কবিতা ৭৮ – তুমি কি কেবলই ছবি? / Poem 78 – Are you a mere picture?

অনেক দিন পরে আজ রবিঠাকুরের একটি কবিতা। যতদূর বুঝি, তুমি কি কেবলই ছবি  কবিতাটি পেরিয়ে আসা জীবনের মানুষ ও মূহুর্তগুলোকে স্মৃতিপটে বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে লেখা। কটি পংক্তি তুলে দেই –

“নয়নসম্মুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই – আজি তাই
শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।”

যেকোনো কবিতার অর্থ যে কি, সেটা নিতান্তই পাঠকের ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণের উপর নির্ভর করে। কিন্তু এও তো ঠিক, যে, কখনো কখনো কবিতার বস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে হয় – রবিঠাকুরের যেসমস্ত কবিতাগুলো যা আগে বুঝতে কষ্ট হত, তার কিছু কিছু এখন খানিকটা হলেও বুঝি… বয়সের সাথে সাথে মানুষ তো কিছুটা অন্তত শেখে, তাই না?

নিম্নোক্ত পংক্তিগুলো তুমি কি কেবলই ছবির একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। যারা পুরো কবিতাটি পড়তে চান, তারা সেটি পাবেন এখানে

“The day was when you walked with me, your breath warm, your limbs singing of life. My world found its speech in your voice, and touched my heart with your face. You suddenly stopped in your walk, in the shadow-side of the Forever, and I went on alone.”

A beautiful poem by Thakur of memories, which keep long-lost ones alive in the heart despite the persistence of time.

তুমি কি কেবলই ছবি

তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা।
ওই-যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভিড় আকাশের নীড়,
ওই যারা দিনরাত্রি
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী গ্রহ তারা রবি,
তুমি কি তাদের মতো সত্য নও।
হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি॥

নয়নসমুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই– আজি তাই
শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
নাহি জানি, কেহ নাহি জানে–
তব সুর বাজে মোর গানে,
কবির অন্তরে তুমি কবি–
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি॥

Tumi Ki Keboli Chhobi (Are you a mere picture)?
(Translation by the poet himself)

Are you a mere picture, and not as true as those stars, true as this dust? They throb with the pulse of things, but you are immensely aloof in your stillness, painted form.
The day was when you walked with me, your breath warm, your limbs singing of life. My world found its speech in your voice, and touched my heart with your face. You suddenly stopped in your walk, in the shadow-side of the Forever, and I went on alone.
Life, like a child, laughs, shaking its rattle of death as it runs; it beckons me on, I follow the unseen; but you stand there, where you stopped behind that dust and those stars; and you are a mere picture.

No, it cannot be. Had the lifeflood utterly stopped in you, it would stop the river in its flow, and the footfall of dawn in her cadence of colours. Had the glimmering dusk of your hair vanished in the hopeless dark, the woodland shade of summer would die with its dreams.
Can it be true that I forgot you? We haste on without heed, forgetting the flowers on the roadside hedge. Yet they breathe unaware into our forgetfulness, filling it with music. You have moved from my world, to take seat at the root of my life, and therefore is this forgetting-remembrance lost in its own depth.
You are no longer before my songs, but one with them. You came to me with the first ray of dawn. I lost you with the last gold of evening. Ever since I am always finding you through the dark. No, you are no mere picture.

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর / Rabindranath Thakur
বিচিত্র হতে সংগ্রহীত (Collected from Bichitra/Lover’s Gift)

 

Advertisements

কবিতা ৬৮ – আছে দুঃখ আছে মৃত্যু / Poem 68 – Achhe Dukkho Achhe Mrityu (Sadness and Joy, Life and Death)

rabindranath-thakur-achhe-dukkho-achhe-mrityu-1

আজ অতীত হতে চলা বছরটিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে মনের উপলব্ধিতে আসা একটি কবিতা। আনন্দ ও বেদনা, মিলন ও বিরহ, আগমন ও বিদায়, আর পুনরাগমন ও পুনর্মিলন… প্রতিটি বছর তো আমাদের জীবন-সারাংশেরই পুনরাবৃত্তি, তাই না? নতুন বছরের দ্বারগোঁড়ায় দাঁড়িয়ে তাই সেটির উজ্জ্বলতর মুহূর্তগুলোর প্রত্যাশায়ই নাহয় আরেকবার শুরু করি?

গ্রেগরিয়ান নববর্ষের শুভেচ্ছা সবাইকে।

In review of the year that is soon to be past, a poem by Rabindranath Thakur. Achhe Dukkho, Achhe Mrityu (Sadness and Joy, Life and Death) is a poem that reminds us that life is only complete when it knows laughter as well as it does tears, unions as well as it does bereavement, and triumphs as much as failures. Perhaps each of the pair succeeds the other like the ebb of the tide follows its flow, or perhaps they are forever there in equal measure… but then again, of such things, what do I know? But when the mind finds itself about to retrace the same path that it has over the past year, there is peace and wonderment to be found in that knowledge: Perhaps each year is a recurring act of life in its fullest, and if so, then a reminder – that in all its hues, it may hold just enough blue for one to love and get lost within.

Happy new year, everyone.

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু

আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥
তবু প্রাণ নিত্যধারা,      হাসে সূর্য চন্দ্র তারা,
বসন্ত নিকুঞ্জে আসে বিচিত্র রাগে ॥
তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে,
কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ,   নাহি নাহি দৈন্যলেশ–
সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থান মাগে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা  হতে সংগ্রহীত)

 

কবিতা ৬০ – স্বল্পশেষ / Poem 60 – Swalpashesh (The Little That Remains)

rabindranath-thakur-swalpashesh-2

রবিঠাকুরের প্রেমের কবিতাগুলোর অনেক বৈশিষ্ট্যই পাঠকের মনকে নাড়া দেওয়ার মত, তবে সেগুলোর একটি দিক, যা আমার খুব ভাল লাগে তা হল এই, যে কবিগুরুর ভালবাসার বর্ণনায় অহংকারের বালাই নেই বললেই চলে। প্রিয়জনের প্রতি মানুষের ভালবাসা যে কতটুকু পবিত্র, স্বার্থহীন ও ভক্তিপূর্ণ হতে পারে, তা বোধহয় রবীন্দ্রনাথের মত গভীর আবেগে খুব কম লেখকই ব্যক্ত করতে পেরেছেন। কে জানে, কবিগুরুর মত করে লিখতে গেলে হয়তো তাঁর মত করে হারাতে ও ভালবাসতেও হয় – ব্যক্তিগত জীবনে যে রবিঠাকুর ব্যাথা পেয়েছিলেন অনেক, তা তো আর আমাদের অজানা নয়।

আজকের লেখাটি আমার জানা রবিঠাকুরের সবচেয়ে প্রেমার্দ্র কবিতাগুলোর মধ্যে একটি – স্বল্পশেষ – যা সবকিছু সাঙ্গ হওয়ার পরেও যে ভালবাসাটুকু শ্বাশত হয়ে থেকে যায়, তা দিয়ে প্রিয়জনকে শেষবার সাজিয়ে দিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নেওয়া নিয়ে।

I have been wondering this for some time now: is love a selfish desire to possess a cherished someone, or is it the giving away of the self to that same person? To be honest, I do not know… Perhaps it is both of those – entwined in a manner that foments the inextricable mix of tenderness, affection, passion and jealousy that we know love can be? But of all its forms, perhaps love is truest and most sacred when it leaves the lover overshadowed and forgotten in its profundity. I am speculating, of course – of love and its depth, I would know little. But if words are ever true, then the following poem by Thakur would be a fitting testament to the belief – The Little That Remains is a weary man’s song for the girl he loves.

স্বল্পশেষ

অধিক কিছু নেই গো কিছু নেই,
কিছু নেই–
যা আছে তা এই গো শুধু এই,
শুধু এই।
যা ছিল তা শেষ করেছি
একটি বসন্তেই।
আজ যা কিছু বাকি আছে
সামান্য এই দান–
তাই নিয়ে কি রচি দিব
একটি ছোটো গান?

একটি ছোটো মালা তোমার
হাতের হবে বালা।
একটি ছোটো ফুল তোমার
কানের হবে দুল।
একটি তরুলতায় ব’সে
একটি ছোটো খেলায়
হারিয়ে দিয়ে যাবে মোরে
একটি সন্ধেবেলায়।
অধিক কিছু নেই গো কিছু নেই,
কিছু নেই।
যা আছে তা এই গো শুধু এই,
শুধু এই।
ঘাটে আমি একলা বসে রই,
ওগো আয়!
বর্ষানদী পার হবি কি ওই–
হায় গো হায়!
অকূল-মাঝে ভাসবি কে গো
ভেলার ভরসায়।

আমার তরীখান
সইবে না তুফান;
তবু যদি লীলাভরে
চরণ কর দান,
শান্ত তীরে তীরে তোমায়
বাইব ধীরে ধীরে।
একটি কুমুদ তুলে তোমার
পরিয়ে দেব চুলে।
ভেসে ভেসে শুনবে বসে
কত কোকিল ডাকে
কূলে কূলে কুঞ্জবনে
নীপের শাখে শাখে।

ক্ষুদ্র আমার তরীখানি–
সত্য করি কই,
হায় গো পথিক, হায়,
তোমায় নিয়ে একলা নায়ে
পার হব না ওই
আকুল যমুনায়।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ক্ষণিকা হতে সংগ্রহীত)

Swalpashesh (The Little That Remains)
Translated by the Poet himself

It is little that remains now, the rest was spent in one careless summer. It is just enough to put in a song and sing to you; to weave in a flower- chain gently clasping your wrist; to hang in your ear like a round pink pearl, like a blushing whisper; to risk in a game one evening and utterly lose.

My boat is a frail small thing, not fit for crossing wild waves in the rain. If you but lightly step on it I shall gently row you by the shelter of the shore, where the dark water in ripples are like a dream-ruffled sleep; where the dove’s cooing from the drooping branches makes the noon- day shadows plaintive. At the day’s end, when you are tired, I shall pluck a dripping lily to put in your hair and take my leave.

– Rabindranath Thakur (Collected from Lover’s Gift)

কবিতা ৫৬ – মনে পড়া / Poem 56 – Mone Pora (I Cannot Remember My Mother)

Rabindranath Thakur-Ma Ke Amar

আজ রবিঠাকুরের আরেকটি কবিতা – পৃথিবীর অগোচরে একাকী মুহূর্তগুলোতে বয়সের মুখোশটা খুলে পড়ে ভিতরের ছোট্ট খোকা/খুকিটি যখন বেরিয়ে আসতে চায়, সেই মুহূর্তগুলোর জন্য।

A poem by Rabindranath Thakur, for the moments when it feels as if the little boys and girls within us have been made to grow up much sooner than they would have liked.

মনে পড়া 

মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে
হঠাৎ অকারণে
একটা কী সুর গুনগুনিয়ে
কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন
আমার খেলার মাঝে।
মা বুঝি গান গাইত, আমার
দোলনা ঠেলে ঠেলে;
মা গিয়েছে, যেতে যেতে
গানটি গেছে ফেলে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন আশ্বিনেতে
ভোরে শিউলিবনে
শিশির-ভেজা হাওয়া বেয়ে
ফুলের গন্ধ আসে,
তখন কেন মায়ের কথা
আমার মনে ভাসে?
কবে বুঝি আনত মা সেই
ফুলের সাজি বয়ে,
পুজোর গন্ধ আসে যে তাই
মায়ের গন্ধ হয়ে।
মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু যখন বসি গিয়ে
শোবার ঘরের কোণে;
জানলা থেকে তাকাই দূরে
নীল আকাশের দিকে
মনে হয়, মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে।
কোলের ‘পরে ধরে কবে
দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে
সারা আকাশ ছেয়ে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু ভোলানাথ  হতে সংগ্রহীত)

Mone Pora (I Cannot Remember My Mother)
(Translated by the poet himself)

I cannot remember my mother,
only sometime in the midst of my play
a tune seems to hover over my playthings,
the tune of some song that she used to hum
while rocking my cradle.
I cannot remember my mother,
but when in the early autumn morning
the smell of the shiuli flowers floats in the air,
the scent of the morning service in the temple
comes to me as the scent of my mother.
I cannot remember my mother,
only when from my bedroom window I send my eyes
into the blue of the distant sky,
I feel that the stillness of my mother’s gaze on my face
has spread all over the sky.

– Rabindranath Thakur (Collected from Shishu Bholanath)

কবিতা ৫৫ – কথা ছিল এক-তরীতে / Poem 55 – Katha Chhilo Ek Tori Te (It Was Whispered)

Rabindranath Thakur-Katha Chhilo Ek Tori Te (1)

সাহিত্যালাপের নামে পাঠকদের উপর যা চাপিয়ে দেই, তার অনেকটুকুই যে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বহিঃপ্রকাশ, এই সাইটে তা আমি স্বীকার করেছি আগেই। সম্প্রতি অবশ্য সেটিকেও ছাড়িয়ে আপলোডগুলোতে অতীত জীবনের দিনলিপীর পাতাগুলোই উঠে এসেছে বেশি। জানিনা কেন, তবে ফেলে আসা দিনগুলির কথা মনে পড়া কি খুব দোষের? আজ তাই পুরোনো স্মৃতি-জাগানো আরেকটি কবিতা – অপেক্ষা নিয়ে।

Of late, the choice of poems on this website has more been a reflection of the feelings than literary bias at this end. Perhaps that is because of how sobering it has been to get an inkling of the range and depth of human feelings – if only that wisdom and sadness did not go hand in hand! The realization of how much more there still is to learn and grow can be a bit overwhelming sometimes – but it also teaches one to be loving and kind, perhaps to a fault, but for some of us, that is the best we can ever hope to be.

Katha Chhilo Ek Tori Te (It Was Whispered) is a poem about waiting – expressed with a tenderness and sincere longing that perhaps only Rabindranath Thakur could. If you have ever waited  in earnest for someone, or will be returning to someone who has, then this poem is for you.

কথা ছিল এক-তরীতে

কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি
যাব   অকারণে ভেসে কেবল ভেসে,
ত্রিভুবনে জানবে না কেউ আমরা তীর্থগামী
কোথায়   যেতেছি কোন্‌ দেশে সে কোন্‌ দেশে।
কূলহারা সেই সমুদ্র-মাঝখানে
শোনাব গান একলা তোমার কানে,
ঢেউয়ের মতন ভাষা-বাঁধন-হারা
আমার   সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে।

           আজো সময়  হয় নি কি তার, কাজ কি আছে বাকি।
ওগো  ওই-যে সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে।
মলিন আলোয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখি
আপন   কুলায়-মাঝে সবাই এল ফিরে।
কখন তুমি আসবে ঘাটের ‘পরে
বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে।
অস্তরবির শেষ আলোটির মতো
তরী   নিশীথমাঝে যাবে নিরুদ্দেশে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (গীতাঞ্জলী  হতে সংগ্রহীত)

Katha Chhilo Ek Tori Te (It Was Whispered)
(Translated by the poet himself)

Early in the day it was whispered
that we should sail in a boat, only thou and I,
and never a soul in the world would know of this
our pilgrimage to no country and to no end.

In that shoreless ocean,
at thy silently listening smile
my songs would swell in melodies,
free as waves, free from all bondage of words.

Is the time not come yet?
Are there works still to do?
Lo, the evening has come down upon the shore
and in the fading light
the seabirds come flying to their nests.

Who knows when the chains will be off,
and the boat, like the last glimmer of sunset,
vanish into the night?

– Rabindranath Thakur (Collected from Gitanjali)

কবিতা ৪৯ – ব্যাকুল / Poem 49 – Byakul (The Wicked Postman)

Rabindranath Thakur-Byakul

চিরস্তব্ধ হয়ে যাওয়া কোন বাবার হয়ে তার অবুঝ শিশুর চিঠি লিখে মাকে প্রবোধ দিতে চাওয়ার চাইতে করুণ কিছু বোধহয় এই পৃথিবীতে খুব কমই আছে। আজ তা নিয়েই মন খারাপ করা একটি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যাকুল

There are few things sadder on earth than a little child trying to console a mother who has gone numb at the loss of her husband. In Rabindranath Thakur’s Byakul (The Wicked Postman), a little boy tells her mother that he will write her all the letters that father does not write to her any more, with a heartbreaking innocence and sincerity that is bound to touch the reader.

ব্যাকুল

অমন করে আছিস কেন মা গো,
খোকারে তোর কোলে নিবি না গো?
পা ছড়িয়ে ঘরের কোণে
কী যে ভাবিস আপন মনে,
এখনো তোর হয় নি তো চুল বাঁধা।
বৃষ্টিতে যায় মাথা ভিজে,
জানলা খুলে দেখিস কী যে —
কাপড়ে যে লাগবে ধুলোকাদা।
ওই তো গেল চারটে বেজে,
ছুটি হল ইস্কুলে যে —
দাদা আসবে মনে নেইকো সিটি।
বেলা অম্‌নি গেল বয়ে,
কেন আছিস অমন হয়ে —
আজকে বুঝি পাস নি বাবার চিঠি।
পেয়াদাটা ঝুলির থেকে
সবার চিঠি গেল রেখে —
বাবার চিঠি রোজ কেন সে দেয় না?
পড়বে ব’লে আপনি রাখে,
যায় সে চলে ঝুলি-কাঁখে,
পেয়াদাটা ভারি দুষ্টু স্যায়না।
মা গো মা, তুই আমার কথা শোন্‌,
ভাবিস নে মা, অমন সারা ক্ষণ।
কালকে যখন হাটের বারে
বাজার করতে যাবে পারে
কাগজ কলম আনতে বলিস ঝিকে।
দেখো ভুল করব না কোনো —
ক খ থেকে মূর্ধন্য ণ
বাবার চিঠি আমিই দেব লিখে।
কেন মা, তুই হাসিস কেন।
বাবার মতো আমি যেন
অমন ভালো লিখতে পারি নেকো,
লাইন কেটে মোটা মোটা
বড়ো বড়ো গোটা গোটা
লিখব যখন তখন তুমি দেখো।
চিঠি লেখা হলে পরে
বাবার মতো বুদ্ধি ক’রে
ভাবছ দেব ঝুলির মধ্যে ফেলে?
কক্‌খনো না, আপনি নিয়ে
যাব তোমায় পড়িয়ে দিয়ে,
ভালো চিঠি দেয় না ওরা পেলে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু হতে সংগ্রহীত)

Byakul (The Wicked Postman)
(Translation by the poet himself)

Why do you sit there on the floor so quiet and silent, tell me, mother dear?
The rain is coming in through the open window, making you all wet, and you don’t mind it.
Do you hear the gong striking four? It is time for my brother to come home from school.
What has happened to you that you look so strange?
Haven’t you got a letter from father today?
I saw the postman bringing letters in his bag for almost everybody in the town.
Only, father’s letters he keeps to read himself. I am sure the postman is a wicked man.
But don’t be unhappy about that, mother dear.
To-morrow is market day in the next village. You ask your maid to
buy some pens and papers.
I myself will write all father’s letters; you will not find a single mistake.
I shall write from A right up to K.
But, mother, why do you smile?
You don’t believe that I can write as nicely as father does!
But I shall rule my paper carefully, and write all the letters beautifully big.
When I finish my writing, do you think I shall be so foolish as father and drop it into the horrid postman’s bag?
I shall bring it to you myself without waiting, and letter by letter help you to read my writing.
I know the postman does not like to give you the really nice letters.

– Rabindranath Thakur (Collected from Shishu)

গল্প ১০৭ – অপরাজিত / Story 107 – Aparajito (The Unvanquished)

 

Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Aparajito 2

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Aparajito

অপরাজিত – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

গত বছর পাঠকদের জন্যে এই সাইটে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী সৃষ্টি পথের পাঁচালী  আপলোড করেছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় আজ অপরাজিত , যাতে পথের পাঁচালীতে অপুর শুরু হওয়া পথচলা তার বড় হয়ে ওঠার সাথে সাথে এগিয়ে চলে নিতান্তই সাধারণ কোন বাঙ্গালী পুরুষের জীবনের চেনা বাঁকগুলো বেয়ে। পথের পাঁচালী যারা পড়েছেন, তাদের হয়তো মনে থাকবে যে গল্পটি শেষ হয় সদ্য-কিশোর অপুর নিজেকে পৃথিবীর সামনে একা আবিস্কার করার মধ্যে দিয়ে। অপরাজিত গল্পটির সমাপ্তিও তেমনই একটি নতুন যাত্রার সূচনায়। তবে ততদিনে অপু তার জীবন-মধ্যাহ্নে, যে কারণে আগের গল্পের সেই কাঁচা ছেলেটির চাইতে অনেক বেশি পোড় খাওয়া ও পরিণত একজন মানুষরূপে আমরা তাকে পাই। কিছু জিনিস বদলায়না অবশ্য – জীবনের শত প্রতিকূলতা আর অপর্ণা-লীলাদের চলে যাওয়ার পরেও অপু সেই আগের মতই সবুজ-মনের নিষ্পাপ মানুষটিই থাকে। সবাই তেমনি করে অপরাজিত থাকতে পারে?

কিশোর থেকে পুরুষ হয়ে ওঠার জীবনযুদ্ধে টিকে থাকা একজন মানুষের গল্প অপরাজিত। পাঠকদের অনেকেই গল্পের অপুর মাঝে নিজেকে খুঁজে পাবেন জানি, তাই আমাদেরই কারো না কারো যাপিত জীবনের হাসি-কান্না নিয়ে লেখা এই অসাধারণ উপন্যাসটি আজ তুলে দিলাম।

Aparajito (The Unvanquished) – Bibhutibhushan Bandyopadhyay

It has been quite a few months since I uploaded Bibhutibhushan Bandyopadhyay’s Pather Panchali (Song of the Road) on this site. This time, in a follow up to it, an absolute masterpiece of a sequel: Aparajito (The Unvanquished) takes off where Pather Panchali had left the young Apu – alone and facing this world for the first time. And in this story, the bildungsroman continues, in the same, beautifully human tone that we find in the first. Life is more real this time, though – Apu has to care for himself and his mother in a world that could not care less about his struggles, and later, for a son who is only a reflection of Apu’s younger self. And through it all, he strives to keep his dreams and ideals alive in the face of the harsh reality that surrounds him, and has to hold himself together even as the people he comes to love depart one by one. Perhaps the plot sounds familiar? It is a ‘coming of age’ story that every man lives out, after all – a most beautiful bildungsroman. I hope you will like it… and if you have ever felt like a little boy who has had to grow up all too soon, I know you will.

গান ৪৬ – আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে / Song 46 – Aaj Jyotsna-raate Sabai Gechhe Bone (On This Moon-soaked Night)

Rabindranath Thakur-Aaj Jyotsnaraate (2)

বেশ কিছুদিন ধরেই রবিঠাকুরের লেখাগুলোর মাঝে ডুবে আছি, তাই এই সাইটটির সাম্প্রতিক সংযোজনগুলোর ধারাবাহিকতায় আজ কবিগুরুর আরেকটি কবিতা। আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে  গানটি রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন বোলপুরে থাকাকালে কোন এক জ্যোৎস্নালোকিত রাতে, সাহিত্যিক চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায়

“কোন এক উৎসব উপলক্ষে আমরা বহু লোক বোলপুরে গিয়েছিলাম। খুব সম্ভব ‘রাজা’ নাটক অভিনয় উপলক্ষে। বসন্তকাল, জ্যোৎস্না রাত্রি। যত স্ত্রীলোক ও পুরুষ এসেছিলেন তাঁদের সকলেই প্রায় পারুলডাঙ্গা নামক এক রম্য বনে বেড়াতে গিয়েছিলেন। কেবল আমি যাইনি রাত জাগবার ভয়ে।… গভীর রাত্রি, হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, মনে হল যেন ‘শান্তিনিকেতনের’ নীচের তলার সামনের মাঠ থেকে কার মৃদু মধুর গানের স্বর ভেসে আসছে। আমি উঠে ছাদে আলসের ধারে গিয়ে দেখলাম, কবিগুরু জ্যোৎস্নাপ্লাবিত খোলা জায়গায় পায়চারি করছেন আর গুন্‌গুন্‌ করে গান গাইছেন। আমি খালি পায়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে গেলাম, কিন্তু তিনি আমাকে লক্ষ করলেন না।, আপন মনে যেমন গান গেয়ে গেয়ে পায়চারি করছিলেন তেমনি পায়চারি করতে করতে গান গাইতে লাগলেন। গান গাইছিলেন মৃদুস্বরে।  তিনি গাইছিলেন ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে…”।

পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে কোন এক জ্যোৎস্নালোকিত রাত্রিতে তাঁকে মনে করে রবিঠাকুর এই গানটি লিখেছিলেন, এমন একটি ইতিকথা বাঙ্গালীদের মাঝে প্রচলিত। কিন্তু গানটি সত্যিই ঐ প্রেক্ষাপটে লেখা কিনা আমি জানিনা। কিন্তু এটুকু মনে হয় যে প্রিয় কিংবা আরাধ্য কোনও জনের জন্য গভীর ভালবাসা আর বেদনাভরা অপেক্ষা এমন আবেগভরে বোধহয় আর কোনও লেখায় বর্ণিত হয়নি। পাঠকদের মন আর্দ্র করে দিতে তাই গানের পংক্তিগুলো আজ এখানে তুলে দিলাম।

পুনশ্চ – গানটির উপরোক্ত ইতিহাস, এবং এডওয়ার্ড থমসনের লেখা সেটির নিম্নোক্ত ইংরেজি অনুবাদ আমি পেয়েছি গীতবিতান.নেট ওয়েবসাইটটিতে। রবীন্দ্রসংগীতের ব্যাপারে যারা বিস্তারিত জানতে চান, তাদের পৃষ্ঠাটিতে ঘুরে আসার আমন্ত্রণ ও অনুরোধ রইল। তাছাড়া যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে ইউটিউবে পাওয়া গানটির একটি ভিডিও নিচে সংযুক্ত করে দিলাম।

In continuation of my recent immersion in Rabindranath Thakur’s works, another of his songs. From anecdotal evidence, we know that Aaj Jyotsnaraate Sabai Gechhe Bone (On This Moon-soaked Night) was written by Thakur on a moonlit night in Bolpur, but whether it was written from grief at the loss of his younger son Shamindranath, we will perhaps never know. One can be sure, however, that that few works, if any, express with such tenderness the yearning and pain that accompanies Man’s separation from and wait to find a cherished someone (or perhaps God Himself, depending on how you read the poem) he has lost. For the softer corner of your heart, therefore, this song.

P.s. For non-native speakers, I have included two English translations of the song below. The anecdotes about the poem and the translation by Edward Thomson were found in http://www.gitabitan.net, which has a beautiful collection of Thakur’s songs and associated materials. Do take a peek. Also, if you prefer the words sung, you will find a YouTube video of a rendition at the end of this post.

আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে

আজ    জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥
যাব না গো যাব না যে,   রইনু পড়ে ঘরের মাঝে–
এই নিরালায় রব আপন কোণে।
যাব না এই মাতাল সমীরণে ॥

আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে
ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে।
আমারে যে জাগতে হবে,   কী জানি সে আসবে কবে
যদি আমায় পড়ে তাহার মনে
বসন্তের এই মাতাল সমীরণে ॥

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Aj Jyotsnarate Shabai Geche Bone (On This Moon-soaked Night)

Translation – Version 1- Edward Thomson
(Rabindranath Tagore: The Augustan Books of Modern Poetry, Ernest Benn Ltd. London, 1925)

They have all gone to the woods in this moonlit night,
In the south wind drunken with Spring’s delight.
But I will not go, will not go;
I will stay in the house, and so
Wait in my lonely corner-this night
I will not go in this south wind drunk with delight.

Rather, this room with care
I must scour and cleanse and prepare;
For … if He remembers me, then
He will come, though I know not when;
They must wake me swiftly. I will not fare
Out where the drunk wind reels through the air.

Translation – Version 2

On this moon-soaked night,
they have all gone to frolic in the forest.
The drunk spring breeze beckons, “Come!”
but heed it I will not.
In this desolate corner of my house, I will remain.
No I will not go into this intoxicating night.

I will stay behind
and clean my room with care.
Who knows when he may come?
Remain I must, perchance he remembers me,
and the drunk winds bring him here,
in this moonlit night.
I must stay awake.

– Rabindranath Thakur

গান ৪৫ – যদি প্রেম দিলে না প্রাণে / Song 45 – Jodi Prem Dile Na Praane (If Love Be Denied Me)

Rabindranath Thakur-Jodi Prem Dile Na Praane (1)

ঈশ্বরের কাছে আর্তিমাখা কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর তাঁর নীরবতার মাঝেই আমাদের খুঁজে নিতে হয়। আজ মন খারাপের বৃষ্টিভেজা একটি দিন, তাই।

On questions which God only answers through His silence, a few beautifully written lines by Rabindranath Thakur – for the days when it drizzles in your mind.

যদি প্রেম দিলে না প্রাণে

যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন ভোরের আকাশ ভরে দিলে এমন গানে গানে?।
কেন তারার মালা গাঁথা,
কেন ফুলের শয়ন পাতা,
কেন দখিন-হাওয়া গোপন কথা জানায় কানে কানে?।
যদি প্রেম দিলে না প্রাণে
কেন আকাশ তবে এমন চাওয়া চায় এ মুখের পানে?
তবে ক্ষণে ক্ষণে কেন
আমার হৃদয় পাগল-হেন
তরী সেই সাগরে ভাসায় যাহার কূল সে নাহি জানে?।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পূজা হতে সংগ্রহিত)

Jodi Prem Dile Na Praane (If love be denied me)

If love be denied me
then why does the morning break its heart in songs,
and why are these whispers
that the south wind scatters among the new- born leaves?
If love be denied me then why does the midnight
bear in yearning silence the pain of the stars?
And why does this foolish heart
recklessly launch its hope on the sea whose end it does not know?

– Rabindranath Thakur
(Collected from Crossing/Puja. Translated by the poet himself)

কবিতা ৩৩ – লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে / Poem 33 – Lekhan Amar Mlano Hoye Ashe (The Closing Words That Fade)

Rabindranath Thakur-Lekhan Amar (2)

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে ক্যান্ডেস জেম্‌স এর ওয়েব পাতায় / Original of the edited photo taken from candacejames.com)

আজ রবিঠাকুরের একটি কবিতা। জীবনে যেসব মানুষের প্রতি বলতে চাওয়া কিছু কথা চিরকাল অব্যক্ত থেকে যাবে, তাদের মনে রেখে।

On this day, a poem by Rabindranath Thakur – meant for the people in our lives whom we never get to tell how we feel for them. A poor attempt at translation follows.

লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে

লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে
অক্ষরে
এখন গোপনে ফুটিয়া উঠিছে,
অন্তরে।

অনাহত বাণী মনে তুলে নিয়ে
রেখো তারে তব স্মরণে
স্থায়ী হয়ে যাবে যখন সে বাণী
তরিয়া যাইবে মরণে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ – অপ্রচলিত সংগ্রহ)

Lekhan Amar Mlan Hoye Ashe (The Closing Words That Fade)

The closing words that fade
with the dying ink
Today etch themselves
unfadingly on the heart.

Friend, those unwritten lines
keep alive in your memory.
For in the stasis of writing
the song
would only meet its end.

– Rabindranath Thakur (Sphulinga – Apracholito Sangraha)

গল্প ৯৩ – পথের পাঁচালী / Story 93 – Pather Panchali (Song of the Road)

Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Pather Panchali

পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Bibhutibhushan Bandyopadhyay-Pather Panchali

পথের পাঁচালী – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরেকটি গল্প। পথের পাঁচালী র সারমর্ম পাঠকদের জন্য তুলে ধরার মত ক্ষমতা আমার নেই, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের অমর এই সৃষ্টিটিকে কি ভূমিকা ছাড়া এই সাইটে উপস্থাপন করা যায়? তাই এই ভণিতাটুকু। পথের পাঁচালী আমাদের চিরচেনা গ্রামবাংলারই কোনো এক প্রান্তে একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের জীবনকাহিনী, যাতে বিভূতিভূষণ পরিবারটির হাসি-কান্না, স্বপ্ন আর সংগ্রামের ছবি তুলে ধরেছেন অবিশ্বাস্য নিপুণতায়। এই সাইটে তোলা বিভূতিভূষণের আগের গল্পগুলোর মতো এটিও বিশেষ কোন পরিণতিকে উদ্দেশ্য করে নয়, বরং লেখা সাধারণ সব মানুষদের জীবনের নগণ্য সব ঘটনা নিয়েই। উদাহারণস্বরূপ গল্পটির মূল চরিত্র ছোট্ট অপুর জীবন থেকে একটি ঘটনা তুলে দেই –

বিশু ডানপিটে ছেলে, তাহাকে দৌড়িয়া ধরা কি খেলায় হারানো সোজা নয়। একবার অমলা স্পষ্টতই বিরক্তি প্রকাশ করিল। অপু প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিল যাহাতে সে জেতে, যাহাতে অমলা সন্তুষ্ট হয় – কিন্তু বিস্তর চেষ্টা সত্ত্বেও সে আবার হারিয়া গেল।

সে-বার দল গঠন করিবার সময় অমলা ঝুঁকিল বিশুর দিকে।

অপুর চোখে জল ভরিয়া আসিল। খেলা তাহার কাছে হঠাৎ বিস্বাদ মনে হইল – অমলা বিশুর দিকে ফিরিয়া সব কথা বলিতেছে, হাসিখুসি সবই তাহার সঙ্গে। খানিকটা পরে বিশু কি কাজে বাড়ী যাইতে চাইলে অমলা তাহাকে বার বার বলিল যে, সে যেন আবার আসে। অপুর মনে অত্যন্ত ঈর্ষা হইল, সারা সকালটা একেবারে ফাঁকা হইয়া গেল! পরে সে মনে মনে ভাবিল – বিশু খেলা ছেড়ে চলে যাচ্ছে – গেলে খেলার খেলুড়ে কমে যাবে, তাই অমলাদি ঐরকম বলছে, আমি গেলে আমাকেও বলবে, ওর চেয়েও বেশি বলবে। হঠাৎ সে চলিয়া যাইবার ভান করিয়া বলিল – বেলা হয়ে যাচ্ছে, আমি যাই নাইবো। অমলা কোনো কথা বলিল না, কেবল কামারদের ছেলে নাড়ুগোপাল বলিল – আবার ও-বেলা এসো ভাই!

অপু খানিক দূর গিয়া একবার পিছনে চাহিল – তাহাকে বাদ দিয়া কাহারও কোনো ক্ষতি হয় নাই। পুরাদমে খেলা চলিতেছে, অমলা মহা উৎসাহে খুঁটির কাছে বুড়ি হইয়া দাঁড়াইয়াছে – তাহার দিকে ফিরিয়াও চাহিতেছে না।

অপু আহত হইয়া অভিমানে বাড়ি আসিয়া পৌঁছিল, কাহারও সঙ্গে কোনো কথা বলিল না।

ভারি তো অমলাদি! না চাহিল তাহাকে – তাতেই বা কি?…

উপরের লেখাটি পড়লে ছোটবেলায় ঘটে যাওয়া তেমনই কোন ঘটনার কথা মনে পড়ে, তাই না? বাংলা সাহিত্যিকদের মধ্যে গ্রামীণ সমাজ আর শিশুমনকে একইসাথে বিভূতিভূষণের মতো অবলীলায় তুলে ধরতে আর কেউ বোধহয় পারেননি, আর তাঁর ক্ষমতার উৎকর্ষ যদি কোথাও ঘটে থাকে, তা এই গল্পতেই।পথের পাঁচালী  শুধু পল্লীবাংলার অকৃত্তিম প্রতিচ্ছবিই নয়, তার বুকে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ছেলেমানুষী হাসি-কান্নার দিনলিপিও। আর সেই অনন্যতাস্বরূপই বাংলা সাহিত্যে ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই হয়তো গল্পটি অদ্বিতীয়। অসাধারণ এই গল্পটি ছাড়া এই সাইটটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, তাই আজ পাঠকদের জন্যে এটি তুলে দিলাম।

(প্রসঙ্গত – যারা আগে জানতেন না, সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী  কিন্তু বিভূতিভূষণের এই গল্পকে ঘিরেই লেখা। সত্যজিৎ রায়ের অতুলনীয় নির্দেশনার কারণে গল্পটি বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছে সন্দেহ নেই, তবে চলচ্চিত্রের সৌন্দর্যের মূলটুকু কিন্তু সত্যজিৎ খুঁজে পেয়েছিলেন তার প্রিয় এই গল্পটির মধ্যেই। পথের পাঁচালী  চলচ্চিত্রটি বানানো নিয়ে সত্যজিৎ তাঁর একেই বলে শুটিং  স্মৃতিচারণার একটি অধ্যায় লিখেছিলেন – পাঠকদের সেটিও পড়বার আমন্ত্রণ রইল।)

Pather Panchali (Song of the Road) – Bibhutibhushan Bandyopadhyay

Pather Panchali (Song of the Little Road) by Bibhutibhushan Bandyopadhyay, is one of the most celebrated works in Bangla literature. As far as accolades go, there is not much I can say that has not been already said, but it needs to be mentioned that perhaps no other work in Bangla, and even perhaps world literature, compares to the novel in its representation of a rural life from the perspective of a little boy (Apu) from a poor family. Like Bibhutibhushan Bandyopadhyay’s other works, Pather Panchali too does not have a conclusion towards which it is directed. Instead, the narratives loses itself in a languid but beautiful flow that is interspersed with little Apu’s joys and sorrows – for instance, his seeing a train for the first time, and his offense at not heeded by a girl with whom he wants to play. The narrative is not even throughout, however. As Apu grows up, the realities of his world become starker, and on the last page of the novel, an adolescent Apu is left trying to become a man. In many ways, Pather Panchali is a familiar story of our childhoods, and the close-knit families from which many of us come. But it is with this ordinariness that it captures the reader, stirring up the most intimate and beautiful of childhood memories, and anchors itself to his/her heart. That every Bangalee should read this Bibhutibhushan masterpiece goes without saying. So here it is, for your eyes.

(Something that you might find interesting: The story was taken to the global audience by eminent Indian film director Satyajit Ray, whose début with Pather Panchali (Song of the Little Road), brought him and his genre of Indian cinema critical acclaim across the world. Ray’s personal account of the making of the film can be found in his autobiography Ekei Bole Shooting. While Ray’s direction was crucial in presenting the narrative, he always took particular care to acknowledge Bibhutibhushan’s influence on him. Those who have read Feluda’s stories will know that Bibhutibhushan was the sleuth’s favorite writer. )

কবিতা ২২ – সুকুমার রায়ের কিছু ছড়া / Poem 22 – Sukumar Ray er Kichhu Chhara (Some Rhymes by Sukumar Ray)

আধুনিক বাংলা শিশুতোষ সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ সুকুমার রায়। ছোটবেলায় যে তাঁর লেখা কত মজার ছড়া পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। অনেক দিন পর হঠাৎ করেই কোন প্রসংক্রমে তাঁর কিছু কবিতা মনে পড়ে গেল। কবিতাগুলো ছোটদের জন্যে লেখা, কিন্তু বুড়োরা যে এসবে অর্থ খুঁজে পাবে না তা নয়। আমি তো অন্তত কিছু কিছু মানে খুঁজে পাই। হয়তো যথেষ্ট পরিণত হইনি বলে। যাই হোক, বাংলা সাহিত্যের অদ্ভুতুড়ে কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে গভীর অর্থবহ কোণটির উদযাপনে এই লেখা।

This time, a collection of rhymes by one of the pioneers of modern Bangla youth literature. Sukumar Ray wrote his poems about a century ago. Yet, they continue to inspire childish joy among young and adults alike, and if you read just right, reveal a lot about us and our society. Consider this to be in celebration of the ridiculous but meaningful.

কবিতা গুলো সংগ্রহ করা হয়েছে এখান থেকে। সুকুমার রায়ের আরও অনেক ভাল লেখা আছে এখানে।

কুমড়ো পটাশ

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ নাচে-
খবরদার এসো না কেউ আস্তাবলের কাছে ;
চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে চাইবে নাকো পাছে ;
চার পা তুলে থাকবে ঝুলে হট্টমুলার গাছে !

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ কাঁদে-
খবরদার! খবরদার! বসবে না কেউ ছাদে ;
উপুড় হয়ে মাচায় শুয়ে লেপ কম্বল কাঁধে ;
বেহাগ সুরে গাইবে খালি ‘রাধে কৃষ্ণ রাধে’ !

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ হাসে-
থাকবে খাড়া একটি ঠ্যাঙে রান্নাঘরের পাশে ;
ঝাপ্‌সা গলায় ফার্সি কবে নিশ্বাসে ফিস্‌ফাসে ;
তিনটি বেলা উপোস করে থাকবে শুয়ে ঘাসে !

Kumropatash

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ ছোটে-
সবাই যেন তড়বড়িয়ে জানলা বেয়ে ওঠে ;
হুঁকোর জলে আলতা গুলে লাগায় গালে ঠোঁটে ;
ভুলেও যেন আকাশ পানে তাকায় নাকো মোটে !

(যদি) কুম্‌‌ড়োপটাশ ডাকে-
সবাই যেন শাম্‌লা এঁটে গামলা চড়ে থাকে ;
ছেঁচকি শাকের ঘণ্ট বেটে মাথায় মলম মাখে ;
শক্ত ইঁটের তপ্ত ঝামা ঘষতে থাকে নাকে !

তুচ্ছ ভেবে এ-সব কথা করছে যারা হেলা,
কুম্‌‌ড়োপটাশ জানতে পেলে বুঝবে তখন ঠেলা ।
দেখবে তখন কোন্‌ কথাটি কেমন করে ফলে,
আমায় তখন দোষ দিওনা, আগেই রাখি বলে ।

বড়াই

গাছের গোড়ায় গর্ত ক’রে ব্যাং বেঁধেছেন বাসা,
মনের সুখে গাল ফুলিয়ে গান ধরেছেন খাসা।
রাজার হাতি হাওদা-পিঠে হেলে দুলে আসে—
“বাপ্‌রে” ব’লে ব্যাং বাবাজি গর্তে ঢোকেন ত্রাসে!
রাজার হাতি মেজাজ ভারি হাজার রকম চাল;
হঠাৎ রেগে মটাৎ ক’রে ভাঙল গাছের ডাল।
গাছের মাথায় চড়াই পাখি এবাক হ’য়ে কয়—
“বাস্‌রে বাস্‌! হাতির গায়ে এমন জোরও হয়”!
মুখ বাড়িয়ে ব্যাং বলে, “ভাই, তাইত তোরে বলি—
আমরা, অর্থাৎ চার-পেয়েরা, এম্নিভাবেই চলি”।।

বাবুরাম সাপুড়ে

Baburam Shapureবাবুরাম সাপুড়ে,
কোথা যাস্‌ বাপুরে?
আয় বাবা দেখে যা,
দুটো সাপ রেখে যা !
যে সাপের চোখ নেই,
শিং নেই নোখ্‌ নেই,
ছোটে না কি হাঁটে না,
কাউকে যে কাটে না,
করে নাকো ফোঁস ফাঁস,
মারে নাকো ঢুঁশঢাঁশ,
নেই কোন উৎপাত,
খায় শুধু দুধ ভাত-
সেই সাপ জ্যান্ত
গোটা দুই আনত ?
তেড়ে মেরে ডাণ্ডা
ক’রে দেই ঠাণ্ডা ।

ভাল ছেলের নালিশ

মাগো!
প্রসন্নটা দুষ্টু এমন! খাচ্ছিল সে পরোটা
গুড় মাখিয়ে আরাম ক’রে বসে –
আমায় দেখে একটা দিল ,নয়কো তাও বড়টা,
দুইখানা সেই আপনি খেল ক’ষে!
তাইতে আমি কান ধরে তার একটুখানি পেঁচিয়ে
কিল মেরেছি ‘হ্যাংলা ছেলে’ বলে-
অম্‌‌নি কিনা মিথ্যা করে ষাঁড়ের মত চেচিয়ে
গেল সে তার মায়ের কাছে চলে!

মাগো!
এম্‌‌নিধারা শয়তানি তার, খেলতে গেলাম দুপুরে,
বল্‌ল, ‘এখন খেলতে আমার মানা’-
ঘন্টাখানেক পরেই দেখি দিব্যি ছাতের উপরে
ওড়াচ্ছে তার সবুজ ঘুড়ি খানা।
তাইতে আমি দৌড়ে গিয়ে ঢিল মেরে আর খুঁচিয়ে
ঘুড়ির পেটে দিলাম করে ফুটো-
আবার দেখ বুক ফুলিয়ে সটান মাথা উঁচিয়ে
আনছে কিনে নতুন ঘুড়ি দুটো!

সাধে কি বলে গাধা

বললে গাধা মনের দুঃখে অনেকখানি ভেবে-
“বয়েস গেল খাটতে খাটতে, বৃদ্ধ হলাম এবে,
কেউ না করে তোয়াজ তবু, সংসারের কি রীতি !
ইচ্ছে করে এক্ষুনি দিই কাজে কর্মে ইতি ।
কোথাকার ঐ নোংরা কুকুর, আদর যে তার কত-
যখন তখন ঘুমোচ্ছে সে লাটসাহেবের মত !
ল্যাজ নেড়ে যেই, ঘেউ ঘেউ ঘেউ, লাফিয়ে দাঁড়ায় কোলে,
মনিব আমার বোক্‌চন্দর, আহ্লাদে যান গলে ।
আমিও যদি সেয়ানা হতুম, আরামে চোখ মুদে
রোজ মনিবের মন ভোলাতুম অম্নি নেচে কুঁদে ।
ঠাং নাচাতুম, ল্যাজ দোলাতুম, গান শোনাতুম সাধা-
এ বুদ্ধিটা হয়নি আমার- সাধে কি বলে গাধা !”

বুদ্ধি এঁটে বসল গাধা আহ্লাদে ল্যাজ নেড়ে,
নাচ্‌ল কত, গাইল কত, প্রাণের মায়া ছেড়ে ।
তারপরেতে শেষটা ক্রমে স্ফুর্তি এল প্রাণে
চলল গাধা খোদ্‌ মনিবের ড্রইংরুমের পানে ।
মনিবসাহেব ঝিমুচ্ছিলেন চেয়ারখানি জুড়ে,
গাধার গলার শব্দে হঠাৎ তন্দ্রা গেল উড়ে ।
চম্‌কে উঠে গাধার নাচন যেমনি দেখেন চেয়ে,
হাসির চোটে সাহেব বুঝি মরেন বিষম খেয়ে ।

ভাব্‌লে গাধা- এই তো মনিব জল হয়েছেন হেসে
এইবারে যাই আদর নিতে কোলের কাছে ঘেঁষে ।
এই না ভেবে এক্কেবারে আহ্লাদেতে ক্ষেপে
চড়্‌ল সে তার হাঁটুর উপর দুই পা তুলে চেপে ।
সাহেব ডাকেন ‘ত্রাহি ত্রাহি’ গাধাও ডাকে ‘ঘ্যাঁকো’
(অর্থাৎ কিনা ‘কোলে চড়েছি, এখন আমার দ্যাখো !’)

ডাক শুনে সব দৌড়ে এল ব্যস্ত হয়ে ছুটে,
দৌড়ে এল চাকর বাকর মিস্ত্রী মজুর মুটে,
দৌড়ে এল পাড়ার লোকে, দৌড়ে এল মালী-
কারুর হাতে ডাণ্ডা লাঠি, কারু বা হাত খালি ।
ব্যাপার দেখে অবাক সবাই, চক্ষু ছানাবড়া-
সাহেব বললে, “উচিত মতন শাসনটি চাই কড়া ।”
হাঁ হাঁ ব’লে ভীষন রকম উঠ্‌ল সবাই চটে
দে দমাদম্‌ মারের চোটে গাধার চমক্‌ ছোটে ।

ছুটল গাধা প্রাণের ভয়ে গানের তালিম ছেড়ে,
ছুটল পিছে একশো লোকে হুড়মুড়িয়ে তেড়ে ।
তিন পা যেতে দশ ঘা পড়ে, রক্ত ওঠে মুখে-
কষ্টে শেষে রক্ষা পেল কাঁটার ঝোপে ঢুকে ।
কাঁটার ঘায়ে চামড়া গেল, সার হল তার কাঁদা ;
ব্যাপার শুনে বললে সবাই, “সাধে কি বলে গাধা !”

Sukumar Ray-Shadhe ki Bale Gadha

অসম্ভব নয় !

এক যে ছিল সাহেব, তাহার
গুণের মধ্যে নাকের বাহার ।
তার যে গাধা বাহন, সেটা
যেমন পেটুক তেমনি ঢ্যাঁটা ।
ডাইনে বললে যায় সে বামে
তিন পা যেতে দুবার থামে ।
চল্‌‌তে চল্‌‌তে থেকে থেকে
খানায় খন্দে পড়ে বেঁকে ।
ব্যাপার দেখে এম্নিতরো
সাহেব বললে, “সবুর করো-
মামদোবাজি আমার কাছে ?
এ রোগেরও ওষুধ আছে ।”
এই না ব’লে ভীষণ ক্ষেপে
গাধার পিঠে বস্‌ল চেপে
মুলোর ঝুঁটি ঝুলিয়ে নাকে ।
আর কি গাধা ঝিমিয়ে থাকে ?
মুলোর গন্ধে টগবগিয়ে
দৌড়ে চলে লম্ফ দিয়ে-
যতই চলে ধরব ব’লে
ততই মুলো এগিয়ে চলে!
খাবার লোভে উদাস প্রাণে
কেবল ছোটে মুলোর টানে-
ডাইনে বাঁয়ে মুলোর তালে
ফেরেন গাধা নাকের চালে ।

Sukumar Ray-Ashambhab Noy

বিষম চিন্তা

মাথায় কত প্রশ্ন আসে, দিচ্ছে না কেউ জবাব তার—
সবাই বলে, “মিথ্যে বাজে বকিস্‌নে আর খবরদার !”
অমন ধারা ধমক দিলে কেমন করে শিখব সব ?
বলবে সবাই, “মুখ্যু ছেলে”, বলবে আমায় “গো গর্ধভ !”
কেউ কি জানে দিনের বেলায় কোথায় পালায় ঘুমের ঘোর ?
বর্ষা হলেই ব্যাঙের গলায় কোত্থেকে হয় এমন জোর ?
গাধার কেন শিং থাকেনা, হাতির কেন পালক নেই ?
গরম তেলে ফোড়ন দিলে লাফায় কেন তাধেই ধেই ?
সোডার বোতল খুললে কেন ফঁসফঁসিয়ে রাগ করে ?
কেমন করে রাখবে টিকি মাথায় যাদের টাক পড়ে ?
ভূত যদি না থাকবে তবে কোত্থেকে হয় ভূতের ভয় ?
মাথায় যাদের গোল বেধেছে তাদের কেন “পাগোল” কয় ?
কতই ভাবি এসব কথা, জবাব দেবার মানুষ কই ?
বয়স হলে কেতাব খুলে জানতে পাব সমস্তই ।

ছোটগল্প ৫৬ – অঙ্ক স্যার, গোলাপীবাবু আর টিপু / Short Story 56 – Anko Sir, Golapi Babu Ar Tipu (Tipu, The Maths Teacher, and Mr. Pink)

Satyajit Ray-Anko Sir, Golapibabu ar Tipu (1)পিডিএফ লিঙ্ক / PDF Link: Satyajit Ray-Anko Sir, Golapi Babu Ar Tipu

অঙ্ক স্যার, গোলাপীবাবু আর টিপু – সত্যজিৎ রায়

বাড়ির পিছনে যে নেড়া শিরীষ গাছটা আছে, তারই নিচে দাঁড়িয়েছিল লোকটা। এদিকটা বড় একটা কেউ আসে না। শিরীষ গাছটার পিছনে খোলা মাঠ, তারও পিছনে ধান ক্ষেত, আর তারও অনেক, অনেক পিছনে পাহাড়ের সারি। কদিন আগেই টিপু এদিকটায় এসে একটা ঝোপের ধারে একটা বেজিকে ঘোরাফেরা করতে দেখেছিল। আজ হাতে কিছু পাঁউরুটির টুকরো নিয়ে এসেছিল ঝোপটার ধারে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, যদি তারই লোভে বেজিটা আবার দেখা দেয়। এমন সময় হঠাৎ চোখ পড়ল গাছতলায় দাঁড়ানো লোকটার দিকে। চোখাচুখি হতেই লোকটা ফিক্‌ করে হেসে বলল, ‘হ্যালো।’

সাহেব নাকি? সাহেব হলে কথা বলে বেশিদূর এগোনো যাবে না, তাই টিপু কিছুক্ষণ কিছু না বলে লোকটার দিকে তাকিয়েছিল। এবার লোকটাই ওর দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘তোমার কোনো দুঃখ আছে?’

‘দুঃখ?’

‘দুঃখ।’

টিপু তো অবাক। এমন প্রশ্ন তাকে কেউ কোনদিন করেনি। সে বলল, ‘কই না তো, দুঃখ তো নেই।’

‘ঠিক বলছ?’

‘বা রে ঠিক বলব না কেন?’

‘তোমার তো দুঃখ থাকার কথা। হিসেব করে তো তাই বেরোল।’

‘কী রকম দুঃখ? ভেবেছিলাম বেজিটাকে দেখতে পাব, কিন্তু পাচ্ছি না। সেরকম দুঃখ?’

‘উহুঁ উহুঁ। যে দুঃখে কানের পিছনটা নীল হয়ে যায়, হাতের তেলো শুকিয়ে যায়, সেরকম দুঃখ।’

‘মানে ভীষণ দুঃখ?’

‘হ্যাঁ।’

‘না, সেরকম দুঃখ নেই।’।

রূপকথার গল্প পড়তে ভালবাসে এমন একটা ছোট্ট ছেলে, একজন অঙ্ক স্যার, যিনি বিশ্বাস করেন ছোটদের এসব পড়া উচিত নয়, গোলাপীবাবু, আর হ্যা, পেগাসাস – সত্যজিৎ রায়ের একটি অপূর্ব গল্প, যা প্রতিটি কল্পনাচঞ্চল মনেরই ভালো লাগবে।

Anko Sir, Golapi Babu Ar Tipu (The Maths Teacher, Tipu and Mr. Pink) – Satyajit Ray

A little boy who loves to read fairy-tales, a maths teacher who believes that children should not read ‘such rubbish’, Mr. Pink the alien… and Pegasus – a most wonderful story by Satyajit Ray, and a must read for those whose minds refuse to be imprisoned within the covers of a textbook. Enjoy!

Satyajit Ray-Anko Sir, Golapibabu ar Tipu (2)