। এই পোস্টের উদ্দেশ্যটা অবশ্য খানিকটা আলাদা – জীবনটা আস্তে আস্তে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আমরা কেমন বদলে যাই, তাই না? তখন কি মনে প্রশ্ন জাগে – আমি আসলে কে, কেন এখানে থাকা, কি আমার পরিচয়? দেশ ছেড়ে যারা চলে গেছেন, নিজ আর পরসংস্কৃতির টানাপোড়েনে হয়তো তাদের মনে এই প্রশ্নগুলো একটু বেশি কঠিন হয়েই ঠেকে। প্রশ্নগুলোর উত্তর আমি নিজে এখনো খুঁজে পাইনি, কিন্তু রবিঠাকুরের পরিচয়  যখন পড়ি, তখন কবিতাটির পংক্তিগুলোর মাঝে যেন উত্তরের খানিকটা আভাস আর সান্তনা খুঁজে পাই। যারা এখনো আমার মত উত্তর খুঁজে ফিরছেন, তাদের জন্যে তাই লেখাটি তুলে দিলাম।

Each of us has a life that is unique and wonderful in its own way, yet there is a question that at least once in our lives we all ask ourselves: who am I? Thakur’s answers with a beautiful poem, sung by a traveler who inevitably floats down a metaphorical river that we are to understand as this life, and in the course of his journey, comes across strangers. Of them, a few give him names out of love and kindness, while others ask who he is, but even as he moves on – a different man every moment – he finds only one thing to say to them: “Ami tomaderi lok (I am just one of you)”. The traveler finds his identity in the people he meets along the way.

পরিচয়

একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে,
বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে।
তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি
পরিচয় কোনো আছে নাকি,
যাবে কোন্‌খানে।
আমি শুধু বলেছি, কে জানে।
নদীতে লাগিল দোলা, বাঁধনে পড়িল টান,
একা বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান।
সেই গান শুনি
কুসুমিত তরুতলে তরুণতরুণী
তুলিল অশোক,
মোর হাতে দিয়ে তারা কহিল, “এ আমাদেরই লোক।’
আর কিছু নয়,
সে মোর প্রথম পরিচয়।

         তার পরে জোয়ারের বেলা
সাঙ্গ হল, সাঙ্গ হল তরঙ্গের খেলা;
কোকিলের ক্লান্ত গানে
বিস্মৃত দিনের কথা অকস্মাৎ যেন মনে আনে;
কনকচাঁপার দল পড়ে ঝুরে,
ভেসে যায় দূরে–
ফাল্গুনের উৎসবরাতির
নিমন্ত্রণলিখন-পাঁতির
ছিন্ন অংশ তারা
অর্থহারা।
ভাঁটার গভীর টানে
তরীখানা ভেসে যায় সমুদ্রের পানে।
নূতন কালের নব যাত্রী ছেলেমেয়ে
শুধাইছে দূর হতে চেয়ে,
“সন্ধ্যার তারার দিকে
বহিয়া চলেছে তরণী কে।’
সেতারেতে বাঁধিলাম তার,
গাহিলাম আরবার–
মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক
আর কিছু নয়,
এই হোক শেষ পরিচয়।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সেঁজুতি হতে সংগ্রহিত)

গান ৩৫ – আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো / Song 35 – Amar Bhaiyer Rakte Rangano (My Brothers’ Blood Spattered)

Abdul Gaffar Chowdhury-Amar Bhaiyer Rakte Rangano (2)

আজ একুশে ফেব্রুয়ারী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। দিনটির ব্যাপারে বলতে গেলে বলতে হয় অনেক কিছুই, তবে আজ অরণ্যে রোদনটুকু নাহয় বাদই থাক। শুধু এটুকু বলব যে আজকের বাঙ্গালী সমাজে বিবেচনাহীন পাশ্চাত্যকরণের যে গড্ডালিকা প্রবাহ চলছে, তার বিরুদ্ধে আজও কিছু মানুষ শুধু বুকে বিশ্বাস আর খানিকটা স্বপ্ন রেখে লড়ে চলছে। বাংলাকে যারা ভালবেসে সেই পথটিতে নেমেছেন, তাদের খানিকটা অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্যে সম্ভবত তাদের সবারই প্রাণের খুব কাছের একটি গান – আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো – তুলে দিলাম।

This post is written with somewhat mixed emotions: to a Bangalee, the words ‘Ekushey February (21st February)’ should be so close to the heart that one would not have to explain its significance to him/her at all. But in a time when a dumb acceptance of everything that is Western is the norm, how I wish that was true! There are people, however, who continue to work to uphold and promote Bangla against all odds, and in defiance of the ‘globalization’ to which the rest of us have surrendered. For them, as an inspiration, a song that reminds of a greater sacrifice that we Bangalees once made for our mother-tongue – Amar Bhaiyer Rakte Rangano (My Brothers’ Blood Spattered).

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।

জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশু হত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্রান্তিলগ্নে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।

সেদিনও এমনি নীল গগনের বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকনন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক ঝড় এলো খ্যাপা বুনো।।

সেই আঁধারের পশুদের মুখ চেনা,
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণ্য পদাঘাত এই সারা বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারি
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভায়ের আত্মা ডাকে
জাগো মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাটে
দারুণ ক্রোধের আগুনে আবার জ্বালবো ফেব্রুয়ারি
একুশে ফেব্রুয়ারি একুশে ফেব্রুয়ারি।।

লেখক – আবদুল গাফফার চৌধুরী, সুরকার – আলতাফ মাহমুদ

Amar Bhaiyer Rakte Rangano (My Brother’s Blood Spattered)

Can I forget the twenty-first of February
incarnadined by the love of my brother?
The twenty-first of February, built by the tears
of a hundred mothers robbed of their sons,
Can I ever forget it?
Wake up all serpents,
wake up all summer thunder-storms,
let the whole world rise up
in anger and protest against the massacre of innocent children.
They tried to crush the demand of the people
by murdering the golden sons of the land.
Can they get away with it
at this hour when the times are poised
for a radical change?
No, no, no, no,
In the history reddened by blood
the final verdict has been given already
by the twenty-first of February.
It was a smooth and pleasant night,
with the winter gone nearly
and the moon smiling in the blue sky
and lovely fragrant flowers blossoming on the roadside,
and all of a sudden rose a storm,
fierce like a wild horde of savage beasts.
Even in the darkness we know who those beasts were.
On them we shower the bitterest hatred
of all mothers brothers and sisters.
They fired at the soul of this land,
They tried to silence the demand of the people,
They kicked at the bosom of Bengal.
They did not belong to this country.
They wanted to sell away her good fortune.
They robbed the people of food, clothing and peace.
On them we shower our bitterest hatred.
Wake up today, the twenty-first of February.
do wake you, please.
Our heroic boys and girls still languish in the prisons of the tyrant.
The souls of my martyred brothers still cry.
But today everywhere the somnolent strength
of the people have begun to stir
and we shall set February ablaze
by the flame of our fierce anger.
How can I ever forget the twenty-first of February?

Writer – Abdul Gaffar Chowdhury, Composer – Altaf Mahmood