গান ৭২ – পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে / Song 72 – Prithibita Naki Chhoto Hote Hote (Light-years Apart in a Shrinking World)

লম্বা একটি বিরতির পর আজকে একটু অন্যরকম একটা পোস্ট – পৃথিবীটা নাকি গানটি এই সাইটে তোলা অন্যান্য গানগুলোর চাইতে বিষয় ও ধারা, দু দিক দিয়েই একটু আলাদা। আজকের এই যুগে ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা কতভাবেই না অন্যদের সাথে সংযুক্ত, কিন্তু সেই প্রযুক্তির হাত ধরেই আপনজনদের কাছ থেকে যে আমরা কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি বা গেছি, তা কি আমরা মনে রাখি? পাঠকদের মধ্যে যারা শহুরে, তাদের হয়তো সেই একাকিত্বটুকু একটু বেশিই বাস্তব হয়ে ঠেকে। নগরায়ণ আর প্রযুক্তিগত সংযোগের মাঝে সেই  নিঃসঙ্গতাই ফুটে উঠেছে এই গানটিতে – মহীনের ঘোড়াগুলির পৃথিবীটা নাকি

গানটির কথা যখন লিখলাম, তখন মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডটির কথা আলাদা করে বলতে হয়। পাঠকদের অনেকেই হয়তো জানেন যে মহীনের ঘোড়াগুলি উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রক ব্যান্ডগুলোর মধ্যে একটি। জীবনানন্দ যেমন তাঁর সময়ে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব থেকে বেরিয়ে এসে বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন সাহিত্যধারাকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডটিও বাংলার সঙ্গীতজগতে অনেকটা সেভাবেই রক সঙ্গীতধারার প্রচলিত করে। ব্যান্ডটির নাম যে জীবনানন্দের কবিতা থেকেই নেওয়া, তা আর বিস্ময়ের কি? বাংলা ও উপমহাদেশীয় ব্যান্ড সঙ্গীতধারার উপর মহীনের ঘোড়াগুলির প্রভাব যে কি বিশাল, তা বোঝানোর জন্যেপৃথিবীটা নাকি গানটিই যথেষ্ট – গানটি প্রকাশের পরবর্তী বছরগুলোতে সীমান্তের এপার আর ওপার, দুই বাংলারই অনেক গায়কেরা গানটি গেয়েছেন বা সেটি দ্বারা অনুপ্রাণিত করেছেন। বাংলাদেশের নগরবাউল ব্যান্ডের জেমস এর গাওয়া বলিউড সঙ্গীত ভিগি ভিগি  গানটি শুনলেই সেটি বোঝা যায়।

গান শুনতে যারা ভালবাসেন, তাদের জন্যে গানটির পংক্তির সাথে সাথে নিচে একটি ইউটিউব ভিডিও সংযুক্ত করে দিলাম। আশা করি সবার ভাল লাগবে।

In a way of breaking what has been an extended hiatus, a song that I have been thinking of putting up for quite some time. If you are a reader who grew up listening to rock songs in the eighties’ or nineties’ Bangla, you probably know about Moheener Ghoraguli (Moheen’s Horses), if not, you should! One of the first rock bands in the subcontinent, they played a pioneering role in establishing Rock as a genre in the Bangla music, and have had an immense influence on the bands which followed, and continue to follow their footsteps even today. Case on point: Prithibita Naki Chhoto Hote hote (Light-years Apart in a Shrinking World) – a song of citidwelling lovers who grow light-years apart because of the very technology that is supposed to connect them. In this era of Facebook, Twiter and WhatsApp, does that sound familiar? One of their most famous hits, the song has been covered by many famous singers in both Bangladesh and India, and has influenced many famous hits as well. Listen to the song on Youtube below, and then check out the Bollywood hit Bheegi Bheegi sung by the Bangladesh rockstar James, and you will know exactly what I mean. Old stuff, gold stuff – Prithibita Naki a truly interesting example of art moving across boundaries and cultures.

পৃথিবীটা নাকি

পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে
স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে
ড্রয়িং রুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে
যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে
ঘুঁচে গেছে দেশ কাল সীমানার গণ্ডি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

সারি সারি মুখ আসে আর যায়
নেশাতুর চোখ টিভি পর্দায়
পোকামাকড়ের আগুনের সাথে সন্ধি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
পাশাপাশি বসে একসাথে দেখা
একসাথে নয় আসলে যে একা
তোমার আমার ভাড়াটের নয়া ফন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

স্বপ্ন বেচার চোরা কারবার
জায়গা তো নেই তোমার আমার
চোখ ধাঁধানোর এই খেলা শুধু বন্দি,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…
তার চেয়ে এসো খোলা জানালায়
পথ ভুল করে ভুল রাস্তায়
হয়ত পেলেও পেতে পারি আরো সঙ্গী,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা, আ হা,
আহা হা হা হা…।

ভেবে দেখেছ কি?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে।
ভেবে দেখেছ কি ?
তারারাও যত আলোকবর্ষ দূরে
তারও দূরে
তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে…।

– মহীনের ঘোড়াগুলি
.

কবিতা ৭০ – স্তব্ধতা উচ্ছ্বসি উঠে / Poem 70 – Stabdhota Uchchhwashi Uthe (Stillness Surges Up)

rabindranath-thakur-stabdhota-uchchhwashi-othe-1

আজ রবিঠাকুরের একটি অণুকাব্য। স্তব্ধতা উচ্ছ্বসি উঠে কবি লিখেছিলেন প্রকৃতির সর্বোচ্চ ও গভীরতমের মাঝে দুটি গুণের বিকাশ দেখতে পেয়ে। পর্বতের অগম্য উচ্চতার মধ্যে স্তব্ধতার উৎকর্ষলাভ, আর সরোবরের অতল গভীরতার মাঝে গতিবেগের আত্মোপলোব্ধি – কবিগুরু কি অবলীলায়ই না দৃশ্যমানের মাঝে প্রতীকি অর্থ খুঁজে পেতেন! রবিঠাকুরকে বুঝতে যাওয়ার স্পর্ধা আমাদের নেই, তবে কবিতাগুলো পড়ে ভাল লাগে, এই যা।

তবে কখনো কখনো ইন্টারনেটের কল্যাণে দু-একটি ছবি খুঁজে পাই, যা কবিগুরুর লেখাগুলোকে অপূর্বভাবে দৃশ্যমান করে তুলে। আমার চোখে উপরের ছবিটি তেমনই একটি, তাই পাঠকদেরও আমার মতো সেটি ভাল লাগবে, সেই আশায় তুলে দিলাম।

Today, a verse by Rabindranath Thakur – on the qualities that manifest in nature. It never ceases to amaze me how the sage associated abstractions around us with tangible things in nature. Taken apart, stillness that engulfs and mountains which surge up can appear unrelated. After reading the poem, however, one wonders whether they are anything but one. Greater minds have identified Thakur as one of the greatest intellects in modern history – to that, I can only nod without understanding. His simpler metaphors, however, come to me, and just that alone leaves me happy and glad.

Sometimes, while reading Thakur’s poems, the mind seeks a window to look out of and find what the lines remind it of. But such windows are almost never there. In this digital age, however, we have search engines, and a lucky search or two yields a picture that just captures the essence of the poem. I think Thakur would appreciate.

স্তব্ধতা উচ্ছ্বসি উঠে

স্তব্ধতা উচ্ছ্বসি উঠে গিরিশৃঙ্গরূপে,
ঊর্ধ্বে খোঁজে আপন মহিমা।
গতিবেগ সরোবরে থেমে চায় চুপে
গভীরে খুঁজিতে নিজ সীমা।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ হতে সংগ্রহীত)

Stabdhota Uchchhwashi Uthe (Stillness Surges Up)
(Translation by the Poet Himself)

In the mountain, stillness surges up
to explore its own height;
in the lake, movement stands still
to contemplate its own depth.

– Rabindranath Thakur (Collected from Sphulinga/Fireflies)

গান ৬৯ – শীতের বনে / Song 69 – Sheeter Bone (In the Forest of the Winter)

rabindranath-thakur-sheetero-bone-2

আজ আমার সবচেয়ে প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতগুলোর মধ্যে একটি। শীতের বনে  ঋতুটির আগমনের সাথে সাথে প্রকৃতির সবুজ সাজ ছাড়া নিয়ে একটি গান, তাই এক অর্থে সেটি শীতের আগমনী বার্তা। কিন্তু গানটি ঋতুটির রুক্ষতা ও শুষ্কতার বর্ণনা নিয়ে হলেও সেটির মধুর সুর কেন জানি আমাকে ছোটবেলার শীতকালগুলোর সুখস্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। হয়তো শীতের মলিন হিমের মাঝেই ছোট্ট আনন্দগুলো সবচেয়ে বেশি উষ্ণ হয়ে ঠেকে, কিংবা হয়তো গানটির রুক্ষতার মাঝে মনে একটু কোমল পরশ বুলায়, তাই। যে কারণেই হোক পাঠকদের সাথে সেই অনুভূতিটুকু ভাগ করে নিতে তাই আজ এটির পংক্তিগুলো তুলে দেওয়া।

যারা শুনতে কিংবা গাইতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে নিচে গানটির দুটি সংস্করণ তুলে দিলাম – একটি মান্না দের গলায়, আর তাই শ্বাশত, আর অন্যটি যারা আধুনিকতার ভক্ত, তাদের জন্যে। শোনার আমন্ত্রণ থাকল।

Today, one of my favourite songs of the Rabindrasangeet genre. Sheetero Bone is a song about the Winter as I know it back home – dry and stern, yet raggedly beautiful and the evoker of a thousand memories from childhood. The lines narrate the changes that would announce the arrival of winter where I grew up – the trees shedding their foliage, the slight but perceptible Northern wind, the dryness tangible in the air… but more than that, they also remind me of what was gentle and sweet about those times – soaking in the warmth of the sun on our balcony, marveling at the dendrites that the trees had become, lighting our own fires out of dead twigs and leaves in the evening, to name a few… Life, with its sobering ways, takes us away from those moments and forces us to assume the mask of a grown-up, but sometimes, an unconscious hum or a prompted recitation is all it takes for us to drown in a flood of memories… Sometimes, it is okay to miss home.

Blow are two renditions of the song – a timeless one by the master, Manna Dey, and a contemporary one in Arnob’s (co)compostion and Warda’s voice – something to listen to or sing along with this winter. Enjoy!

শীতের বনে

শীতের বনে কোন্‌ সে কঠিন আসবে ব’লে
শিউলিগুলি ভয়ে মলিন বনের কোলে॥
আম্‌লকি-ডাল সাজল কাঙাল,   খসিয়ে দিল পল্লবজাল,
কাশের হাসি হাওয়ায় ভাসি যায় সে চলে॥
সইবে না সে পাতায় ঘাসে চঞ্চলতা
তাই তো আপন রঙ ঘুচালো ঝুম্‌কোলতা।
উত্তরবায় জানায় শাসন,   পাতল তপের শুষ্ক আসন,
সাজ-খসাবার হায় এই লীলা কার অট্টরোলে॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (প্রকৃতি  হতে সংগ্রহীত)

(সংস্করণ ১ – মান্না দে / Version 1 – Manna Dey)

(সংস্করণ 2 – অর্ণব এবং ওয়ার্দা / Version 2 – Arnob ft. Warda)

কবিতা ৬৮ – আছে দুঃখ আছে মৃত্যু / Poem 68 – Achhe Dukkho Achhe Mrityu (Sadness and Joy, Life and Death)

rabindranath-thakur-achhe-dukkho-achhe-mrityu-1

আজ অতীত হতে চলা বছরটিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে মনের উপলব্ধিতে আসা একটি কবিতা। আনন্দ ও বেদনা, মিলন ও বিরহ, আগমন ও বিদায়, আর পুনরাগমন ও পুনর্মিলন… প্রতিটি বছর তো আমাদের জীবন-সারাংশেরই পুনরাবৃত্তি, তাই না? নতুন বছরের দ্বারগোঁড়ায় দাঁড়িয়ে তাই সেটির উজ্জ্বলতর মুহূর্তগুলোর প্রত্যাশায়ই নাহয় আরেকবার শুরু করি?

গ্রেগরিয়ান নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে।

In review of the year that is soon to be past, a poem by Rabindranath Thakur. Achhe Dukkho, Achhe Mrityu (Sadness and Joy, Life and Death) is a poem that reminds us that life is only complete when it knows laughter as well as it does tears, unions as well as it does bereavement, and triumphs as much as failures. Perhaps each of the pair succeeds the other like the ebb of the tide follows its flow, or perhaps they are forever there in equal measure… of such things, what would I know? But when the mind finds itself about to retrace the same path that it has over the past year, there is peace and wonderment to be found in that knowledge: Perhaps each year is a recurring act of life in its fullest, and if so, then a reminder – that in all its hues, it may hold just enough blue for one to love and get lost within.

Happy new year, everyone.

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥
তবু প্রাণ নিত্যধারা,      হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে ॥
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,   নাহি নাহি দৈন্যলেশ–
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা  হতে সংগ্রহীত)

 

কবিতা ৬৭ – কপোতাক্ষ নদ / Poem 67 – Kapotakkha Nad (Kapotakkha River)

michael-madhusudan-datta-satoto-he-nad-2

আজ মাইকেল মধুসূদন দত্তের একটি কবিতা। এতদিন এই সাইটে যে বাংলা সাহিত্যের এই অমর কবির লেখা কেন তুলিনি, তার কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই – হয়তো একসময়কার মধুসূদনের মত আমিও বাংলাকে ভুলতে বসেছি, তাই। আজকের কবিতাটি তোলার কারণ অবশ্য জানা – জীবনের স্রোতে ভেসে ভেসে আমরা এককালের চেনা জগৎটা হতে কত দূরেই না সরে যাই। তেমনি সময়ে কি ফেলে আসা প্রিয়জন ও প্রিয় জায়গাগুলোর কথা মনে পড়ে না? বিগত ক’দিন ধরে কেন জানি বাড়ির পিছনের ছোট্ট নদীটার কথা মনে পড়ছে খুব – আর সেই পিছুটানের কথা যদি পংক্তির ভাষায় বলতে হয়, কপোতাক্ষ নদ  চাইতে আর্দ্র কবিতা আর কি হতে পারে? তাই পাঠকদের জন্যে সেটি তুলে দেওয়া।

Today, in a way of filling what has been a massive void in this site, a poem by Michael Madhusudan Dutta. The reason for the post is rather personal, however. When life keeps us far away from who or what we hold dearly in our hearts, and when the recurring passage of time rekindles their memories, how does it feel? In Kapotakkha Nad (Kapotaksha River) we get to know the feeling – of missing the little river each of us knows back home.

কপোতাক্ষ নদ

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;
সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া- মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।
বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?
দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে।

আর কি হে হবে দেখা?- যত দিন যাবে,
প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে
বারি-রুপ কর তুমি; এ মিনতি, গাবে
বঙ্গজ জনের কানে, সখে, সখা-রীতে
নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে
লইছে যে নাম তব বঙ্গের সংগীতে।

– মাইকেল মধুসূদন দত্ত

গান ৬৬ – জয় বাংলা, বাংলার জয় / Song 66 – Joy Bangla, Bangla’r Joy (Victory to Bangla)

ডিসেম্বরের শুরু আজ। আমাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশি, তাদের মনে মাসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ – একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তো বাংলাদেশ বিজয় লাভ করেছিল এই মাসের ১৬তেই। বিজয়ের মাসে তাই বিজয়ের একটি গান – গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও আনোয়ার পারভেজ এর সুরে জয় বাংলা, বাংলার জয়  বাংলার সবচেয়ে জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গানগুলোর মধ্যে একটি। একাত্তরে যখন বাঙ্গালী মুক্তিযোদ্ধারা পাক হানাদার বাহিনীদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত, তখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে রেডিও তরঙ্গে ভেসে আসা জয় বাংলা, বাংলার জয় গানটি তাদের অনুপ্রেরণা যোগাত। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শেশ হয়ে গেছে ৪৫ বছর আগেই, কিন্তু যেসব কারণে যুদ্ধ, তার অনেককটিই দুই বাংলাতেই এখনো বর্তমান। সেসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণাস্বরূপ তাই আজ এই গানটি তুলে দেওয়া।

It’s December – a month of significance for Bangalees, and particularly, Bangladeshis. It was on the 16th of this month, in 1971, that the Bangladeshi militia (and the supporting Indian allies) defeated the Pakistani army and their associates after a nine month War of Independence. The war saw millions become refugees, and by some estimates, about 3 million deaths – needless to say, it was dark period for the Bangalees who lived through it. During those times, Muktijoddhas (freedom fighters) in the thick of war would draw inspiration from songs Bangladeshi refugee artists wrote and sung over the airwaves from India. Joy Bangla Bangla’r Joy (Victory to Bangla) is one of the most famous of those songs. Written by Gazi Majharul Anwar, it was simultaneously an expression of anger at the atrocities by the Pakistan army and a call to action against them. On this month and in these times of forgetfulness, it is only appropriate that this thrilling and patriotic song is added to this site.

জয় বাংলা, বাংলার জয়

জয় বাংলা, বাংলার জয়,
হবে হবে হবে, হবে নিশ্চয়
কোটি প্রাণ একসাথে জেগেছে অন্ধরাতে
নতুন সূর্য ওঠার এই তো সময়।।

বাংলার প্রতি ঘরে ভরে দিতে চাই মোরা অন্নে
আমাদের রক্ত টগবগ দুলছে মুক্তির দৃপ্ত তারুণ্যে
নেই ভয়, হয় হোক রক্তের প্রচ্ছদ পট
তবু করিনা করিনা করিনা ভয়।।

অশোকের ছায়ে যেন রাখালের বাঁশরী
হয়ে গেছে একেবারে স্তদ্ধ
চারিদিকে শুনি আজ নিদারুণ হাহাকার
আর ওই কান্নার শব্দ।

শাসনের নামে চলে শোষণের সুকঠিন যন্ত্র
বজ্রের হুঙ্কারে শৃঙ্খল ভাঙ্গতে সংগ্রামী জনতা অতন্দ্র
আর নয়, তিলে তিলে বাঙালীর এই পরাজয়
আমি করিনা করিনা করিনা ভয়।।

ভূখা আর বেকারের মিছিলটাকে যেন ওই
দিন দিন শুধু বেড়ে যাচ্ছে
রোদে পুড়ে জলে ভিজে অসহায় হয়ে আজ
ফুটপাতে তারা ঠাঁই পাচ্ছে।

বারবার ঘুঘু এসে খেয়ে যেত দেবনা তো আর ধান
বাংলার দুশমন তোষামুদী চাটুকার
সাবধান, সাবধান, সাবধান
এই দিন, সৃষ্টির উল্লাসে হবে রঙীন
আর মানিনা, মানিনা কোন সংশয়।।

মায়েদের বুকে আজ শিশুদের দুধ নেই
অনাহারে তাই শিশু কাঁদছে
গরীবের পেটে আজ ভাত নেই ভাত নেই
দ্বারে দ্বারে তাই ছুটে যাচ্ছে।

মা-বোনেরা পরণে কাপড়ের লেশ নেই
লজ্জায় কেঁদে কেঁদে ফিরছে
ওষুধের অভাবে প্রতিটি ঘরে ঘরে,
রোগে শোকে ধুকে ধুকে মরছে
অন্ন চাই, বস্ত্র চাই, বাঁচার মত বাঁচতে চাই
অত্যাচারী শোষকদের আজ
মুক্তি নাই, মুক্তি নাই , মুক্তি নাই।

– গাজী মাজহারুল আনোয়ার
(সুর) আনোয়ার পারভেজ

কবিতা ৬৫ – বঙ্গমাতা / Poem 65 – Bangomata (Mother Bengal)

rabindranath-thakur-bangomata

আজ যে কবিতাটি তোলা, তার শেষের দুটি পংক্তি আমাদের অনেকেরই মুখে মুখে ফেরে। বাঙ্গালী হিসেবে আমরা খানিকটা অসূয়াপূর্ণ, অর্থাৎ পৃথিবীকে বাঁকা চোখে দেখতে আর নিজেদের নিয়ে ঠাট্টা করতে অভ্যস্ত, তাই সেটি অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু বঙ্গমাতা কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ সেই দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং সমাজের অবক্ষয়ের মুখে বাঙ্গালীদের নিষ্ক্রিয় দুর্বলতা হতে উত্তরণের পথনির্দেশনা দিতেই লিখেছিলেন। বিগত কদিন ধরে সংবাদ পরে মনটা বেশ ভারাক্রান্ত হয়ে আছে, কবিতার মাঝে তাই খানিকটা আলোর দিশা খুঁজছিলাম। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল, তাই তুলে দেওয়া।

Today, a poem whose last two lines are the favorite lament of every cynical Bangalee – but that is not the reason why I post this. Bangomata (Mother Bengal) was written by Rabindranath Thakur not as a lament or a jibe at the state of our society, but rather, to point towards a salvation from this quagmire in which we Bangalees find ourselves so hoplessly stuck. In a time when it is easy for us to succumb to inaction and domestic bliss even as out soceity descends into darkness, this poem reminds us of what we must instead be – strong and resilient in the face of pain and danger – to lift ourselves out of our current state of being.

বঙ্গমাতা

পূণ্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে
মানুষ হইতে দাও তোমার সন্তানে
হে স্নেহার্ত বঙ্গভূমি, তব গৃহক্রোড়ে
চিরশিশু করে আর রাখিয়ো না ধরে।
দেশদেশান্তর-মাঝে যার যেথা স্থান
খুঁজিয়া লইতে দাও করিয়া সন্ধান।
পদে পদে ছোটো ছোটো নিষেধের ডোরে
বেঁধে বেঁধে রাখিয়ো না ভালোছেলে করে।
প্রাণ দিয়ে, দুঃখ স’য়ে, আপনার হাতে
সংগ্রাম করিতে দাও ভালোমন্দ-সাথে।
শীর্ণ শান্ত সাধু তব পুত্রদের ধরে
দাও সবে গৃহছাড়া লক্ষ্মীছাড়া ক’রে।
সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী,
রেখেছ বাঙালী করে, মানুষ কর নি।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (চৈতালি  হতে সংগ্রহীত)

গান ৬৪ – হৃদ-মাঝারে রাখিব (কত লক্ষ জনম ঘুরে) / Song 64 – Hrid Majhare Rakhibo (Kato Lakkho Janom Ghure/After A Million Incarnations)

বাংলা সাহিত্য আর সঙ্গীত নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করলেও সে বিষয়গুলোতে যে নিজের জ্ঞান কতটা সীমিত, তা আজকের লেখাটি যেই গানটিকে নিয়ে, সেটি শুনে নতুন করে মনে পড়ে গেল। ইউটিউবে ঘোরাঘুরি করতে করতে দ্বিজ ভূষণ এর লেখা আর আনুশেহ অনাদিল এর গলায় এই বৈষ্ণবগীতিটি খুঁজে পাই। গানটা তারপর থেকেই মনে বেজে চলেছে, তাই শোনার আনন্দটুকু পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিতে আজ এই সাইটে পংক্তিসহ সেটি তুলে দেওয়া। দ্বিজ ভূষণ সম্বন্ধে আমার বেশি জানা নেই, তবে যা মনে হয়, তিনি লালনের সমসাময়িক একজন গীতিকার। পাঠকদের জানা থাকলে অনুগ্রহ করে এই পোস্টে মন্তব্য করবেন। বাংলা লোকগীতি যারা শোনেন, তাদের হয়ত আনুশেহ অনাদিলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। যারা নতুন, তাদের উপরে সংযুক্ত করা গানটি শোনার আমন্ত্রণ রইল। বাংলার লোকগানের সাথে শ্বাস্ত্রীয় আর খানিকটা পশ্চিমা সুরের অপূর্ব সুন্দর সমন্বয় রয়েছে এতে – দ্বিজ ভূষণ এর কত লক্ষ জনম ঘুরে – যা এক অর্থে ভক্তিমূলক, আর অন্য অর্থে ভালবাসার মানুষটিকে ছাড়তে না চাওয়ার গান।

In the course of my work on this site, the occassional epiphanies that I know very little about Bangla literature and songs are, more often than not, humbling. Sometimes, however, it comes with the unadulterated joy of a piece never read, or a song never heard before. Today, while surfing across YouTube, I came across Dwij Bhushan’s Kato Lakkho Janom Ghure (After A Million Incarnations), and the song has been resonating in my mind since. Whether that is because of Dwij Bhushan’s words, or Anusheh Anadil’s soulful voice, or the superb incorporation of the esraj into a folk song, I do not know, but in the hope that you too will find what I found in the song, this post. For your listening pleasure, a YouTube link is provided above, and if you wish to pour your heart into a chorus, the lyrics are given below – Dwij Bhushan’s Kato Lakkho Janom Ghure, a song of not letting go.

(In case you are not familiar with the Bangla script, a transliteration can be found here.)

কত লক্ষ জনম ঘুরে

কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে, মনরে……মনরে……
কত লক্ষ জনম ঘুরে ঘুরে, আমরা পেয়েছি ভাই মানব জনম
এ জনম চলে গেলে, এ জনম চলে গেলে আর পাবো না
না না না আর মিলবে না
তাই হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
আমরা আর পাব না, আর পাব না।
“তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না” (২)

ভূবনো মোহনো গোরা, কোন মণিজনার মনোহরা
মণিজনার মনোহরা
ওরে রাধার প্রেমে মাতোয়ারা চাঁদ গৌড়
ধূলায় যাই ভাই গড়াগড়ি
যেতে চাইলে যেতে দেবো না, না না না। (২)
যেতে দেবো না।
তোমায় হৃদয় মাঝে……
তোমায় হৃদয় মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

“যাবো ব্রজের কুলে কুলে” (২)
আমরা মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
ওরে পাগল মন…
যাবো ব্রজের কুলে কুলে
মাখবো পায়ে রাঙ্গাধুলি
“ওরে নয়নেতে নয়ন দিয়ে রাখবো তারে” (২)
চলে গেলে… চলে গেলে যেতে দেবো না,
না না… যেতে দেবো না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

যে ডাকে চাঁদ গৌড় বলে, ওগো ভয় কিগো তার ব্রজের কুলে
যে ডাকে চাঁদ গৌড় বলে, ভয় কিগো তার ব্রজের কুলে
ভয় কি তার ব্রজের কুলে
“ওরে দ্বিজ ভূষণ চাঁদ বলে” (২)
চরন ছেড়ে দেবো না, না না না……
ছেড়ে দেবো না
তোমায় বক্ষ মাঝে……
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।

ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড় আর পাবো না
ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
আর পাব না না না না, আর পাব না।
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিবো ছেড়ে দেবো না
তোমায় বক্ষ মাঝে রাখিবো ছেড়ে দেবো না।
তোমায় হৃদ মাঝারে…

– দ্বিজ ভূষণ

কবিতা ৬৩ – স্বপ্ন / Poem 63 – Swapna (The Dream)

rabindranath-thakur-swapna-1

আজ পাঠকদের ফেলে আসা রাত্রিগুলোকে মনে করিয়ে দেওয়ার মত একটি কবিতা – রবিঠাকুরের কলমে – দূরত্ব, ভালবাসা, আর তা হতে জন্ম নেওয়া স্বপ্নগুলোকে নিয়ে।

Today, a poem that will perhaps stir memories of nights past – written by the Rabindranath Thakur, Swapna (The Dreams) is an achingly beautiful poem of dreams that are born out of love and separation.

স্বপ্ন

কাল রাতে দেখিনু স্বপন–
দেবতা-আশিস-সম     শিয়রে সে বসি মম
মুখে রাখি করুণনয়ন
কোমল অঙ্গুলি শিরে     বুলাইছে ধীরে ধীরে
সুধামাখা প্রিয়-পরশন–
কাল রাতে হেরিনু স্বপন।
হেরি সেই মুখপানে     বেদনা ভরিল প্রাণে
দুই চক্ষু জলে ছলছলি–
বুকভরা অভিমান     আলোড়িয়া মর্মস্থান
কণ্ঠে যেন উঠিল উছলি।
সে শুধু আকুল চোখে     নীরবে গভীর শোকে
শুধাইল, “কী হয়েছে তোর?”
কী বলিতে গিয়ে প্রাণ     ফেটে হল শতখান,
তখনি ভাঙিল ঘুমঘোর।
অন্ধকার নিশীথিনী     ঘুমাইছে একাকিনী,
অরণ্যে উঠিছে ঝিল্লিস্বর,
বাতায়নে ধ্রুবতারা     চেয়ে আছে নিদ্রাহারা–
নতনেত্রে গণিছে প্রহর।
দীপ-নির্বাপিত ঘরে     শুয়ে শূন্য শয্যা-‘পরে
ভাবিতে লাগিনু কতক্ষণ–
শিথানে মাথাটি থুয়ে     সেও একা শুয়ে শুয়ে
কী জানি কী হেরিছে স্বপন
দ্বিপ্রহরা যামিনী যখন।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (চৈতালি হতে সংগ্রহীত)

Swapna (The Dream)
(Translated by the poet himself)

I dreamt that she sat by my head,
tenderly ruffling my hair with her fingers,
playing the melody of her touch.
I looked at her face and struggled with my tears,
till the agony of unspoken words burst my sleep like a bubble.

I sat up and saw the glow of the milky way
above my window, like a world of silence on fire,
and I wondered if at this moment
she had a dream that rhymed with mine.

– Rabindranath Thakur (Collected from Chaitali)

 

গান ৬২ – আনন্দধারা বহিছে ভুবনে / Song 62 – Anondodhara Bohichhe Bhubone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe)

rabindranath-thakur-anandodhara-bohichhe-bhubone

পূজোর মৌসুম আজ, তাই এই সাইটে সচরাচর যা তুলি, আজ তার চাইতে খানিকটা আলাদা একটি কবিতা – নিজেদের ক্ষুদ্রচিন্তা ও স্বার্থপরতাকে উপেক্ষা করে এই মহাসৃষ্টির অপার সৌন্দর্য্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার অনুপ্রেরণাস্বরূপ – রবিঠাকুরের আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। গান শুনতে যারা ভালবাসেন, তাদের জন্য অদিতি মহসীনের গলায় গাওয়া গানটির একটি মধুর সংস্করণ নিচে সংযুক্ত করে দিলাম।

শারদীয় শুভেচ্ছা সবাইকে।

For many Bangalees, it is that joyous time to which they have been counting down for months, and in keeping with the festivities, a spiritual prompt to shed the self-centredness that fills our lives with trivial sorrows and sip joyously instead from the cosmic cascade that flows all around us. In more implicit ways than I can fathom (I certainly overlook more than I grasp), Rabi Thakur’s Anondodhara Bohichhe Bhubone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe) is a masterful distillation of a beautiful and profound understanding of this universe, and one that invokes hope and awe within us in equal measure. I do not know of poems that add dimension to celebration as Anondodhara Bohichhe Bhubone does, but knowing this one poem leaves me immensely glad. On this onset of Puja festivities, I can only share that feeling with you, and I will hope you feel the same way when you read the lines.

P.s.: The translation below is an adaptation of one written by Rumela Sengupta, and therefore reflects my literary inclinations (or lack of taste). You can find the unadulterated version here. For those of you who prefer listening, a beautiful rendition of the song by Aditi Mohsin is linked below.

Autumnal greetings, everyone.

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,
দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে ॥
পান করে রবি শশী অঞ্জলি ভরিয়া–
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি–
নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে ॥

বসিয়া আছ কেন আপন-মনে,
স্বার্থনিমগন কী কারণে?
চারি দিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহীত)

Anondodhara Bohichhe Bhubhone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe)
(Translation inspired by a version written by Rumela Sengupta in the Gitabitan website)

A cascade of joy flows through the universe
night and day – an ambrosia spilling from the heavens above.
The sun and the moon drink up the sweet nectar
in handfuls, ever luminous in their inextinguishable glow
which falls upon the earth – brimming with life and light.

Why do you sit there, lost in thought,
What keeps you immersed in your selfishness?
Let your heart spread its wings, and look around.
Value little, this trifling pain of yours
And let love permeate the void in your life.

– Rabindranath Thakur (Collected from Puja)

কবিতা ৬১ – বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা / Poem 61 – Bipade More Rakkha Karo E Nohe Mor Prarthona (The Grasp of Your Hand)

rabindranath-thakur-bipade-more-rakkha-karo-1

আজ ঈশ্বরের প্রতি একটি প্রার্থনা – জীবনের দুঃখ হতে ত্রাণ কিংবা ভারমুক্তি চেয়ে নয়, বরং তা সইবার শক্তি ও সাহস কামনা করে। ঈশ্বরের প্রতি কতটুকু ভালবাসা আর বিশ্বাস থাকলে একজন মানুষ শুধু তাঁর কাছে শুধু দুঃখকে সইবার শক্তি ও নিঃসংশয়তা প্রার্থনা করে জীবনের মুখোমুখি হয়, তা আমার অনুধাবনে আসতে হয়তো অনেক দেরী, তবে এই কবিতাটুকু পড়লে খানিকটা কল্পনা করা যায় – বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা – রবিঠাকুরের কলমে।

(পুনশ্চ – নিম্নোক্ত বাংলা কবিতাটির দুটো অনুবাদ ছাড়াও রবিঠাকুরের নিজের লেখা একটি ইংরেজী কবিতা ও তার ইতালীয় অনুবাদ এই পোস্টে তুলে দিচ্ছি। গিভ মি দ্য সুপ্রিম কারেজ অফ লাভ কবিতাটির আদি কোন বাংলা সংস্করণ আছে কিনা তা আমি অনেক খোঁজ করেও পাইনি, তবে ভাবার্থের দিক দিয়ে বিপদে মোরে রক্ষা করো কবিতাটিই সেটির সবচেয়ে কাছে বলে মনে হয়, তাই তুলে দেওয়া। পাঠকদের মধ্যে যদি কেউ কবিতাটির কোন আদি বাংলা সংস্করণের কথা জেনে থাকেন, তবে আমাকে জানানোর অনুরোধ রইল)

This time, a prayer for every struggling heart in the form of a poem. Bipade More Rakkha Karo E Nohe Mor Prarthona (The Grasp of Your Hand) is one of Rabindranath Thakur’s most famous poems, and deservedly so, for it represents human dignity and an unquestionable faith in God at their most beautiful and most earnest. I cannot ever imagine rising to that state. After all, it is not for wavering hearts to bear the struggles of life with only faith to hold on to,  and for the ones which can, it is only the worthiests’ privilege to ask God for strength to face life’s trials instead of seeking relief. If you aspire, however, Thakur’s poem is a beautiful demystification of that mood.

(P.s. – Besides including two translations of the Bangla original (one by the poet himself), I have also added another English poem by Thakur, Give Me the Supreme Courage of Love (and an Italian translation – Dammi Il Supremo Coraggio Dell’amore). The reason for this inclusion is that thematically, the work seems to be a derivative of Bipade More Rakkha Karo E Nohe Mor Prarthona – I at least have not found a directly corresponding Bangla original. If you happen to be aware of one, do let me know.)

বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা

বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা–
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয়॥
সহায় মোর না যদি জুটে নিজের বল না যেন টুটে,
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।
আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা–
তরিতে পারি শকতি যেন রয়।
আমার ভার লাঘব করি নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,
বহিতে পারি এমনি যেন হয়।
নম্রশিরে সুখের দিনে তোমারি মুখ লইব চিনে–
দুখের রাতে নিখিল ধরা যেদিন করে বঞ্চনা
তোমারে যেন না করি সংশয়।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা  হতে সংগ্রহীত)

Bipade More Rakkha Karo E Nohe Mor Prarthona (The Grasp of Your Hand)
(Version 1 – Translated by the poet himself)

Let me not pray to be sheltered from dangers but to be fearless in facing them.
Let me not beg for the stilling of my pain but for the heart to conquer it.
Let me not look for allies in life’s battlefield but to my own strength.
Let me not crave in anxious fear to be saved but hope for the patience to win my freedom.
Grant me that I may not be a coward, feeling your mercy in my success alone; but let me find the grasp of your hand in my failure.

(Version 2 – By Ruma Chakravarti,  who maintains a beautiful collection of her own musings and translations of Thakur’s writings on the Web)

I do not pray so that you may save me from danger –
Instead, I entreat you to make me grow unafraid.
Perhaps you might consider not consoling me when I am filled with sorrow,
Let me instead learn to conquer it when faced with pain.
When I have no one to lean on, let my own strength not desert me
When life only takes, giving back false hope in return
May I be strong enough to resist it.
My prayer is not for you to be my savior –
I would rather you gave me the will to overcome.
I would rather you did not give solace and shoulder my burden,
But give me the might to do the same for myself.
Let me humbly know you for my own in times of happiness –
So that on the darkest of nights when the world turns away
I may not doubt your benevolent presence.

– Rabindranath Thakur (Collected from Fruit-Gathering)

Give Me the Supreme Courage of Love
(Version 3 (?) – An English verse which is somewhat related to the Bangla poem above – if you find a better match in Bangla, please let me know in a comment on this post)

Give me the supreme courage of love, this is my prayer – the courage to speak, to do, to suffer at thy will, to leave all things or be left alone. Strengthen me on errands of danger, honor me with pain, and help me climb to that difficult mood which sacrifices daily to thee.

Give me the supreme confidence of love, this is my prayer – the confidence that belongs to life in death, to victory in defeat, to the power hidden in frailest beauty, to that dignity in pain which accepts hurt but disdains to return it.

– Rabindranath Thakur (Collected from The Fugitive III)

Dammi Il Supremo Coraggio Dell’amore
(Version 3.1 (?) – An Italian translation of version 3 by Martha Babbitt, a wonderful human and a friend)

Dammi il supremo coraggio dell’amore,
questa è la mia preghiera,
coraggio di parlare, di agire,
di soffrire se è Tuo volere,
di abbandonare ogni cosa,
o di essere lasciato solo.
Dammi la forza in missioni pericolosi,
Onorarmi con la sofferenza,
E aiutami a raggiungere quello stato elusivo
Che ogni giorno fa sacrifici a Te.

Dammi la suprema fiducia nell’amore,
questa è la mia preghiera,
la fiducia nella vita nella morte,
nella vittoria nella sconfitta,
nella potenza nascosta nella più fragile bellezza,
nella dignità del dolore che accoglie l’offesa,
ma si rifiuta di rispondere con l’offesa.

– Rabindranath Thakur (The Fugitive III)

কবিতা ৬০ – স্বল্পশেষ / Poem 60 – Swalpashesh (The Little That Remains)

rabindranath-thakur-swalpashesh-2

রবিঠাকুরের প্রেমের কবিতাগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্যই পাঠকের মনকে নাড়া দেওয়ার মত, তবে সেগুলোর একটি দিক, যা আমার খুব ভাল লাগে তা হল এই, যে কবিগুরুর ভালবাসার বর্ণনায় অহংকারের বালাই নেই বললেই চলে। প্রিয়জনের প্রতি মানুষের ভালবাসা যে কতটুকু পবিত্র, স্বার্থহীন ও ভক্তিপূর্ণ হতে পারে, তা বোধহয় রবীন্দ্রনাথের মত গভীর আবেগে খুব কম লেখকই ব্যক্ত করতে পেরেছেন। কে জানে, কবিগুরুর মত করে লিখতে গেলে হয়তো তাঁর মত করে হারাতে ও ভালবাসতেও হয় – ব্যক্তিগত জীবনে যে রবিঠাকুর ব্যাথা পেয়েছিলেন অনেক, তা তো আর আমাদের অজানা নয়।

আজকের লেখাটি আমার জানা রবিঠাকুরের সবচেয়ে প্রেমার্দ্র কবিতাগুলোর মধ্যে একটি – স্বল্পশেষ – যা সবকিছু সাঙ্গ হওয়ার পরেও যে ভালবাসাটুকু শ্বাশত হয়ে থেকে যায়, তা দিয়ে প্রিয়জনকে শেষবার সাজিয়ে দিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়া নিয়ে।

I have been wondering this for some time now: is love a selfish desire to possess a cherished someone, or is it the giving away of the self to that same person? To be honest, I do not know… Perhaps it is both of those – entwined in a manner that foments the inextricable mix of tenderness, affection, passion and jealousy that we know love can be? But of all its forms, perhaps love is truest and most sacred when it leaves the lover overshadowed and forgotten in its profundity. I am speculating, of course – of love and its depth, I would know little. But if words are ever true, then the following poem by Thakur would be a fitting testament to the belief – The Little That Remains is a weary man’s song for the girl he loves.

স্বল্পশেষ

অধিক কিছু নেই গো কিছু নেই,
কিছু নেই–
যা আছে তা এই গো শুধু এই,
শুধু এই।
যা ছিল তা শেষ করেছি
একটি বসন্তেই।
আজ যা কিছু বাকি আছে
সামান্য এই দান–
তাই নিয়ে কি রচি দিব
একটি ছোটো গান?

একটি ছোটো মালা তোমার
হাতের হবে বালা।
একটি ছোটো ফুল তোমার
কানের হবে দুল।
একটি তরুলতায় ব’সে
একটি ছোটো খেলায়
হারিয়ে দিয়ে যাবে মোরে
একটি সন্ধেবেলায়।
অধিক কিছু নেই গো কিছু নেই,
কিছু নেই।
যা আছে তা এই গো শুধু এই,
শুধু এই।
ঘাটে আমি একলা বসে রই,
ওগো আয়!
বর্ষানদী পার হবি কি ওই–
হায় গো হায়!
অকূল-মাঝে ভাসবি কে গো
ভেলার ভরসায়।

আমার তরীখান
সইবে না তুফান;
তবু যদি লীলাভরে
চরণ কর দান,
শান্ত তীরে তীরে তোমায়
বাইব ধীরে ধীরে।
একটি কুমুদ তুলে তোমার
পরিয়ে দেব চুলে।
ভেসে ভেসে শুনবে বসে
কত কোকিল ডাকে
কূলে কূলে কুঞ্জবনে
নীপের শাখে শাখে।

ক্ষুদ্র আমার তরীখানি–
সত্য করি কই,
হায় গো পথিক, হায়,
তোমায় নিয়ে একলা নায়ে
পার হব না ওই
আকুল যমুনায়।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ক্ষণিকা হতে সংগ্রহীত)

Swalpashesh (The Little That Remains)
Translated by the Poet himself

It is little that remains now, the rest was spent in one careless summer. It is just enough to put in a song and sing to you; to weave in a flower- chain gently clasping your wrist; to hang in your ear like a round pink pearl, like a blushing whisper; to risk in a game one evening and utterly lose.

My boat is a frail small thing, not fit for crossing wild waves in the rain. If you but lightly step on it I shall gently row you by the shelter of the shore, where the dark water in ripples are like a dream-ruffled sleep; where the dove’s cooing from the drooping branches makes the noon- day shadows plaintive. At the day’s end, when you are tired, I shall pluck a dripping lily to put in your hair and take my leave.

– Rabindranath Thakur (Collected from Lover’s Gift)

কবিতা ৫৯ – দেশলাইয়ের কাঠি / Poem 59 – Deshlai er Kathi (The Matchstick)

sukanta-bhattacharya-deshlaier-kathi-1

অনেকদিন পরে আবার সুকান্ত ভট্টাচার্যের একটি কবিতা –দেশলাইয়ের কাঠি। কবি সুকান্ত যে ব্যক্তিগত জীবনে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন, এই সাইটে আমি তা উল্লেখ করেছি আগেই। এই কবিতাটি সেই আদর্শ থেকেই লেখা – একটি আগুন নিয়ে, যা এই সমাজের ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে থাকা নিপীড়িতদের ভিতরে সম্ভাবনা হয়ে বেঁচে থাকে, আর যা একদিন বিপ্লব হয়ে হয়তো বদলে দেবে সারা পৃথিবীকেই।

After a long time, a poem by Sukanta Bhattacharya. Even for the most literally inclined of readers, the symbolism in Deshlai er Kathi (The Matchstick) is hard to miss – as I had mentioned earlier, Sukanta’s writings were heavily inspired by Communist ideas – in the poem, the poet speaks to the burgeoisie and the elite of our society through a metaphor that is seemingly little and a mere convenience to most of us, but also one that holds the potential to burn the loftiest of palaces down to rubble. To some, it is literally the matchstick, but to others, it is the proleteriat who rear a flame that can burn down the heirarchies of this world.

দেশলাইয়ের কাঠি

আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি
এত নগণ্য, হয়তো চোখেও পড়ি না;
তবু জেনো
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ—
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
মনে আছে সেদিন হুলুস্থুল বেধেছিল?
ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন –
আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!
কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,
কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাত্‍‌
আমি একাই- ছোট্ট একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
এমনি বহু নগর, বহু রাজ্যকে দিতে পারি ছারখার করে
তবুও অবজ্ঞা করবে আমাদের?
মনে নেই? এই সেদিন-
আমরা সবাই জ্বলে উঠেছিলাম একই বাক্সে;
চমকে উঠেছিলে–আমরা শুনেছিলাম তোমাদের বিবর্ণ মুখের আর্তনাদ।
আমাদের কী অসীম শক্তি
তা তো অনুভব করেছো বারংবার;
তবু কেন বোঝো না,
আমরা বন্দী থাকবো না তোমাদের পকেটে পকেটে,
আমরা বেরিয়ে পড়ব, আমরা ছড়িয়ে পড়ব
শহরে, গঞ্জে, গ্রামে– দিগন্ত থেকে দিগন্তে।
আমরা বার বার জ্বলি, নিতান্ত অবহেলায়-
তা তো তোমরা জানোই!
কিন্তু তোমরা তো জানো না:
কবে আমরা জ্বলে উঠব-
সবাই– শেষবারের মতো!

– সুকান্ত ভট্টাচার্য (ছাড়পত্র  হতে সংগ্রহীত)

কবিতা ৫৮ – জন্মকথা / Poem 58 – Janmokatha (The Beginning)

Rabindranath Thakur-Khoka Ma ke Shudhay (3)

প্রতিটি শিশুর মনে কখনো না কখনো জাগা একটি প্রশ্ন, আর তার উত্তরে কিছু কথা, যা হয়তোবা প্রতিটি নারীরই মাতৃত্ব আর ভালবাসার পূর্ণতম বহিঃপ্রকাশ। জন্মকথা য় শিশুর প্রতি মায়ের আবেগ আর স্নেহ এত আর্দ্রভাবে ফুটে উঠেছে, যে কবিতাটি যে একজন পুরুষের লেখা তা বিশ্বাস করা কঠিন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ হয়তো রবীন্দ্রনাথ, আর বাঙ্গালী হিসেবে আমরা ভাগ্যবান, সেকারণেই। আমাদের মধ্যে সুপ্ত কিংবা প্রষ্ফুটিত মা ও শিশু যারা, তাদের মনে করে আজ প্রিয় এই কবিতাটি তুলে দিলাম।

“Where did I come from?” is perhaps the one question that every child asks its parent(s) one day. In Janmokatha (The Beginning), Rabindranath Thakur answers it with such familiarity and tenderness that it seems hard to believe that the poem was written by a man. But the poem is more than a due testament to Thakur’s genius – in its beautiful, innocent, soft and sacred portrayal of motherhood, it is a perfect celebration of the relationship between a mother and her child. Life, in its own ways, leaves many of us unable to grasp the poem in its entirety, but if you are a mother or will ever be one, this one is for your heart. A translation by the poet himself is also provided below.

জন্মকথা

খোকা মাকে শুধায় ডেকে–
“এলেম আমি কোথা থেকে,
কোন্‌খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।’
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে
খোকারে তার বুক বেঁধে–
“ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।
ছিলি আমার পুতুল-খেলায়,
প্রভাতে শিবপূজার বেলায়
তোরে আমি ভেঙেছি আর গড়েছি।
তুই আমার ঠাকুরের সনে
ছিলি পূজার সিংহাসনে,
তাঁরি পূজায় তোমার পূজা করেছি।
আমার চিরকালের আশায়,
আমার সকল ভালোবাসায়,
আমার মায়ের দিদিমায়ের পরানে–
পুরানো এই মোদের ঘরে
গৃহদেবীর কোলের ‘পরে
কতকাল যে লুকিয়ে ছিলি কে জানে।
যৌবনেতে যখন হিয়া
উঠেছিল প্রস্ফুটিয়া,
তুই ছিলি সৌরভের মতো মিলায়ে,
আমার তরুণ অঙ্গে অঙ্গে
জড়িয়ে ছিলি সঙ্গে সঙ্গে
তোর লাবণ্য কোমলতা বিলায়ে।
সব দেবতার আদরের ধন
নিত্যকালের তুই পুরাতন,
তুই প্রভাতের আলোর সমবয়সী–
তুই জগতের স্বপ্ন হতে
এসেছিস আনন্দ-স্রোতে
নূতন হয়ে আমার বুকে বিলসি।
নির্নিমেষে তোমায় হেরে
তোর রহস্য বুঝি নে রে,
সবার ছিলি আমার হলি কেমনে।
ওই দেহে এই দেহ চুমি
মায়ের খোকা হয়ে তুমি
মধুর হেসে দেখা দিলে ভুবনে।
হারাই হারাই ভয়ে গো তাই
বুকে চেপে রাখতে যে চাই,
কেঁদে মরি একটু সরে দাঁড়ালে।
জানি না কোন্‌ মায়ায় ফেঁদে
বিশ্বের ধন রাখব বেঁধে
আমার এ ক্ষীণ বাহু দুটির আড়ালে।’

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু হতে সংগ্রহীত)

Janmokatha (The Beginning)
Translated by the poet himself

‘Where have I come from, where did you pick me up?’ the baby asked its mother.
She answered half crying, half laughing, and clasping the baby to her breast,-
‘You were hidden in my heart as its desire, my darling.
You were in the dolls of my childhood’s games; and when with clay
I made the image of my god every morning, I made and unmade you then.
You were enshrined with our household deity, in his worship I worshipped you.
In all my hopes and my loves, in my life, in the life of my mother you have lived.
In the lap of the deathless Spirit who rules our home you have been nursed for ages.
When in girlhood my heart was opening its petals, you hovered as
a fragrance about it
Your tender softness bloomed in my youthful limbs, like a glow in
the sky before the sunrise.
Heaven’s first darling, twin-born with the morning light, you have floated
down the stream of the world’s life, and at last you have stranded on my heart.
As I gaze on your face, mystery overwhelms me; you who belong to
all have become mine.
For fear of losing you I hold you tight to my breast.
What magic has snared the world’s treasure in these slender arms of mine?’

– Rabindranath Thakur (Collected from The Crescent Moon)

কবিতা ৫৭ – চিত্ত যেথা ভয়শূন্য / Poem 57 – Chitto Jetha Bhayshunyo (Where the Mind is Without Fear)

Rabindranath Thakur-Chitto Jetha 2

(সম্পাদিত ছবিটির অনিন্দ্যসুন্দর আদি প্রতিরূপটি তুলেছেন জুবায়ের বিন ইকবাল / The original version of this beautiful photo was taken by Zubair bin Iqbal.)

অনেক দিন ধরেই রবিঠাকুরের চিত্ত যেথা ভয়শূন্য কবিতাটি আপলোড করব ভাবছিলাম, কিন্তু করব করব করে এতদিন করা হয়নি। আজ কবিতাটির কথা মনে পড়ায় ইন্টারনেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে উপরের এই সুন্দর ছবিটি চোখে পড়ে গিয়ে পংক্তিগুলোর  সাথে জুড়ে দিতেই হল। আলোর পথের যাত্রী… কবিতাটির সাথে বেশ মানিয়ে যায়, না?

এই ওয়েবসাইটের পাঠকদের মধ্যে যারা তরুণ বাংলাদেশি, ‘ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত’ দিয়ে শেষ হওয়া কবিতাটি হয়তো তাদের কাছে বেমানান মনে হতে পারে। রবিঠাকুর যে সময় কবিতাটি লেখেন, তখন ভারতীয় জাতীয়তাবোধের তুলনায় ‘বাংলাদেশ’ এর ধারণাটি ছিল নেহাতই সুপ্ত, তাই সেটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কবিতাটির ভাবার্থটুকু – সীমান্তের এপার আর ওপার বাংলার সবটুকুই যখন কুসংস্কার, দুর্নীতি আর ধর্মের অপব্যাখ্যার অন্ধকারে নিমজ্জিত, তখন জগৎপিতার কাছে দেশের জন্যে বাঙ্গালীর এর চাইতে সারপূর্ণ প্রার্থনা আর কি হতে পারে? তাই আজ এটি তুলে দেওয়া।

This time, a poem I have been murmuring to myself for a while. Chitto Jetha Bhayshunyo (Where the Mind is Without Fear)should perhaps be the prayer of every patriot for his or her country – and maybe more so for every Bangalee. In a time when communalism, corruption and bigotry reign across nations, these are lines worthy of keeping in your heart.

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খন্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়–
যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি,
পৌরুষেরে করে নি শতধা; নিত্য যেথা
তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা–
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,
ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (নৈবেদ্য  হতে সংগ্রহীত)

Chitto Jetha Bhayshunyo (Where the mind is without fear)
(Translated by the poet himself)

Where the mind is without fear and the head is held high
Where knowledge is free
Where the world has not been broken up into fragments
By narrow domestic walls
Where words come out from the depth of truth
Where tireless striving stretches its arms towards perfection
Where the clear stream of reason has not lost its way
Into the dreary desert sand of dead habit
Where the mind is led forward by thee
Into ever-widening thought and action
Into that heaven of freedom, my Father, let my country awake.

– Rabindranath Thakur (Collected from Naivedya)

কবিতা ৫৬ – মনে পড়া / Poem 56 – Mone Pora (I Cannot Remember My Mother)

Rabindranath Thakur-Ma Ke Amar

আজ রবিঠাকুরের আরেকটি কবিতা – পৃথিবীর অগোচরে একাকী মুহূর্তগুলোতে বয়সের মুখোশটা খুলে পড়ে ভিতরের ছোট্ট খোকা/খুকিটি যখন বেরিয়ে আসতে চায়, সেই মুহূর্তগুলোর জন্য।

A poem by Rabindranath Thakur, for the moments when it feels as if the little boys and girls within us have been made to grow up much sooner than they would have liked.

মনে পড়া 

মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে
হঠাৎ অকারণে
একটা কী সুর গুনগুনিয়ে
কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন
আমার খেলার মাঝে।
মা বুঝি গান গাইত, আমার
দোলনা ঠেলে ঠেলে;
মা গিয়েছে, যেতে যেতে
গানটি গেছে ফেলে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন আশ্বিনেতে
ভোরে শিউলিবনে
শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে
ফুলের গন্ধ আসে,
তখন কেন মায়ের কথা
আমার মনে ভাসে?
কবে বুঝি আনত মা সেই
ফুলের সাজি বয়ে,
পুজোর গন্ধ আসে যে তাই
মায়ের গন্ধ হয়ে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে
শোবার ঘরের কোণে;
জানলা থেকে তাকাই দূরে
নীল আকাশের দিকে
মনে হয়, মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে।
কোলের ‘পরে ধরে কবে
দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে
সারা আকাশ ছেয়ে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু ভোলানাথ  হতে সংগ্রহীত)

Mone Pora (I Cannot Remember My Mother)
(Translated by the poet himself)

I cannot remember my mother,
only sometime in the midst of my play
a tune seems to hover over my playthings,
the tune of some song that she used to hum
while rocking my cradle.
I cannot remember my mother,
but when in the early autumn morning
the smell of the shiuli flowers floats in the air,
the scent of the morning service in the temple
comes to me as the scent of my mother.
I cannot remember my mother,
only when from my bedroom window I send my eyes
into the blue of the distant sky,
I feel that the stillness of my mother’s gaze on my face
has spread all over the sky.

– Rabindranath Thakur (Collected from Shishu Bholanath)

কবিতা ৫৫ – কথা ছিল এক-তরীতে / Poem 55 – Katha Chhilo Ek Tori Te (It Was Whispered)

Rabindranath Thakur-Katha Chhilo Ek Tori Te (1)

সাহিত্যালাপের নামে পাঠকদের উপর যা চাপিয়ে দেই, তার অনেকটুকুই যে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বহিঃপ্রকাশ, এই সাইটে তা আমি স্বীকার করেছি আগেই। সম্প্রতি অবশ্য সেটিকেও ছাড়িয়ে আপলোডগুলোতে অতীত জীবনের দিনলিপীর পাতাগুলোই উঠে এসেছে বেশি। জানিনা কেন, তবে ফেলে আসা দিনগুলির কথা মনে পড়া কি খুব দোষের? আজ তাই পুরোনো স্মৃতি-জাগানো আরেকটি কবিতা – অপেক্ষা নিয়ে।

Of late, the choice of poems on this website has more been a reflection of the feelings than literary bias at this end. Perhaps that is because of how sobering it has been to get an inkling of the range and depth of human feelings – if only that wisdom and sadness did not go hand in hand! The realization of how much more there still is to learn and grow can be a bit overwhelming sometimes – but it also teaches one to be loving and kind, perhaps to a fault, but for some of us, that is the best we can ever hope to be.

Katha Chhilo Ek Tori Te (It Was Whispered) is a poem about waiting – expressed with a tenderness and sincere longing that perhaps only Rabindranath Thakur could. If you have ever waited  in earnest for someone, or will be returning to someone who has, then this poem is for you.

কথা ছিল এক-তরীতে

কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি
যাব   অকারণে ভেসে কেবল ভেসে,
ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগামী
কোথায়   যেতেছি কোন্‌ দেশে সে কোন্‌ দেশে।
কূলহারা সেই সমুদ্র-মাঝখানে
শোনাব গান একলা তোমার কানে,
ঢেউয়ের মতন ভাষা-বাঁধন-হারা
আমার   সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে।

           আজো সময়  হয় নি কি তার, কাজ কি আছে বাকি।
ওগো  ওই-যে সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে।
মলিন আলোয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখি
আপন   কুলায়-মাঝে সবাই এল ফিরে।
কখন তুমি আসবে ঘাটের ‘পরে
বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে।
অস্তরবির শেষ আলোটির মতো
তরী   নিশীথমাঝে যাবে নিরুদ্দেশে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (গীতাঞ্জলী  হতে সংগ্রহীত)

Katha Chhilo Ek Tori Te (It Was Whispered)
(Translated by the poet himself)

Early in the day it was whispered
that we should sail in a boat, only thou and I,
and never a soul in the world would know of this
our pilgrimage to no country and to no end.

In that shoreless ocean,
at thy silently listening smile
my songs would swell in melodies,
free as waves, free from all bondage of words.

Is the time not come yet?
Are there works still to do?
Lo, the evening has come down upon the shore
and in the fading light
the seabirds come flying to their nests.

Who knows when the chains will be off,
and the boat, like the last glimmer of sunset,
vanish into the night?

– Rabindranath Thakur (Collected from Gitanjali)

কবিতা ৫৪ – প্রশ্নের অতীত / Poem 54 – Proshner Ateet (Questions and Silence)

Rabindranath Thakur-Proshner Ateet

আজ অনন্ত প্রশ্নের জবাবে অনন্ত নীরবতা নিয়ে একটি অণুকাব্য – প্রশ্নের অতীত – রবিঠাকুরের কলমে।

On questions and silences, a beautiful metaphor by Rabindranath Thakur.

প্রশ্নের অতীত (Questions and Silence)

  হে সমুদ্র, চিরকাল কী তোমার ভাষা
সমুদ্র কহিল, মোর অনন্ত জিজ্ঞাসা।
কিসের স্তব্ধতা তব ওগো গিরিবর?
হিমাদ্রি কহিল, মোর চির-নিরুত্তর।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (কণিকা হতে সংগ্রহীত)

“What language is thine o sea?”
“The language of eternal question.”
“What language is thine, o sky?”
“The language of eternal silence.”

– Rabindranath Thakur (Collected from Stray Birds)

 

কবিতা ৫৩ – মানুষ / Poem 53 – Manush (Man)

Nazrul Islam-Manush

আজ নজরুলের একটি মানবতাবাদী কবিতা – মানুষ। আজকের এই সময়ে, যখন ধার্মিকেরা অধার্মিক আর রক্ষকেরা ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ, তখন কবিতাটির পংক্তিগুলো আরো বেশি সত্যি হয়ে উঠেছে, তাই আজ লেখাটি তুলে দেওয়া। মানুষ নজরুল রচনা করেছিলেন তাঁর সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে প্রতিবাদী পর্যায়ে, আর কবিতাটির পংক্তিগুলোতে তাই আমরা তাঁর অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরসোচ্চার ও আর মানবতাবাদের উপর অটল বিশ্বাসী রূপটিকে দেখতে পাই। সমাজের উচ্চবিত্ত আর ধর্মের বস্ত্রধারি শঠরা নজরুলের কলমের কাছে কখনোই ছাড় পায়নি – মানুষ  তারই একটি অগ্নিতুল্য নিদর্শন, আর তারই সাথে নজরুলের বিশ্বাসের প্রতিধ্বনি – যে “মানুষের চেয়ে … নহে কিছু মহীয়ান”।

Today, a poem that is all thunder and rage at the hypocrisy of the rich and the pious, and fittingly, by that fireball of a man, the Rebel Poet, Nazrul Islam. Manush (Man) was written by Nazrul when he was at the boldest phase of his literary career, and in accordance, it seethes at the injustice that is meted out to the downtrodden of our society by the rich the the pious. At his most passionate, Nazrul spares not even the religious leaders, and justly so, as religion to them is merely a means to benefit from the oppressive status quo. In essence, however, Manush remains a humanist poem in which the poet finds the best of humanity, and depending on whom you  ask, God himself, in the hardworking poor among us.

মানুষ

গাহি সাম্যের গান–
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান ,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি ।
‘পুজারী, দুয়ার খোল,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পুজার সময় হলো !’
স্বপ্ন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়
দেবতার বরে আজ রাজা- টাজা হয়ে যাবে নিশ্চয় !
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনা তো সাত দিন !’
সহসা বন্ধ হল মন্দির , ভুখারী ফিরিয়া চলে
তিমির রাত্রি পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে !
ভুখারী ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পুজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয় !’
মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি !
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে-আজারির চিন্
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন !’
তেরিয়াঁ হইয়া হাঁকিল মোল্লা–”ভ্যালা হলো দেখি লেঠা,
ভুখা আছ মর গে-ভাগাড়ে গিয়ে ! নামাজ পড়িস বেটা ?”
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা !’ মোল্লা হাঁকিল- ‘তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ !’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা !
ভুখারী ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে–
“আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তেমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করোনি প্রভু !
তব মজসিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবী !”
কোথা চেঙ্গিস, গজনী-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড় ;
ভেঙ্গে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া- দ্বার !
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায় কে দেয় সেখানে তালা ?
সব দ্বার এর খোলা র’বে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা !
হায় রে ভজনালয়
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয় !
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি
ও মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে ।
পুজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল !–মুর্খরা সব শোনো
মানুষ এনেছে গ্রন্থ,–গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো ।
আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এরা পিতা পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশী করে প্রতি ধমনীতে বাজে !
আমরা তাঁদেরি সন্তান , জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ ।
হেস না বন্ধু ! আমার আমি সে কত অতল অসীম
আমিই কি জানি কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদি ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা ?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি ?
হয়তো উহারই বুকে ভগবান জাগিছেন দিবারাতি !
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ–দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজানালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয় !
হয়ত ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটীর-বাসে
জন্মিছে কেহ-জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে !
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখেনি–হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে !
ও কে ? চন্ডাল ? চমকাও কেন ? নহে ও ঘৃণ্য জীব !
ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চন্ডাল, কাল হতে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দী পাঠ ।
রাখাল বলিয়া কারে কর হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে !
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে !
চাষা বলে কর ঘৃণা !
দেখো চাষা রুপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না !
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারও ধরিল হাল
তারাই আনিল অমর বাণী–যা আছে র’বে চিরকাল ।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি !
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে
দ্বার দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলৈ ।
সে মোর রহিল জমা –
কে জানে তোমারে লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা !
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ দু’চোখ স্বার্থ ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হয়েছে কুলী ।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা মথিত সুধা
তাই লুটে তুমি খাবে পশু ? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা ?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনখানে !
তোমারি কামনা-রাণী
যুগে যুগে পশু ফেলেছে তোমায় মৃত্যু বিবরে টানি ।

– কাজী নজরুল ইসলাম

কবিতা ৫২ – সোনার তরী / Poem 52 – Sonar Tori (The Golden Boat)

rabindranath-thakur-sonar-tori

একটি কবিতার অর্থ কবির একান্তই নিজের থাকে ততক্ষণই, যতক্ষণ সেটি একান্তই তার মনে ভাবনা হয়ে কিংবা অন্যের অগোচরে লেখা হয়ে রয়। যেই মুহূর্তে পৃথিবীর কাছে সেটি উন্মুক্ত হয়ে যায়, সেই মালিকানাটুকু যায় হারিয়ে, আর পাঠকের মনের প্রতিফলনের সাথে মিশে গিয়ে কবিতার আদি অর্থটুকু এক একটি হৃদয়ে এক একটি নতুন রূপ লাভ করে। আর সেইসব অর্থের ভীড়ে কবির মনের কথাটুকু হয়তো হারিয়েই যায়, আমরা কি তা জানতে পারি কখনো?

এই অনাবশ্যক ভণিতাটুকুর কারণ এই, যে রবিঠাকুরের সোনার তরী  নিয়ে কিছুদিন আগে এক বন্ধুর সাথে খানিকটা আলোচনা হয়েছিল। বন্ধুর মতে, কবিতাটি সমাজ কেমন করে একজন মানুষের অবদানটুকু গ্রহণ করে তাকে শূন্য করে ফেলে রেখে যায়, তা নিয়ে। মানুষের মাঝে মহীরুহসম রবীন্দ্রনাথ যে একাকীত্ব থেকে তেমনটা অনুভব করে লিখবেন, তা অস্বাভাবিক নয়। আমার অবশ্য কবিতাটির আক্ষরিক অর্থ করতে ইচ্ছে করে… এমন সুন্দর এই কবিতাটির মাঝে নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজতে চাওয়াটুকু কি খুব দোষের।

Although he writes his poems on his own, the poet holds ownership of the meaning only as long as the lines are kept away from the reader. The moment his work is read, that ownership is lost to others, who reflect themselves onto the lines to create new meanings without ever realizing what the poet had wanted to say. But then again, perhaps it is those inherent mutations which makes this world so rich with meaning… do you feel the same way?

A few days ago, I was talking with a friend when our conversation meandered to Rabindranath Thakur’s Sonar Tori (The Golden Boat). My friend was of the opinion that the poem is about how the society gladly accepts the contributions of man, but seldom the man who has emptied himself for her sake. Perhaps Rabindranath, the titan that he was among men, felt the loneliness that my friend inferred in his lines; after all, it was the sage himself who wrote –

The grass seeks her crowd in the earth
The tree seeks his solitude of the sky.
(Collected from Stray Birds)

Given my penchant for literal interpretations, however, I read the poem very differently – it is hard not to, when the interpretation falls so in line with feelings at this end.

English translations, the first by the Kabiguru himself, and a second by the eminent Bangla scholar William Radice, are included below.

সোনার তরী

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

      একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা–
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।

      গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে–
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।

ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।

      যত চাও তত লও তরণী-‘পরে।
আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে–
এখন আমারে লহ করুণা করে।

      ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি–
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সোনার তরী  হতে সংগ্রহীত)

Sonar Tori (The Golden Boat)
(Version 1: Translated by the poet himself, taken from The Fugitive)

The rain fell fast. The river rushed and hissed. It licked up and swallowed the island, while I waited alone on the lessening bank with my sheaves of corn in a heap.

From the shadows of the opposite shore the boat crosses with a woman at the helm.
I cry to her, ‘Come to my island coiled round with hungry water, and take away my year’s harvest.’

She comes, and takes all that I have to the last grain; I ask her to take me.
But she says, ‘No’-the boat is laden with my gift and no room is left for me.

(Version 2: Translated by William Radice)

Clouds rumbling in the sky; teeming rain.
I sit on the river bank, sad and alone.
The sheaves lie gathered, harvest has ended,
The river is swollen and fierce in its flow.
As we cut the paddy it started to rain.

One small paddy-field, no one but me –
Flood-waters twisting and swirling everywhere.
Trees on the far bank; smear shadows like ink
On a village painted on deep morning grey.
On this side a paddy-field, no one but me.

Who is this, steering close to the shore
Singing? I feel that she is someone I know.
The sails are filled wide, she gazes ahead,
Waves break helplessly against the boat each side.
I watch and feel I have seen her face before.

Oh to what foreign land do you sail?
Come to the bank and moor your boat for a while.
Go where you want to, give where you care to,
But come to the bank a moment, show your smile –
Take away my golden paddy when you sail.

Take it, take as much as you can load.
Is there more? No, none, I have put it aboard.
My intense labour here by the river –
I have parted with it all, layer upon layer;
Now take me as well, be kind, take me aboard.

No room, no room, the boat is too small.
Loaded with my gold paddy, the boat is full.
Across the rain-sky clouds heave to and fro,
On the bare river-bank, I remain alone –
What had has gone: the golden boat took all.

– Rabindranath Thakur