কবিতা ৬৮ – আছে দুঃখ আছে মৃত্যু / Poem 68 – Achhe Dukkho Achhe Mrityu (Sadness and Joy, Life and Death)

rabindranath-thakur-achhe-dukkho-achhe-mrityu-1

আজ অতীত হতে চলা বছরটিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে মনের উপলব্ধিতে আসা একটি কবিতা। আনন্দ ও বেদনা, মিলন ও বিরহ, আগমন ও বিদায়, আর পুনরাগমন ও পুনর্মিলন… প্রতিটি বছর তো আমাদের জীবন-সারাংশেরই পুনরাবৃত্তি, তাই না? নতুন বছরের দ্বারগোঁড়ায় দাঁড়িয়ে তাই সেটির উজ্জ্বলতর মুহূর্তগুলোর প্রত্যাশায়ই নাহয় আরেকবার শুরু করি?

গ্রেগরিয়ান নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে।

In review of the year that is soon to be past, a poem by Rabindranath Thakur. Achhe Dukkho, Achhe Mrityu (Sadness and Joy, Life and Death) is a poem that reminds us that life is only complete when it knows laughter as well as it does tears, unions as well as it does bereavement, and triumphs as much as failures. Perhaps each of the pair succeeds the other like the ebb of the tide follows its flow, or perhaps they are forever there in equal measure… of such things, what would I know? But when the mind finds itself about to retrace the same path that it has over the past year, there is peace and wonderment to be found in that knowledge: Perhaps each year is a recurring act of life in its fullest, and if so, then a reminder – that in all its hues, it may hold just enough blue for one to love and get lost within.

Happy new year, everyone.

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥
তবু প্রাণ নিত্যধারা,      হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে ॥
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,   নাহি নাহি দৈন্যলেশ–
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা  হতে সংগ্রহীত)

 

গান ৬২ – আনন্দধারা বহিছে ভুবনে / Song 62 – Anondodhara Bohichhe Bhubone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe)

rabindranath-thakur-anandodhara-bohichhe-bhubone

পূজোর মৌসুম আজ, তাই এই সাইটে সচরাচর যা তুলি, আজ তার চাইতে খানিকটা আলাদা একটি কবিতা – নিজেদের ক্ষুদ্রচিন্তা ও স্বার্থপরতাকে উপেক্ষা করে এই মহাসৃষ্টির অপার সৌন্দর্য্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার অনুপ্রেরণাস্বরূপ – রবিঠাকুরের আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। গান শুনতে যারা ভালবাসেন, তাদের জন্য অদিতি মহসীনের গলায় গাওয়া গানটির একটি মধুর সংস্করণ নিচে সংযুক্ত করে দিলাম।

শারদীয় শুভেচ্ছা সবাইকে।

For many Bangalees, it is that joyous time to which they have been counting down for months, and in keeping with the festivities, a spiritual prompt to shed the self-centredness that fills our lives with trivial sorrows and sip joyously instead from the cosmic cascade that flows all around us. In more implicit ways than I can fathom (I certainly overlook more than I grasp), Rabi Thakur’s Anondodhara Bohichhe Bhubone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe) is a masterful distillation of a beautiful and profound understanding of this universe, and one that invokes hope and awe within us in equal measure. I do not know of poems that add dimension to celebration as Anondodhara Bohichhe Bhubone does, but knowing this one poem leaves me immensely glad. On this onset of Puja festivities, I can only share that feeling with you, and I will hope you feel the same way when you read the lines.

P.s.: The translation below is an adaptation of one written by Rumela Sengupta, and therefore reflects my literary inclinations (or lack of taste). You can find the unadulterated version here. For those of you who prefer listening, a beautiful rendition of the song by Aditi Mohsin is linked below.

Autumnal greetings, everyone.

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে

আনন্দধারা বহিছে ভুবনে,
দিনরজনী কত অমৃতরস উথলি যায় অনন্ত গগনে ॥
পান করে রবি শশী অঞ্জলি ভরিয়া–
সদা দীপ্ত রহে অক্ষয় জ্যোতি–
নিত্য পূর্ণ ধরা জীবনে কিরণে ॥

বসিয়া আছ কেন আপন-মনে,
স্বার্থনিমগন কী কারণে?
চারি দিকে দেখো চাহি হৃদয় প্রসারি,
ক্ষুদ্র দুঃখ সব তুচ্ছ মানি
প্রেম ভরিয়া লহো শূন্য জীবনে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহীত)

Anondodhara Bohichhe Bhubhone (A Cascade of Joy Flows Through the Universe)
(Translation inspired by a version written by Rumela Sengupta in the Gitabitan website)

A cascade of joy flows through the universe
night and day – an ambrosia spilling from the heavens above.
The sun and the moon drink up the sweet nectar
in handfuls, ever luminous in their inextinguishable glow
which falls upon the earth – brimming with life and light.

Why do you sit there, lost in thought,
What keeps you immersed in your selfishness?
Let your heart spread its wings, and look around.
Value little, this trifling pain of yours
And let love permeate the void in your life.

– Rabindranath Thakur (Collected from Puja)

কবিতা ৬১ – বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা / Poem 61 – Bipade More Rakkha Karo E Nohe Mor Prarthona (The Grasp of Your Hand)

rabindranath-thakur-bipade-more-rakkha-karo-1

আজ ঈশ্বরের প্রতি একটি প্রার্থনা – জীবনের দুঃখ হতে ত্রাণ কিংবা ভারমুক্তি চেয়ে নয়, বরং তা সইবার শক্তি ও সাহস কামনা করে। ঈশ্বরের প্রতি কতটুকু ভালবাসা আর বিশ্বাস থাকলে একজন মানুষ শুধু তাঁর কাছে শুধু দুঃখকে সইবার শক্তি ও নিঃসংশয়তা প্রার্থনা করে জীবনের মুখোমুখি হয়, তা আমার অনুধাবনে আসতে হয়তো অনেক দেরী, তবে এই কবিতাটুকু পড়লে খানিকটা কল্পনা করা যায় – বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা – রবিঠাকুরের কলমে।

(পুনশ্চ – নিম্নোক্ত বাংলা কবিতাটির দুটো অনুবাদ ছাড়াও রবিঠাকুরের নিজের লেখা একটি ইংরেজী কবিতা ও তার ইতালীয় অনুবাদ এই পোস্টে তুলে দিচ্ছি। গিভ মি দ্য সুপ্রিম কারেজ অফ লাভ কবিতাটির আদি কোন বাংলা সংস্করণ আছে কিনা তা আমি অনেক খোঁজ করেও পাইনি, তবে ভাবার্থের দিক দিয়ে বিপদে মোরে রক্ষা করো কবিতাটিই সেটির সবচেয়ে কাছে বলে মনে হয়, তাই তুলে দেওয়া। পাঠকদের মধ্যে যদি কেউ কবিতাটির কোন আদি বাংলা সংস্করণের কথা জেনে থাকেন, তবে আমাকে জানানোর অনুরোধ রইল)

This time, a prayer for every struggling heart in the form of a poem. Bipade More Rakkha Karo E Nohe Mor Prarthona (The Grasp of Your Hand) is one of Rabindranath Thakur’s most famous poems, and deservedly so, for it represents human dignity and an unquestionable faith in God at their most beautiful and most earnest. I cannot ever imagine rising to that state. After all, it is not for wavering hearts to bear the struggles of life with only faith to hold on to,  and for the ones which can, it is only the worthiests’ privilege to ask God for strength to face life’s trials instead of seeking relief. If you aspire, however, Thakur’s poem is a beautiful demystification of that mood.

(P.s. – Besides including two translations of the Bangla original (one by the poet himself), I have also added another English poem by Thakur, Give Me the Supreme Courage of Love (and an Italian translation – Dammi Il Supremo Coraggio Dell’amore). The reason for this inclusion is that thematically, the work seems to be a derivative of Bipade More Rakkha Karo E Nohe Mor Prarthona – I at least have not found a directly corresponding Bangla original. If you happen to be aware of one, do let me know.)

বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা

বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা–
বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,
দুঃখে যেন করিতে পারি জয়॥
সহায় মোর না যদি জুটে নিজের বল না যেন টুটে,
সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি, লভিলে শুধু বঞ্চনা
নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।
আমারে তুমি করিবে ত্রাণ এ নহে মোর প্রার্থনা–
তরিতে পারি শকতি যেন রয়।
আমার ভার লাঘব করি নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,
বহিতে পারি এমনি যেন হয়।
নম্রশিরে সুখের দিনে তোমারি মুখ লইব চিনে–
দুখের রাতে নিখিল ধরা যেদিন করে বঞ্চনা
তোমারে যেন না করি সংশয়।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা  হতে সংগ্রহীত)

Bipade More Rakkha Karo E Nohe Mor Prarthona (The Grasp of Your Hand)
(Version 1 – Translated by the poet himself)

Let me not pray to be sheltered from dangers but to be fearless in facing them.
Let me not beg for the stilling of my pain but for the heart to conquer it.
Let me not look for allies in life’s battlefield but to my own strength.
Let me not crave in anxious fear to be saved but hope for the patience to win my freedom.
Grant me that I may not be a coward, feeling your mercy in my success alone; but let me find the grasp of your hand in my failure.

(Version 2 – By Ruma Chakravarti,  who maintains a beautiful collection of her own musings and translations of Thakur’s writings on the Web)

I do not pray so that you may save me from danger –
Instead, I entreat you to make me grow unafraid.
Perhaps you might consider not consoling me when I am filled with sorrow,
Let me instead learn to conquer it when faced with pain.
When I have no one to lean on, let my own strength not desert me
When life only takes, giving back false hope in return
May I be strong enough to resist it.
My prayer is not for you to be my savior –
I would rather you gave me the will to overcome.
I would rather you did not give solace and shoulder my burden,
But give me the might to do the same for myself.
Let me humbly know you for my own in times of happiness –
So that on the darkest of nights when the world turns away
I may not doubt your benevolent presence.

– Rabindranath Thakur (Collected from Fruit-Gathering)

Give Me the Supreme Courage of Love
(Version 3 (?) – An English verse which is somewhat related to the Bangla poem above – if you find a better match in Bangla, please let me know in a comment on this post)

Give me the supreme courage of love, this is my prayer – the courage to speak, to do, to suffer at thy will, to leave all things or be left alone. Strengthen me on errands of danger, honor me with pain, and help me climb to that difficult mood which sacrifices daily to thee.

Give me the supreme confidence of love, this is my prayer – the confidence that belongs to life in death, to victory in defeat, to the power hidden in frailest beauty, to that dignity in pain which accepts hurt but disdains to return it.

– Rabindranath Thakur (Collected from The Fugitive III)

Dammi Il Supremo Coraggio Dell’amore
(Version 3.1 (?) – An Italian translation of version 3 by Martha Babbitt, a wonderful human and a friend)

Dammi il supremo coraggio dell’amore,
questa è la mia preghiera,
coraggio di parlare, di agire,
di soffrire se è Tuo volere,
di abbandonare ogni cosa,
o di essere lasciato solo.
Dammi la forza in missioni pericolosi,
Onorarmi con la sofferenza,
E aiutami a raggiungere quello stato elusivo
Che ogni giorno fa sacrifici a Te.

Dammi la suprema fiducia nell’amore,
questa è la mia preghiera,
la fiducia nella vita nella morte,
nella vittoria nella sconfitta,
nella potenza nascosta nella più fragile bellezza,
nella dignità del dolore che accoglie l’offesa,
ma si rifiuta di rispondere con l’offesa.

– Rabindranath Thakur (The Fugitive III)

গান ৪৬ – আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে / Song 46 – Aaj Jyotsna-raate Sabai Gechhe Bone (On This Moon-soaked Night)

Rabindranath Thakur-Aaj Jyotsnaraate (2)

বেশ কিছুদিন ধরেই রবিঠাকুরের লেখাগুলোর মাঝে ডুবে আছি, তাই এই সাইটটির সাম্প্রতিক সংযোজনগুলোর ধারাবাহিকতায় আজ কবিগুরুর আরেকটি কবিতা। আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে  গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন বোলপুরে থাকাকালে কোন এক জ্যোৎস্নালোকিত রাতে, সাহিত্যিক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়

“কোন এক উৎসব উপলক্ষে আমরা বহু লোক বোলপুরে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভব ‘রাজা’ নাটক অভিনয় উপলক্ষে। বসন্তকাল, জ্যোৎস্না রাত্রি। যত স্ত্রীলোক ও পুরুষ এসেছিলেন তাঁদের সকলেই প্রায় পারুলডাঙ্গা নামক এক রম্য বনে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কেবল আমি যাইনি রাত জাগবার ভয়ে।… গভীর রাত্রি, হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, মনে হল যেন ‘শান্তিনিকেতনের’ নীচের তলার সামনের মাঠ থেকে কার মৃদু মধুর গানের স্বর ভেসে আসছে। আমি উঠে ছাদে আলসের ধারে গিয়ে দেখলাম, কবিগুরু জ্যোৎস্নাপ্লাবিত খোলা জায়গায় পায়চারি করছেন আর গুন্‌গুন্‌ করে গান গাইছেন। আমি খালি পায়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলাম, কিন্তু তিনি আমাকে লক্ষ করলেন না।, আপন মনে যেমন গান গেয়ে গেয়ে পায়চারি করছিলেন তেমনি পায়চারি করতে করতে গান গাইতে লাগলেন। গান গাইছিলেন মৃদুস্বরে।  তিনি গাইছিলেন ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে…”।

পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে কোন এক জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রিতে তাঁকে মনে করে রবিঠাকুর এই গানটি লিখেছিলেন, এমন একটি ইতিকথা বাঙ্গালীদের মাঝে প্রচলিত। কিন্তু গানটি সত্যিই ঐ প্রেক্ষাপটে লেখা কিনা আমি জানিনা। কিন্তু এটুকু মনে হয় যে প্রিয় কিংবা আরাধ্য কোনও জনের জন্য গভীর ভালবাসা আর বেদনাভরা অপেক্ষা এমন আবেগভরে বোধহয় আর কোনও লেখায় বর্ণিত হয়নি। পাঠকদের মন আর্দ্র করে দিতে তাই গানের পংক্তিগুলো আজ এখানে তুলে দিলাম।

পুনশ্চ – গানটির উপরোক্ত ইতিহাস, এবং এডওয়ার্ড থমসনের লেখা সেটির নিম্নোক্ত ইংরেজি অনুবাদ আমি পেয়েছি গীতবিতান.নেট ওয়েবসাইটটিতে। রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপারে যারা বিস্তারিত জানতে চান, তাদের পৃষ্ঠাটিতে ঘুরে আসার আমন্ত্রণ ও অনুরোধ রইল। তাছাড়া যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে ইউটিউবে পাওয়া গানটির একটি ভিডিও নিচে সংযুক্ত করে দিলাম।

In continuation of my recent immersion in Rabindranath Thakur’s works, another of his songs. From anecdotal evidence, we know that Aaj Jyotsnaraate Sabai Gechhe Bone (On This Moon-soaked Night) was written by Thakur on a moonlit night in Bolpur, but whether it was written from grief at the loss of his younger son Shamindranath, we will perhaps never know. One can be sure, however, that that few works, if any, express with such tenderness the yearning and pain that accompanies Man’s separation from and wait to find a cherished someone (or perhaps God Himself, depending on how you read the poem) he has lost. For the softer corner of your heart, therefore, this song.

P.s. For non-native speakers, I have included two English translations of the song below. The anecdotes about the poem and the translation by Edward Thomson were found in http://www.gitabitan.net, which has a beautiful collection of Thakur’s songs and associated materials. Do take a peek. Also, if you prefer the words sung, you will find a YouTube video of a rendition at the end of this post.

আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে

আজ    জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥
যাব না গো যাব না যে,   রইনু পড়ে ঘরের মাঝে–
এই নিরালায় রব আপন কোণে।
যাব না এই মাতাল সমীরণে ॥

আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে
ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।
আমারে যে জাগতে হবে,   কী জানি সে আসবে কবে
যদি আমায় পড়ে তাহার মনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Aj Jyotsnarate Shabai Geche Bone (On This Moon-soaked Night)

Translation – Version 1- Edward Thomson
(Rabindranath Tagore: The Augustan Books of Modern Poetry, Ernest Benn Ltd. London, 1925)

They have all gone to the woods in this moonlit night,
In the south wind drunken with Spring’s delight.
But I will not go, will not go;
I will stay in the house, and so
Wait in my lonely corner-this night
I will not go in this south wind drunk with delight.

Rather, this room with care
I must scour and cleanse and prepare;
For … if He remembers me, then
He will come, though I know not when;
They must wake me swiftly. I will not fare
Out where the drunk wind reels through the air.

Translation – Version 2

On this moon-soaked night,
they have all gone to frolic in the forest.
The drunk spring breeze beckons, “Come!”
but heed it I will not.
In this desolate corner of my house, I will remain.
No I will not go into this intoxicating night.

I will stay behind
and clean my room with care.
Who knows when he may come?
Remain I must, perchance he remembers me,
and the drunk winds bring him here,
in this moonlit night.
I must stay awake.

– Rabindranath Thakur

গান ৪৫ – যদি প্রেম দিলে না প্রাণে / Song 45 – Jodi Prem Dile Na Praane (If Love Be Denied Me)

Rabindranath Thakur-Jodi Prem Dile Na Praane (1)

ঈশ্বরের কাছে আর্তিমাখা কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর তাঁর নীরবতার মাঝেই আমাদের খুঁজে নিতে হয়। আজ মন খারাপের বৃষ্টিভেজা একটি দিন, তাই।

On questions which God only answers through His silence, a few beautifully written lines by Rabindranath Thakur – for the days when it drizzles in your mind.

যদি প্রেম দিলে না প্রাণে

যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে?।
কেন তারার মালা গাঁথা,
কেন ফুলের শয়ন পাতা,
কেন দখিন-হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে?।
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন আকাশ তবে এমন চাওয়া চায় এ মুখের পানে?
তবে ক্ষণে ক্ষণে কেন
আমার হৃদয় পাগল-হেন
তরী সেই সাগরে ভাসায় যাহার কূল সে নাহি জানে?।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Jodi Prem Dile Na Praane (If love be denied me)

If love be denied me
then why does the morning break its heart in songs,
and why are these whispers
that the south wind scatters among the new- born leaves?
If love be denied me then why does the midnight
bear in yearning silence the pain of the stars?
And why does this foolish heart
recklessly launch its hope on the sea whose end it does not know?

– Rabindranath Thakur
(Collected from Crossing/Puja. Translated by the poet himself)

গান ৩৭ – আমার হিয়ার মাঝে / Song 37 – Amar Hiyar Majhe (You Hid in My Heart)

আমাদের সমস্ত সুখ-দুঃখ আর ভালবাসাসহ সকল অনুভূতির অন্তরালে যেই ঈশ্বর আমাদের চীরসঙ্গী ও আশ্রয় হয়ে থাকেন, মানবিক প্রবৃত্তির বশে তাঁকে কত সহজেই না আমরা অগ্রাহ্য করি, আবার কত সহজেই যে জীবনের নিত্য জাগতিকতার মধ্যে তাঁকে খুজে পাই !রবিঠাকুরের এই কবিতাটি সম্বন্ধে বেশি কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই, তবে এটুকু বলতে পারি যে ঈশ্বরের কাছে ভক্তি আর ভালবাসায় আর্দ্র কোনো স্বীকারোক্তি যদি মানুষের করার থেকে থাকে, তবে সেটি এই।

(যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে  নিচে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার স্বর আর কবিগুরুর সুরে গাওয়া পংক্তিগুলো সংযুক্ত করে দিলাম।)

In the quagmire of emotions in which we are all immersed so deep, how carelessly we forget the presence of the God who remains our companion and refuge throughout our journeys, and yet, how easily we find Him in the sample and mundane aspects of our lives! There is little I could say that would do this poem justice, but to me, if there ever is a confession to God that is soaked in love and devotion, this is it. For those who prefer the words sung, I have attached a YouTube link below.

আমার হিয়ার মাঝে

আমার    হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে
দেখতে আমি পাই নি।
বাহিরপানে চোখ মেলেছি
হৃদয়পানেই চাই নি।
আমার সকল ভালোবাসায়,
সকল আঘাত, সকল আশায়,
তুমি ছিলে আমার কাছে,
তোমার কাছে যাই নি।

তুমি মোর আনন্দ হয়ে
ছিলে আমার খেলায়।
আনন্দে তাই ভুলে ছিলেম,
কেটেছে দিন হেলায়।
গোপন রহি গভীর প্রাণে
আমার দুঃখ-সুখের গানে
সুর দিয়েছ তুমি,আমি
তোমার গান তো গাই নি।

ওদের কথায় ধাঁদা লাগে
তোমার কথা আমি বুঝি।
তোমার আকাশ তোমার বাতাস
এই তো সবি সোজাসুজি।
হৃদয়-কুসুম আপনি ফোটে,
জীবন আমার ভরে ওঠে,
দুয়ার খুলে চেয়ে দেখি
হাতের কাছে সকল পুঁজি।

সকাল-সাঁঝে সুর যে বাজে
ভুবনজোড়া তোমার নাটে,
আলের জোয়ার বেয়ে তোমার
তরী আসে আমার ঘাটে।
শুনব কী আর বুঝব কী বা,
এই তো দেখি রাত্রিদিবা
ঘরেই তোমার আনাগোনা,
পথে কী আর তোমায় খুঁজি?

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Amar Hiyar Majhe (You Hid In My Heart)

Suddenly the window of my heart flew open this morning, the window that looks out on your heart.
I wondered to see that the name by which you know me is written in April leaves and flowers, and I sat silent.
The curtain was blown away for a moment between my songs and yours.
I found that your morning light was full of my own mute songs unsung;
I thought that I would learn them at your feet-and I sat silent.

– Rabindranath Thakur (Collected from Fruit-Gathering. Translated by the poet himself)

An alternative interpretation of the last two stanzas of the song

Some have thought deeply and explored the meaning of thy truth
and they are great;
I have listened to catch the music of thy play
and I am glad.

– Rabindranath Thakur (Collected from Fireflies)

গল্প ৯২ – ফেলুদা – জয় বাবা ফেলুনাথ / Story 92 – Feluda – Jay Baba Felunath

Satyajit Ray-Feluda-Jay Baba Felunath 1পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray-Feluda-Jay Baba Felunath

ফেলুদার গল্প – জয় বাবা ফেলুনাথ – সত্যজিৎ রায়

মৌসুমটা যখন পূজোর, তাই এবারের গল্পটাও নাহয় সময়টার মতই জমজমাট হোক। জয় বাবা ফেলুনাথ ও কিন্তু পুজোর সময়েরই গল্প, তবে এতে ফেলুদার গোয়েন্দাগিরী বাংলাতে নয়, ঘটে কাশীর সরু গলিগুলোর মধ্যে। দশাশ্বমেধ ঘাট আর বিশ্বনাথের শহর কাশীতে ফেলুদাদের যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল পুজোর ছুটি কাটানো, কিংবা লালমোহনবাবুর ভাষায় “কাশী, (ফেলুদার তদন্তের) কেস আর (কাশীতে ঘুরে প্লট জোগাড় করে তা নিয়ে লিখে লালমোহন বাবুর) ক্যাশ” জোটানো। শেষ পর্যন্ত যা হয়, তা তোপ্‌সের বর্ণনায় –

বেনারস গিয়ে লালমোহনবাবু গল্পের প্লট পেয়েছিলেন ঠিকই; তবে ফিরে আসার দুমাস পরে বড়দিনে তার যে রহস্য উপন্যাসটা বেরোল, সেটার সাথে টিনটিনের একটা গল্পের আশ্চর্য মিল।

ফেলুদার কিন্তু গিয়ে সত্যিই লাভ হয়েছিল। তা না হলে অবিশ্যি এই বইটাই লেখা হত না। ফেলুদার জীবনে সবচেয়ে ধুরন্ধর ও সাংঘাতিক প্রতিদ্বন্দীর সঙ্গে তাকে এই বেনারসেই লড়তে হয়েছিল। ও পরে বলেছিল – ‘এইরকম একজন লোকের জন্যই অ্যাদ্দিন অপেক্ষা করছিলাম রে তোপ্‌সে। এ সব লোকের সঙ্গে লড়ে জিততে পারলে সেটা বেশ একটা টনিকের কাজ দেয়।’

গোয়েন্দা সাহিত্যে নায়কের কৃতিত্বের সিংহভাগই যে খলনায়কের কারণেই, জয় বাবা ফেলুনাথ  এর মগনালাল মেঘরাজ তার অখন্ডনীয় প্রমাণ। গল্পটা কিভাবে শেষ হয়, তা তো জানাই। কিন্তু প্রথম আর শেষের মাঝখানে ঠাসা যেই টানটান উত্তেজনা, তাতো আর সেটি না পড়লে বোঝার নয়। তাই এই পূজোয় পাঠকদের জন্যে আজ ফেলুদার আর মগনলালের রোমহর্ষক সংঘর্ষের কাহিনী – জয় বাবা ফেলুনাথ । শারদীয় শুভেচ্ছা রইল।

Feluda’s Stories – Jay Baba Felunath – Satyajit Ray

For about half of us Bangalees, it is that wonderful time of the year again. And the season demands that everything else measures up to it, does it not? So this time, as the season’s greetings from yours truly, an upload that is perhaps the best of the Feluda series. Imagine yourself in a few days from now, celebrating this year’s Durga Puja, but not in Kolkata or some other place in Bangla. Instead, you are in Kashi, the old and colorful city of temples and narrow lanes, of ghats on the Ganga, and of gangsters and godfathers. Now, imagine you are a sleuth, and that a local Bangalee in distress asks for your help on a case. You accept, only to find yourself against the godfather of the city, Maganlal Meghraj, whose goons lurk in every corner of Benares. What would you do? What would Feluda do against the man who is every bit of Moriarty as he is to Holmes, and more? The answer is in Jay Baba Felunath, attached here for your reading pleasure.

Satyajit Ray-Feluda-Jay Baba Felunath 2

কবিতা ৩১ – এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে / Poem 31 – Eto Alo Jwaliyechho Ei Gagane (When You Hold Your Lamp in the Sky)

 Rabindranath Thakur-Eto Alo Jaliyechho ei Gagane (1)(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে এখানে / Original version of the picture taken from here.)

অনেক দিন ধরেই রবিঠাকুরের এই কবিতাটি খুঁজছিলাম, হয়তো মন কবিতাটির পংক্তিগুলো নিভৃতে গেয়ে চলে তাই। লেখাটি ভাল লাগে খুব, তাই সেই ভাললাগাটুকু পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিতে ছবিসহ পংক্তিগুলো তুলে দিলাম – রবিঠাকুরের লেখা এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে, যা ঈশ্বরের প্রতি মানুষের ভালবাসা আর বিস্ময়কে নিয়ে।

This time, a most beautiful set of lines that I had read long ago – Eto Alo Jwaliyecho Ei Gagane (When You Hold Your Lamp in the Sky) – a poem by Rabindranath Thakur expressing our wondrous amazement at and love for God – presented here for your contemplation.

এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে

এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে
কী উৎসবের লগনে॥
সব আলোটি কেমন ক’রে    ফেল আমার মুখের ‘পরে,
তুমি আপনি থাকো আলোর পিছনে ॥

প্রেমটি যেদিন জ্বালি হৃদয়-গগনে
কী উৎসবের লগনে
সব আলো তার কেমন ক’রে   পড়ে তোমার মুখের ‘পরে,
আমি আপনি পড়ি আলোর পিছনে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহীত)

Eto Alo Jwaliyecho Ei Gagane (When You Light your Lamp in the Sky)
(Translated by the poet himself)

When you hold your lamp in the sky
it throws its light on my face
and its shadow falls over you.

When I hold the lamp of love in my heart
its light falls on you
and I am left standing behind in the shadow.

– Rabindranath Thakur (Collected from Puja)

গল্প ৮৮ – ইছামতি / Story 88 – Ichamati

Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Ichamati 2

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Ichamati

ইছামতি – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কিছুদিন আগে এই সাইটে বিভূতিভূষণের গল্পগুলোতে “সময়ের শান্ত স্রোতে (চরিত্রদের জীবন) ধীরে ধীরে একটি নিরুদ্বেগ অবধারিতের” দিকে প্রবাহিত হওয়া নিয়ে লিখেছিলাম। সে সময় আলোচ্য লেখাটি ছিল আরণ্যক ইছামতি  উপন্যাসটিও সেক্ষেত্রে অনেকটা আরণ্যকের মতই, তবে এই গল্পটির পটভূমি বিহার নয়, বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে বয়ে গেছে যে ইছামতি নদী, তারই ধারের পাঁচপোতা নামের একটি গ্রাম। অবিভক্ত ভারত তখনো ব্রিটিশদের দখলে, আর মোল্লাহাটির নীলকুঠির অবস্থাও তখন রমরমা। কুঠির দেওয়ান কুলীন ব্রাহ্মন রাজারাম রায়, যার প্রতাপে সারা গ্রাম তটস্থ থাকে। গল্পের শুরুতে রাজারামের তিন বোন তিলু, বিলু আর নিলুর বিয়ে হয় গ্রামে ঘুরতে আসা ভবানী বাড়ুয্যে নামের আরেকজন কুলীনের সাথে। আর যদিও বিভূতিভূষণের এই উপন্যাসটি বিশেষ কোন চরিত্রকে নিয়ে লেখা নয়, গল্পের পরবর্তীটুকুতে মূলত ভবানী ও তার স্ত্রীদের চোখ দিয়েই গ্রামটির সাথে ধীরে ধীরে আমাদের পরিচয় ঘটে।

ইছামতি  উপন্যাসটি যে সময়ের উপর ভিত্তি করে লেখা, তখন নদীপাড়ের জনপদগুলি সেকেলে বাঙ্গালী সমাজের মতই গোঁড়ামী আর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল। জাতপ্রথা আর নারীর অবদমন থেকে শুরু করে ভারতীয় সমাজের বৃটিশ-আরাধনা আর দুর্বলদের উপর নিপীড়ন – এর সবই উপন্যাসটিতে আমরা দেখি, কিন্তু তা সমালোচকের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং যেন পাঁচপোতার একটি নিতান্তই মানবিক দিনলিপির মাধ্যমে। গ্রামের বুড়ো ব্রাহ্মণদের পরনিন্দা-পরচর্চা, নীলকুঠির কর্মচারীদের দাদাগিরী, আর গ্রাম্যবধূদের গল্প – এসমস্ত রোজনামচার মধ্যে দিয়েই গল্পটি ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। অথচ তারই মধ্যে তিলুরা ঘোমটা ছাড়া রাস্তায় চলতে শেখে, গ্রামের ছেলেরা এক এক করে কলকাতায় পাড়ি জমায়, আর সাহেবদের সেই নীলকুঠি কিনে নেয় গ্রামেরই এক লালমোহন পাল, যে কম বয়সে কুঠির সাহেব মালিককে দেখে চাবুকের বাড়ি খাওয়ার ভয়ে রাস্তার উপর নিজের সওদাপাতি ফেলে পালিয়েছিল। শ্বাশত আর পরিবর্তনের মাঝে ভারসাম্য রেখে চলা সে অদৃশ্য ধারার গভীর সৌন্দর্যকে বিভূতিভূষণ যেন ইছামতির মাঝেই খুঁজে পান –

কত তরুণী সুন্দরী বধূর পায়ের চিহ্ন পড়ে নদীর দু’ধারে, ঘাটের পথে, আবার কত প্রৌঢ়া বৃদ্ধার পায়ের দাগ মিলিয়ে যায়… গ্রামে গ্রামে মঙ্গলশঙ্খের আনন্দধ্বনি বেজে ওঠে বিয়েতে, অন্নপ্রাশনে, উপনয়নে, দূর্গাপূজোয়, লক্ষীপূজোয়… সে সব বধূদের পায়ের আলতা ধুয়ে যায় কালে কালে, ধূপের ধোঁয়া ক্ষীণ হয়ে আসে… মৃত্যুকে কে চিনতে পারে? গরীয়সী মৃত্যু-মাতাকে? পথপ্রদর্শক মায়ামৃগের মতো জীবনের পথে পথে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে সে, অপূর্ব রহস্যভরা তার অবগুন্ঠন কখনো খোলে শিশুর কাছে, কখনো বৃদ্ধের কাছে… তেলাকুচো ফুলের দুলুনিতে অনন্ত সে সুর কানে আসে… কানে আসে বনৌষধির কটুতিক্ত সুঘ্রাণে, প্রথম হেমন্তে বা শেষ শরতে। বর্ষার দিনে এই ইছামতির কূলে কূলে ভরা ঢলঢল রূপে সেই অজানা মহাসমুদ্রের তীরহীন অসীমতার স্বপ্ন দেখতে পায় কেউ কেউ… কত যাওয়া আসার অতীত ইতিহাস মাখানো ঐ সব মাঠ, ঐ সব নির্জন মাঠের ঢিপি – কত লুপ্ত হয়ে যাওয়া মায়ের হাসি ওতে অদৃশ্য রেখায় আঁকা। আকাশের প্রথম তারাটি তার খবর রাখে হয়তো…

বিভূতিভূষণ ইছামতি লেখার পর সময়ের সাথে সাথে নদীপাড়ের গ্রামগুলি বদলে গেছে অনেক। তবে গ্রামীণ বাংলার যা কিছু চিরন্তন, তাতো আর বদলায়নি, মঙ্গলশঙ্খের আনন্দধ্বনি সময়ে সময়ে নদীপারের গ্রামগুলোতে বেজে ওঠে আজও, রূপসী বধূদের পদচিহ্ন এখনো নদীপারে খানিক্ষণের জন্যে আঁকা হয়ে মুছে যায়। সে মনে করেই বাংলার নদীপাড়ের মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর ভালবাসা নিয়ে বিভূতিভূষণের লেখা এই উপন্যাসটি আজ পাঠকদের জন্যে তুলে দিলাম।

Ichamati – Bibhutibhushan Bandyopadhyay

Following Aranyak, another of Bibhutibhushan Bandyopadhyay’s novels: Ichamati is a narrative of the life along the banks of a river of the same name.  In the early 20th Century, when the subcontinent was under British occupation and indigo plantations were strewn across the undivided Bangla, a plantation by a certain Panchpota village on the river was in its heyday. The owners of that plantation were Englishmen, but their power was wielded through Bangalees who commanded subservience across the entire region. Rajaram, the dewan (secretary) of the plantation, had married off his three sisters to a former ascetic, Bhavani Bandyopadhyay, and it is the latter’s polygynous yet happy family around which the novel develops. Like any other rural Bangalee community of the time, Panchpota was not without its share of superstition, wrongs and biases – but instead of being condemned in Ichamati, those are humanised through the characters. In the novel, the anticipating reader finds the usual village folk who do their usual work – hypocritical, elderly Brahman’s who only gossip idly and criticize others, the hired goons of the plantation who grab land, and the ‘off-the-rocker’ housewife who would say things no one would (or could). Yet, around the daily routines of these people occur silent but subversive changes – Bhavani’s wives learn to walk in public without a veil, and the boys of the village go off to Kolkata to work, one by one… even the ownership of the plantation shifts to a local man. Such changes continue to shape the Indian subcontinent even today. So in that sense, Ichamati helps us understand every Bangalee village then and now. But with its heart-softening narrative of the lives along the river bank, it also offers more than an analytical window into rural Bangla, it teaches us to love her.

গান ১৭ – মহাবিশ্বে মহাকাশে / Song 17 – Mahabishwe Mahakashe (In This Universe)

Rabindranath Thakur-Mahabishwe Mahakashe

কখনো কখনো নিজেকে যখন এই বিশাল পৃথিবীর বিপরীতে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাই, সেসব সময়ে মাঝে মাঝে রবিঠাকুরের এই কবিতাটির কথা মনে পড়ে। আমাদের অসহায়ত্বটুকু যত বড়ই হোক, তার চেয়ে অসীমতর বিশাল এক আশ্রয় যে আমাদেরকে নীরবে ধারণ করে রেখেছে, তা মনে পড়লেই মন বিস্ময় আর স্বস্তি মাখানো এক উষ্ণ মুগ্ধতায় ভরে ওঠে। কবিতাটি মনে বেজে চলছে বেশ কয়েকদিন ধরেই, তাই আজ এটি পাঠকদের জন্যে তুলে দিলাম।

For those who feel small in front of the massive challenge that is life, a comforting poem by Rabindranath, which reminds us of the infinitely bigger Presence who holds us in His arms. Mahabishwe Mahakashe (In This Universe).

মহাবিশ্বে মহাকাশে

মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে॥
তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে
নীরবে একাকী আপন মহিমানিলয়ে॥
অনন্ত এ দেশকালে, অগণ্য এ দীপ্ত লোকে,
তুমি আছ মোরে চাহি–আমি চাহি তোমা-পানে।
স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর–
এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগৃহিত)

কবিতা ১৩ – দুখের বেশে এসেছ বলে / Poem 13 – Dukher Beshe Eshecho Bole (Have You come to me as my sorrow)

ঈশ্বরের প্রতি একটি করুণ আর্তি – যা হয়ত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি জর্জরিত হৃদয়েরই প্রার্থনা। রবিঠাকুরের কলমে।

In Two verses by Rabindranath Tagore, a deep longing for God that transcends most religious boundaries – a translation from the Kabiguru himself, and a second cruder one, follows.

দুখের বেশে এসেছ বলে

দুখের বেশে এসেছ বলে তোমারে নাহি ডরিব হে।
যেখানে ব্যথা তোমারে সেথা নিবিড় ক’রে ধরিব হে ॥
আঁধারে মুখ ঢাকিলে স্বামী, তোমারে তবু চিনিব আমি–
মরণরূপে আসিলে প্রভু, চরণ ধরি মরিব হে।
যেমন করে দাও-না দেখা তোমারে নাহি ডরিব হে ॥
নয়নে আজি ঝরিছে জল, ঝরুক জল নয়নে হে।
বাজিছে বুকে বাজুক তব কঠিন বাহু-বাঁধনে হে।
তুমি যে আছ বক্ষে ধরে বেদনা তাহা জানাক মোরে–
চাব না কিছু, কব না কথা, চাহিয়া রব বদনে হে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংকলিত)

Dukher Beshe Eshecho Bole (Have You come to me as my sorrow)

Have you come to me as my sorrow? All the more I must cling to you.
Your face is veiled in the dark, all the more I must see you.
At the blow of death from your hand let my life leap up in a flame.
Tears flow from my eyes,-let them flow round your feet in worship.
And let the pain in my breast speak to me that you are, still mine.

-Translated by the poet himself.

(Version 2)

Although You have come as sorrow, O Lord,
I shall not fear, and hold You dearly where it hurts.
If you shroud Yourself in darkness, I shall know You still,
And if You appear as death, yield at Your feet.
However You come to me, O Lord, I will be unafraid.

Let tears flow from my eyes in streams,
And the soul writhe in pain from Your unyielding grasp,
For this sorrow is but a reminder
Of Your firm hands holding me onto the refuge of Your heart.
I seek nothing else, O Lord, only to gaze at Your Face.

– Rabindranath Thakur (Collected from Puja/Crossing)