গল্প ১১৭ – ক্যাম্প / Story 117- Camp

jafar-iqbal-camp

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Zafar Iqbal – Camp

ক্যাম্প – জাফর ইকবাল

একটি যুদ্ধ, দুটি পক্ষ, কয়েকটি দৃষ্টিকোণ, আর একটি মৃত্যু – ক্যাম্প  মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ নিয়ে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখা আরেকটি উপন্যাস। পাঠকদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি, তারা নিশ্চই জাফর ইকবালকে চেনেন, আর হয়তো এও জানেন যে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনি পিতৃহারা হয়েছিলেনক্যাম্প উপন্যাসটি তাই যতটা কাল্পনিক, ততটাই বাস্তব এবং ব্যক্তিগত। যতদূর জানি, একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশে ৪৭ বছরের রাজনীতি আর দলবাজির প্রভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনেকটাই সরলীকরণের বলি হয়েছে, যেকারণে আজ যুদ্ধের দিনগুলোর চরিত্রগুলোকে হয় সাদা কিংবা কালোর কাতারে ফেলার প্রবণতা বেশ প্রবল। কিন্তু ক্যাম্প পড়লে বোঝা যায় যে সেই সময়কার বাস্তবতা ছিল অনেকটাই জটিল, আর এও বোঝা যায় যে একাত্তরের খলনায়ক ছিল যারা, আদর্শগত ভাবে ভিন্ন হলেও তাদের মত অনেকেই দুই বাংলায়ই আজও বর্তমান।

Camp – Zafar Iqbal

A war, two sides, a few perspectives, and a death – Camp is another story by Muhammad Jafar Iqbal that portrays lives during the liberation war of Bangladesh. Readers who are Bangladeshi need no introduction to Jafar Iqbal; for those who do not know, the writer lost his father during atrocities committed by the Pakistani army during the war. For a fiction, Camp is therefore a very real account, and more – it is personal.

From the little I know, 47 years of politics and factionalism have left the war-time history in post-war Bangladesh grossly oversimplified. Consequently, the tendency among many these days is to portray characters from those times in either black or white. Camp, however, reveals them to us in shades of gray, and makes us realize the worrying truth that even after all this time, people just like them still linger among us.

গান ৬৬ – জয় বাংলা, বাংলার জয় / Song 66 – Joy Bangla, Bangla’r Joy (Victory to Bangla)

ডিসেম্বরের শুরু আজ। আমাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি, তাদের মনে মাসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ – একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তো বাংলাদেশ বিজয় লাভ করেছিল এই মাসের ১৬তেই। বিজয়ের মাসে তাই বিজয়ের একটি গান – গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও আনোয়ার পারভেজ এর সুরে জয় বাংলা, বাংলার জয়  বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে একটি। একাত্তরে যখন বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে রেডিও তরঙ্গে ভেসে আসা জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি তাদের অনুপ্রেরণা যোগাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শেশ হয়ে গেছে ৪৫ বছর আগেই, কিন্তু যেসব কারণে যুদ্ধ, তার অনেককটিই দুই বাংলাতেই এখনো বর্তমান। সেসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণাস্বরূপ তাই আজ এই গানটি তুলে দেওয়া।

It’s December – a month of significance for Bangalees, and particularly, Bangladeshis. It was on the 16th of this month, in 1971, that the Bangladeshi militia (and the supporting Indian allies) defeated the Pakistani army and their associates after a nine month War of Independence. The war saw millions become refugees, and by some estimates, about 3 million deaths – needless to say, it was dark period for the Bangalees who lived through it. During those times, Muktijoddhas (freedom fighters) in the thick of war would draw inspiration from songs Bangladeshi refugee artists wrote and sung over the airwaves from India. Joy Bangla Bangla’r Joy (Victory to Bangla) is one of the most famous of those songs. Written by Gazi Majharul Anwar, it was simultaneously an expression of anger at the atrocities by the Pakistan army and a call to action against them. On this month and in these times of forgetfulness, it is only appropriate that this thrilling and patriotic song is added to this site.

জয় বাংলা, বাংলার জয়

জয় বাংলা, বাংলার জয়,
হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়
কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়।।

বাংলার প্রতি ঘরে ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে
আমাদের রক্ত টগবগ দুলছে মুক্তির দৃপ্ত তারুণ্যে
নেই ভয়, হয় হোক রক্তের প্রচ্ছদ পট
তবু করিনা করিনা করিনা ভয়।।

অশোকের ছায়ে যেন রাখালের বাঁশরী
হয়ে গেছে একেবারে স্তদ্ধ
চারিদিকে শুনি আজ নিদারুণ হাহাকার
আর ওই কান্নার শব্দ।

শাসনের নামে চলে শোষণের সুকঠিন যন্ত্র
বজ্রের হুঙ্কারে শৃঙ্খল ভাঙ্গতে সংগ্রামী জনতা অতন্দ্র
আর নয়, তিলে তিলে বাঙালীর এই পরাজয়
আমি করিনা করিনা করিনা ভয়।।

ভূখা আর বেকারের মিছিলটাকে যেন ওই
দিন দিন শুধু বেড়ে যাচ্ছে
রোদে পুড়ে জলে ভিজে অসহায় হয়ে আজ
ফুটপাতে তারা ঠাঁই পাচ্ছে।

বারবার ঘুঘু এসে খেয়ে যেত দেবনা তো আর ধান
বাংলার দুশমন তোষামুদী চাটুকার
সাবধান, সাবধান, সাবধান
এই দিন, সৃষ্টির উল্লাসে হবে রঙীন
আর মানিনা, মানিনা কোন সংশয়।।

মায়েদের বুকে আজ শিশুদের দুধ নেই
অনাহারে তাই শিশু কাঁদছে
গরীবের পেটে আজ ভাত নেই ভাত নেই
দ্বারে দ্বারে তাই ছুটে যাচ্ছে।

মা-বোনেরা পরণে কাপড়ের লেশ নেই
লজ্জায় কেঁদে কেঁদে ফিরছে
ওষুধের অভাবে প্রতিটি ঘরে ঘরে,
রোগে শোকে ধুকে ধুকে মরছে
অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই
অত্যাচারী শোষকদের আজ
মুক্তি নাই, মুক্তি নাই , মুক্তি নাই।

– গাজী মাজহারুল আনোয়ার
(সুর) আনোয়ার পারভেজ

কবিতা ৫৭ – চিত্ত যেথা ভয়শূন্য / Poem 57 – Chitto Jetha Bhayshunyo (Where the Mind is Without Fear)

Rabindranath Thakur-Chitto Jetha 2

(সম্পাদিত ছবিটির অনিন্দ্যসুন্দর আদি প্রতিরূপটি তুলেছেন জুবায়ের বিন ইকবাল / The original version of this beautiful photo was taken by Zubair bin Iqbal.)

অনেক দিন ধরেই রবিঠাকুরের চিত্ত যেথা ভয়শূন্য কবিতাটি আপলোড করব ভাবছিলাম, কিন্তু করব করব করে এতদিন করা হয়নি। আজ কবিতাটির কথা মনে পড়ায় ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে উপরের এই সুন্দর ছবিটি চোখে পড়ে গিয়ে পংক্তিগুলোর  সাথে জুড়ে দিতেই হল। আলোর পথের যাত্রী… কবিতাটির সাথে বেশ মানিয়ে যায়, না?

এই ওয়েবসাইটের পাঠকদের মধ্যে যারা তরুণ বাংলাদেশি, ‘ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত’ দিয়ে শেষ হওয়া কবিতাটি হয়তো তাদের কাছে বেমানান মনে হতে পারে। রবিঠাকুর যে সময় কবিতাটি লেখেন, তখন ভারতীয় জাতীয়তাবোধের তুলনায় ‘বাংলাদেশ’ এর ধারণাটি ছিল নেহাতই সুপ্ত, তাই সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কবিতাটির ভাবার্থটুকু – সীমান্তের এপার আর ওপার বাংলার সবটুকুই যখন কুসংস্কার, দুর্নীতি আর ধর্মের অপব্যাখ্যার অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন জগৎপিতার কাছে দেশের জন্যে বাঙ্গালীর এর চাইতে সারপূর্ণ প্রার্থনা আর কি হতে পারে? তাই আজ এটি তুলে দেওয়া।

This time, a poem I have been murmuring to myself for a while. Chitto Jetha Bhayshunyo (Where the Mind is Without Fear)should perhaps be the prayer of every patriot for his or her country – and maybe more so for every Bangalee. In a time when communalism, corruption and bigotry reign across nations, these are lines worthy of keeping in your heart.

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়–
যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি,
পৌরুষেরে করে নি শতধা; নিত্য যেথা
তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা–
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,
ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (নৈবেদ্য  হতে সংগ্রহীত)

Chitto Jetha Bhayshunyo (Where the mind is without fear)
(Translated by the poet himself)

Where the mind is without fear and the head is held high
Where knowledge is free
Where the world has not been broken up into fragments
By narrow domestic walls
Where words come out from the depth of truth
Where tireless striving stretches its arms towards perfection
Where the clear stream of reason has not lost its way
Into the dreary desert sand of dead habit
Where the mind is led forward by thee
Into ever-widening thought and action
Into that heaven of freedom, my Father, let my country awake.

– Rabindranath Thakur (Collected from Naivedya)

গান ৪৭ – আমি বাংলায় গান গাই / Song 47 – Ami Banglay Gan Gai (In Bangla I Sing)

Pratul Mukhopadhyay-Ami Banglay Gaan Gai (2)

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি তুলেছিলেন ডিক ডুর‍্যান্স / Original of the edited photo was taken on the Turag River in Bangladesh by Dick Durrance II)

খুব প্রিয় একটা গান মনে বাজছে বেশ কিছুদিন ধরে, তাই আজ এই লেখাটি। আমি বাংলায় গান গাই  একই সাথে বাংলা দেশ ও বাংলা ভাষাকে নিয়ে। লোকসঙ্গীতশিল্পী প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের লেখা ও সুর করা এই গানটি অনেকদিন আগে থেকে দুই বাংলাতেই জনপ্রিয়, আর সম্প্রতিকালে মাহমুদুজ্জামান বাবুর গাওয়া গানটির একটি আধুনিক সংস্করণও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে বেশ সাড়া ফেলেছে। বাংলাকে যারা দেখেছেন, শুনেছেন ও ভালবেসেছেন, এই গানটিতে বাংলাকে ঘিরে তাদের অনুভূতিগুলোই যেন ব্যক্ত হয়েছে, তাই সেসব মানুষদের মনে অনুরণনিত হওয়া সুরে ভাষা যোগাতেই নিচে পংক্তিগুলোসহ গানটির ইউটিউব ভিডিওটি আজ তুলে দিলাম। আশা করি সবার ভাল লাগবে।

In choosing songs and poems and stories to share, I only inflict my biases on you. This song, however, I put up without guilt. If you are a Bangalee, you will know why.

আমি বাংলায় গান গাই, আমি বাংলার গান গাই
আমি আমার আমিকে চিরদিন-এই বাংলায় খুঁজে পাই।।
আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর
আমি এই বাংলার মায়া ভরা পথে, হেটেছি এতটা দূর,
বাংলা আমার জীবনানন্দ, বাংলা প্রাণের সুখ
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।।

আমি বাংলায় কথা কই, আমি বাংলার কথা কই
আমি বাংলায় ভাসি, বাংলায় হাসি, বাংলায় জেগে রই
আমি বাংলায় মাতি উল্লাসে, করি বাংলায় হাহাকার
আমি সব দেখেশুনে খেপে গিয়ে-করি বাংলায় চিৎকার,
বাংলা আমার দৃপ্ত স্লোগান, ক্ষিপ্ত তীর ধনুক
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।।

আমি বাংলায় ভালোবাসি, আমি বাংলাকে ভালোবাসি
আমি তারই হাত ধরে সারা পৃথিবীর-মানুষের কাছে আসি
আমি যা কিছু মহান বরণ করেছি বিনম্র শ্রদ্ধায়
মিশে তেরো নদী, সাত সাগরের জল গঙ্গায়-পদ্মায়
বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক
আমি একবার দেখি, বার বার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।।

– প্রতুল মুখোপাধ্যায়

কবিতা ২৯ – বঙ্গবাণী / Poem 29 – Bangabani (Bangla’s Words)

চট্টগ্রামের কবি আব্দুল হাকিম আঠারো শতকে যখন লিখতেন , তখন শুধুমাত্র সংস্কৃত, আরবী আর ফার্সী জানা লোকদের উচ্চশিক্ষিত বলে গণ্য করা হত। তৎকালীন সমাজের ‘উচ্চশিক্ষিত’দের বাংলার প্রতি অনীহা দেখে হয়তো তিনি বঙ্গবাণী কবিতাটি লিখেছিলেন। আজ তিনশো বছর পরেও যখন বাঙ্গালী সমাজের একটি বড় অংশ বিদেশী (পড়ুন ইংরেজি) ভাষাকে শ্রেয়তর হিসেবে গণ্য করে, তখন কবিতাটির বাক্যগুলো বড় সত্য হয়ে ঠেকে, তাই আজ পাঠকদের প্রতি অনুরোধস্বরূপ এই কবিতাটি তুলে দিলাম।

A poet from Chittagong, Abdul Hakim composed his works in the 18th Century – a time when only those versed in Sanskrit, Farsi or Arabic were considered to be educated. Bangla’s relegation to a lower status may have provoked Hakim to write the poem Bangabani (Bangla’s Words). Regardless of whether that is the case, three hundred years later, as the ‘educated’ Bangalee folk veer towards languages and literary traditions other than their own, the words of the poem ring truer than ever. Hence this post.

বঙ্গবাণী

যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।
সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি॥
দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে ন জুয়ায়।
নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ ন যায়॥
মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।
দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি॥

– আব্দুল হাকিম

কবিতা ২৮ – অভিশাপ দিচ্ছি / Poem 28 – Abhishap Dichchhi (I Curse Them)

এই সাইটে নেতিবাচক লেখা তোলা থেকে সাধারণত নিজেকে বিরত রাখি, তবে গত কয় দিনে নিজের চারপাশে যা ঘটে চলেছে তা দেখে এটা না তুলে পারলাম না। শামসুর রাহমানের এই কবিতাটির উদ্দেশ্য একটাই, অসি ধারে মসির লেখনকে যারা চিরকাল স্তব্ধ করতে চেয়েছে আর আজও চাইছে, তাদের অভিশাপ দেওয়া।

In presenting Bangla literary works on this site, I try to keep myself from posting works that have a negative tone. This time, though, I make an exception in posting Abhishap Dichchhi (I Curse Them), for those who try to silence the pen with their swords deserve little more than curses.

অভিশাপ দিচ্ছি

না আমি আসিনি
ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন পাতা ফুঁড়ে,
দুর্বাশাও নই,
তবু আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্ত গোধূলিতে
অভিশাপ দিচ্ছি।

আমাদের বুকের ভেতর যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছিলো সেঁটে
মগজের কোষে কোষে যারা
পুঁতেছিল আমাদেরই আপন জনেরই লাশ
দগ্ধ, রক্তাপ্লুত
যারা গণহত্যা করেছে
শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে
আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়েও অধিক পশু
সেই সব পশুদের।

ফায়ারিং স্কোয়াডে ওদের
সারিবদ্ধ দাঁড় করিয়ে
নিমেষে ঝাঁ ঝাঁ বুলেটের বৃষ্টি
ঝরালেই সব চুকে বুকে যাবে তা আমি মানি না।
হত্যাকে উৎসব ভেবে যারা পার্কে মাঠে
ক্যাম্পাসে বাজারে
বিষাক্ত গ্যাসের মতো মৃত্যুর বীভৎস গন্ধ দিয়েছে ছড়িয়ে,
আমি তো তাদের জন্য অমন সহজ মৃত্যু করি না কামনা।
আমাকে করেছে বাধ্য যারা
আমার জনক জননীর রক্তে পা ডুবিয়ে দ্রুত
সিঁড়ি ভেঙ্গে যেতে
ভাসতে নদীতে আর বনেবাদাড়ে শয্যা পেতে নিতে,
অভিশাপ দিচ্ছি, আমি সেইসব দজ্জালদের।
অভিশাপ দিচ্ছি ওরা চিরদিন বিশীর্ণ গলায়
নিয়ত বেড়াক বয়ে গলিত নাছোড় মৃতদেহ,
অভিশাপ দিচ্ছি
প্রত্যহ দিনের শেষে ওরা
হাঁটু মুড়ে এক টুকরো শুকনো রুটি চাইবে ব্যাকুল
কিন্তু রুটি প্রসারিত থাবা থেকে রইবে
দশ হাত দূরে সর্বদাই।
অভিশাপ দিচ্ছি
ওদের তৃষ্ণায় পানপাত্র প্রতিবার
কানায় কানায় রক্তে উঠবে ভরে, যে রক্ত বাংলায়
বইয়ে দিয়েছে ওরা হিংস্র
জোয়ারের মত।
অভিশাপ দিচ্ছি
আকণ্ঠ বিষ্ঠায় ডুবে ওরা অধীর চাইবে ত্রাণ
অথচ ওদের দিকে কেউ
দেবে না কখনো ছুঁড়ে একখন্ড দড়ি।
অভিশাপ দিচ্ছি
স্নেহের কাঙ্গাল হয়ে ওরা
ঘুরবে ক্ষ্যাপার মতো এ পাড়া ওপাড়া,
নিজেরি সন্তান
প্রখর ফিরিয়ে নেবে মুখ, পারবে না
চিনতে কখনো;
অভিশাপ দিচ্ছি এতোটুকু আশ্রয়ের জন্য, বিশ্রামের
কাছে আত্মসমর্পণের জন্যে
দ্বারে দ্বারে ঘুরবে ওরা। প্রেতায়িত
সেই সব মুখের উপর
দ্রুত বন্ধ হয়ে যাবে পৃথিবীর প্রতিটি কপাট,
অভিশাপ দিচ্ছি।
অভিশাপ দিচ্ছি,
অভিশাপ দিচ্ছি…

– শামসুর রাহমান

কবিতা ২৬ – স্বাধীনতা তুমি / Poem 27 – Swadhinata Tumi (An Ode to Independence)

Shamsur Rahman-Swadhinata Tumi 2

Photo : Highway to Heaven by Abhijit Bhattacharyya

বাঙ্গালীদের মধ্যে যারা বাংলাদেশী, তাদের কাছে ‘২৬’ সংখ্যাটির একটি বিশেষ তাৎপর্য থাকার কথা। হাজার হোক, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা তো করেছিল ১৯৭১ এর মার্চের ২৬তম দিনটিতেই। এই সাইটে কবিতা নিয়ে লেখাগুলোর মধ্যে এই পোস্টটিও ২৬তম, তাই এই ছোট্ট উপলক্ষে আধুনিক বাংলা কবিদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শামসুর শামসুর রাহমানের স্বাধীনতা তুমি কবিতাটি তুলে দিলাম।

To Bangalees in Bangladesh, the number ’26’ bears a special significance. After all, it was on this day of March in 1971 that Bangladesh was declared independence. This piece happens to be the 26th of the poetry-related posts on this blog. So in remembrance, here is Swadhinata Tumi (An Ode to Independence), a poem written by one of the greater Bangalee poets of the modern era – Shamsur Rahman.

স্বাধীনতা তুমি

স্বাধীনতা তুমি
রবিঠাকুরের অজর কবিতা, অবিনাশী গান।
স্বাধীনতা তুমি
কাজী নজরুল ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো
মহান পুরুষ, সৃষ্টিসুখের উল্লাসে কাঁপা-
স্বাধীনতা তুমি
শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা
স্বাধীনতা তুমি
পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।
স্বাধীনতা তুমি
ফসলের মাঠে কৃষকের হাসি।
স্বাধীনতা তুমি
রোদেলা দুপুরে মধ্যপুকুরে গ্রাম্য মেয়ের অবাধ সাঁতার।
স্বাধীনতা তুমি
মজুর যুবার রোদে ঝলসিত দক্ষ বাহুর গ্রন্থিল পেশী।
স্বাধীনতা তুমি
অন্ধকারের খাঁ খাঁ সীমান্তে মুক্তিসেনার চোখের ঝিলিক।
স্বাধীনতা তুমি
বটের ছায়ায় তরুণ মেধাবী শিক্ষার্থীর
শানিত কথার ঝলসানি-লাগা সতেজ ভাষণ।
স্বাধীনতা তুমি
চা-খানায় আর মাঠে-ময়দানে ঝোড়ো সংলাপ।
স্বাধীনতা তুমি
কালবোশেখীর দিগন্তজোড়া মত্ত ঝাপটা।
স্বাধীনতা তুমি
শ্রাবণে অকূল মেঘনার বুক
স্বাধীনতা তুমি
পিতার কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।
স্বাধীনতা তুমি
উঠানে ছড়ানো মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন।
স্বাধীনতা তুমি
বোনের হাতের নম্র পাতায় মেহেদীর রঙ।
স্বাধীনতা তুমি
বন্ধুর হাতে তারার মতন জ্বলজ্বলে এক রাঙা পোস্টার।
স্বাধীনতা তুমি
গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,
হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।
স্বাধীনতা তুমি
খোকার গায়ের রঙিন কোর্তা,
খুকীর অমন তুলতুলে গালে
রৌদ্রের খেলা।
স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।

– শামসুর রাহমান

গল্প ৪০ – আমার বন্ধু রাশেদ / Story 40 – Amar Bondhu Rashed (Rashed, My Friend)

Jafar Iqbal-Amar Bandhu Rashed

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Zafar Iqbal-Amar Bandhu Rashed

আমার বন্ধু রাশেদ – জাফর ইকবাল

 “তুই মশাল মিছিলে যাবি?”
“হ্যা। ছোট বলে হাতে মশাল দিতে চায় না। আগে গিয়ে অনেক সাধাসাধি করতে হবে।”
ফজলু চোখ ছোট ছোট করে বলল, “ইশ! আমি যদি তোর সাথে যেতে পারতাম!”
রাশেদ বলল, “চল যদি যেতে চাস।”
ফজলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দিলীপ বলল, “ফজলু যাবে মশাল মিছিলে? তাহলেই হয়েছে। কাকা তোকে পিটিয়ে লম্বা করে দেবে না?”
ফজলু বিষণ্ন মুখে মাথা নাড়ল। আশরাফ গম্ভীর গলায় বলল, “বড় না হওয়া পর্যন্ত মিছিলে যোগ দেওয়া ঠিক না। রাজনৈতিক দল ভুলপথে নিয়ে যাবে।”
রাশেদ আবার বড় মানুষের মত বলল, “পথে তো নামতে হবে আগে, না হলে জানবি কেমন করে কোনটা ভুলপথ কোনটা ঠিক পথ?”

আমরা যখন বড় হই, তখন আর অন্য অনেক কিছুর সাথে সাথে সাহিত্যে রুচিও বদলায়। ছোটবেলায় যেসব গল্পগুলো পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম, সেইগুলোই হয়ত বড় হওয়ার পর হাস্যকর আর ছেলেমানুষীতে ভরা বলে মনে হয়। অবশ্য এমন সব গল্পও থাকে, যেগুলো সময় বয়ে যাওয়া সত্ত্বেও মনকে আগের মতই টানে। আমার বন্ধু রাশেদ গল্পটি যখন প্রথম পড়ি, তখন আমি নেহাৎই ছোট। তখনকার কথা ভাবতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের এক ছোট্ট শহরে চারজন কিশোরের বন্ধুত্ব আর সাহস নিয়ে লেখা গল্পটি পড়তে পড়তে নিজেও কেমন করে গুপ্তযোদ্ধা হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, তা মনে পড়ে। এত দিন পর জাফর ইকবালের লেখা এই গল্পটি যে তার অন্যান্য ছোটগল্প খোঁজার সময় হঠাৎ করে খুঁজে পাব, তা ভাবতে পারিনি। কিশোর বয়সে যেমন ‘বড়’ হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম, তার কিছুটা তো গত ক’বছরে হয়েছি, তাই এত দিন পর ভাল লাগবে কিনা, সেই দ্বিধা নিয়েই গল্পটি পড়তে বসেছিলাম। বুঝতে পারি নি যে এত বছর পরেও গভীর অভিমান নিয়ে শেষ হওয়া এই গল্পটি আমাকে আগের মতোই আবেগাপ্লুত করে তুলবে।

আমার মত পাঠকদেরও গল্পটি পড়ে তেমনই লাগবে, সেই বিশ্বাসে মুক্তিযুদ্ধ আর কৈশোর নিয়ে লেখা একাত্তরের এই অসাধারণ প্রতিচ্ছবিটি তুলে দিলাম – আমার বন্ধু রাশেদ , যা আমার মতে জাফর ইকবালের সেরা লেখাগুলোর মধ্যে একটি, আর যা দুই বাংলার যুদ্ধপরবর্তী প্রজন্মদের জন্যে একটি অবশ্যপাঠ্য।

Amar Bondhu Rashed (Rashed, My Friend) – Zafar Iqbal

Of the things that change with our growing up, taste in literature is one. Personally, I have always been intrigued by how the same works that many of us so looked forward to reading when we were young seem childish and laughable when we grow up. Some stories, however, still retain the old appeal over time, and I find Zafar Iqbal’s Amar Bandhu Rashed (Rashed, My Friend) to be one such story. Set in a Bangladeshi town during the liberation war of 1971, it narrates the adventures of four boys who risk their lives to liberate their town from the Pakistani military. Rashed, of course, is the leader of the pack, and his wit and bravery represent the romanticized archetype of the young Bangalee freedom fighter who fought for his land. Perhaps the masterwork by Zafar Iqbal, Amar Bandhu Rashed is probably the best introduction for young Bangalees to wartime literature, and a must read for post-war generations of both Bengals.