গল্প ১২৬ – মহেশ / Story 126 – Mahesh


পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link
: Sharat Chandra Chattopadhyay-Mahesh

মহেশ – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

আজ ভারতের বর্তমান প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখে একটি গল্প। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মহেশ শুধুমাত্র সেটির বিষয়বস্তুর কারণেই বাংলা সাহিত্যে অনন্য একটি গল্প বলে বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে – গল্পটির মূল চরিত্র গ্রামীণ-বাংলারই কোন কোণের এক দরিদ্র মুসলিম চাষী গফুর ও তার মেয়ে আমিনা, আর তাদের একমাত্র ষাঁড় মহেশ। গল্পের শুরুতে আমরা দেখি যে প্রবল খরার আর অনাহারের মাঝেও গফুর আর আমিনা মহেশকে দেখে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু গ্রামে অবস্থাপন্ন গোভক্ত যারা, তাদের কাছে মহেশ অনাদর আর নিষ্ঠুরতাই পায় শুধু। চরম দারিদ্র আর খাদ্যাভাবের ফলে গফুরের পরিবারটির যা করুণ পরিণতি হওয়ার কথা, শেষে তাই হয়, কিন্তু গল্পটি পড়তে পড়তে মনে প্রশ্ন জাগে, যা ঘটে, তার জন্যে কি শুধু গফুরই দায়ী?

এই সময়ে, বিশেষ করে যেখানে একের পর এক গো-সংক্রান্ত ঘটনার কারণে ভারতে তোলপাড় চলছে, সেখানে একজন চাষীর তার ষাঁড়ের প্রতি গভীর মমতা নিয়ে লেখা এJই গল্পটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। যার যার ধর্মবিশ্বাস থেকে যাতে আমরা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি আর সরলীকরণ না করি, সেই আশায়ই তাই আজ এই গল্পটি তুলে দেওয়া।

Mahesh – Sharat Chandra Chattopadhyay

Today, a fitting story for these times. Written by the eminent 19th Century novelist Sharat Chandra Chattopadhyay, Mahesh narrates the tale of a rural Muslim family which, perhaps contrary to what prevalent stereotypes in the subcontinent would suggest, very much cares for its emaciated and weak ox, Mahesh. To the village landlord and his pious stooges, however, Mahesh is only a hungry menace which must be contained. As the story progresses against the background of a drought, things take a cruel and tragic turn, but as you read the story, ask yourself, who is the real villain here?

One might argue that the story is a rather one-sided depiction of reality, and perhaps they are right. But even so, it is a side that exists, and one that we must consider – if anything, that is what religion teaches us.

Advertisements

কবিতা ৯ – দেখিনু সেদিন রেলে / Poem 9 – Dekhinu Sedin Rele (That Day on the Train)

সমাজের ‘নিচ তলা’ থেকে উপরটাকে যারা ধরে রাখে, তাদের নিয়ে অনেকেই বাংলায় সাহিত্যরচনা করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম সুকান্তের কিছু লেখা তো এই ব্লগে আগেই তুলেছি। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে চিরপ্রতিবাদী কবি নজরুল ইসলামের লেখা একটি কবিতা – ‘দেখিনু সেদিন রেলে’।

Sympathy for the oppressed proletariat is a common theme in the Bangla literary tradition. Previously, I had posted works by Sukanta Bhattacharya, who was one of the foremost Bangalee poets to have written in support of the working class. This time, in continuation, a poem about a day labourer in a railway station – written by none other than the prolific Kazi Nazrul Islam, whose revolutionary tendencies and passion for social justice earned him the title of “Rebel Poet” of Bengal.

দেখিনু সেদিন রেলে

দেখিনু সেদিন রেলে,
কুলি ব’লে এক বাবু সা’ব তারে ঠেলে দিলে নীচে ফেলে!
চোখ ফেটে এল জল,
এমনি ক’রে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?
যে দধীচিদের হাড় দিয়ে ঐ বাষ্প-শকট চলে,
বাবু সা’ব এসে চড়িল তাহাতে, কুলিরা পড়িল তলে।
বেতন দিয়াছ?-চুপ রও যত মিথ্যাবাদীর দল!
কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোর পেলি বল্‌?
রাজপথে তব চলিছে মোটর, সাগরে জাহাজ চলে,
রেলপথে চলে বাষ্প-শকট, দেশ ছেয়ে গেল কলে,
বল ত এসব কাহাদের দান! তোমার অট্টালিকা
কার খুনে রাঙা?-ঠুলি খুলে দেখ, প্রতি হঁটে আছে লিখা।
তুমি জান না ক’, কিন- পথের প্রতি ধূলিকণা জানে,
ঐ পথ, ঐ জাহাজ, শকট, অট্টালিকার মানে!

আসিতেছে শুভদিন,
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা শুধিতে হইবে ঋণ!
হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,
পাহাড়-কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাড়,
তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,
তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;
তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,
তাদেরি ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নব উত্থান!
তুমি শুয়ে র’বে তেতালার পরে আমরা রহিব নীচে,
অথচ তোমারে দেবতা বলিব, সে ভরসা আজ মিছে!
সিক্ত যাদের সারা দেহ-মন মাটির মমতা-রসে
এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে!
তারি পদরজ অঞ্জলি করি’ মাথায় লইব তুলি’,
সকলের সাথে পথে চলি’ যার পায়ে লাগিয়াছে ধূলি!
আজ নিখিলের বেদনা -আর্ত পীড়িতের মাখি’ খুন,
লালে লাল হ’য়ে উদিছে নবীন প্রভাতের নবারুণ!
আজ হৃদয়ের জমা-ধরা যত কবাট ভাঙিয়া দাও,
রং-করা ঐ চামড়ার যত আবরণ খুলে নাও!
আকাশের আজ যত বায়ু আছে হইয়া জমাট নীল,
মাতামাতি ক’রে ঢুকুক্‌ এ বুকে, খুলে দাও যত খিল!
সকল আকাশ ভাঙিয়া পড়-ক আমাদের এই ঘরে,
মোদের মাথায় চন্দ্র সূর্য তারারা পড়-ক ঝ’রে।
সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি’
এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশী।
একজনে দিলে ব্যথা-
সমান হইয়া বাজে সে বেদনা সকলের বুকে হেথা।
একের অসম্মান
নিখিল মানব-জাতির লজ্জা-সকলের অপমান!
মহা-মানবের মহা-বেদনার আজি মহা-উত্থান,
উর্ধ্বে হাসিছে ভগবান, নীচে কাঁপিতেছে শয়তান!

– কাজী নজরুল ইসলাম

কবিতা ৪ – হে মহাজীবন / Poem 4 – Hey Mahajiban (O Great Life)

Sukanta Bhattacharya-He Mahajiban

সুকান্ত ভট্টাচার্য – বাংলা সাহিত্যের ক্ষণজন্মা, অথচ অসাধারণ প্রতিভাবান এক কবি। মাত্র ২১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা এই কবি কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন, আর সেকারণেই তার অনেক কবিতায় দারিদ্রে নিপীড়িতদের যন্ত্রনার ছবি তুলে ধরেছিলেন তিনি। ‘হে মহাজীবন’ তেমনই একটি লেখা, যা দারিদ্র আর সাহিত্যকে এক সুতোয় বেঁধে তুলে নিয়েছে এক অবিস্মরণীয় কাব্যিক উচ্চতায়:

হে মহাজীবন

হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ-লালিত্য-ঝঙ্কার মুছে যাক
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো!

প্রয়োজন নেই, কবিতার স্নিগ্ধতা-
কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী-গদ্যময়ঃ
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্‌সানো রুটি।।

– সুকান্ত ভট্টাচার্য (ছাড়পত্র, ১৯৪৭)

Sukanta Bhattacharya (1926-1947) was a wonderfully talented poet from West Bengal, whose untimely death at a young age of 21 perhaps deprived our literature of many significant works. Yet, the few pieces he wrote during his short life were sufficient to carve a permanent place for him in the Bangla literary pantheon. A youth inspired by communist ideas, Sukanta depicted the dour life of the poor in his poems. Hey Mahajiban (O Great Life) is perhaps the most famous of those – one that ties poverty and poetry with a harshness that betrays his own perceived nature of the genre:

O Great Life
(A slightly modified version of a translation by Osman Gani)

O Great Life! No more of this Poetry,
Now bring the hard, harsh Prose,
Let the poetic-tender-chime dissolve,
Strike the tough hammer of Prose today!

(We) need not of the softness of Poetry–
Poetry, today I give you a break,
For in the realm of Hunger, the world is prosaic:
The Full Moon appears to be a scorched bread.

– Sukanta Bhattacharya (Chharpatra, 1947)