কবিতা ৩২ – বিদায় / Poem 32 – Biday (Farewell)

Rabindranath Thakur-Biday

আজ রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা। জীবন থেকে হেলায় হারানো লাবণ্যটুকুকে মনে করে পড়বার জন্যে। আজও ভালবাসি, তাই।

This time, one of Rabindranath Thakur’s most beautiful poems – Biday (Farewell). The poem is meant to be the last words a person can say to his/her beloved before they part – if you have ever said goodbye to someone who you will never stop loving, this poem is for you. A slightly modified version of a wonderful translation by Rumela Sengupta follows.

বিদায়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,
চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।
ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল–
তুলে নিল দ্রুতরথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহুদূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হয়ে আসিলাম
আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হতে যদি দেখ চাহি
পারিবে না চিনিতে আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

কোনোদিন কর্মহীন পূর্ণ অবকাশে,
বসন্তবাতাসে
অতীতের তীর হতে যে রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতপ্রদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা-স্বপ্নের মুরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
সে আমার প্রেম।
তারে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
পরিবর্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু, বিদায়।
তোমার হয় নি কোনো ক্ষতি
মর্তের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত-মুরতি
যদি সৃষ্টি করে থাক, তাহারি আরতি
হোক তব সন্ধ্যাবেলা।
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লানস্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত আবেগবেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তার কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানসভোজে সযত্নে সাজালে
যে ভাবরসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
তার সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
আজও তুমি নিজে
হয়তো বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নাবিষ্ট তোমার বচন।
ভার তার না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

মোর লাগি করিয়ো না শোক,
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠ আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সেই ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হতে আনি
রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ-রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু, তার
পেয়েছ নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হতে মম।
ওগো তুমি নিরুপম,
হে ঐশ্বর্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Biday (Farewell)

Do you hear the wheels of time rumble
It’s chariot disappearing in a flash
It arouses a vibration of heartbeats in the vast ether
Heartbroken sobs of stars glisten in trampled darkness
My friend
That fleeting time
Embraces me, weaving it’s web
Lifts me to that speeding chariot
En route the dare-devil journey
Far, far away from you
I feel, a thousand deaths
I have faced to come here
At the summit of this new dawn –
The chariot’s restless pace
Sets free my name of yore – aflutter in the breeze
I have no means of turning back
If you see me from afar
You will know me not
My friend, farewell.

Some day, in respite from work
In the fullness of leisure amidst a soft spring breeze
On a night when deep sighs float forth from shores of the past
Wails of withered bakul flowers pierce the skies
In that moment search and see
A part of me is left behind in the margins of your life.
In the oblivion of dusk, it may hold some light
It may, in nameless dreams, take form.
Yet a dream it is not
My truth above all it is,
Death-defying
It is my love.
That I have left behind
Unchanging homage in your name
I float on with the flow of change
With the journey of time
My friend, farewell.

A loss it is not for you
Merely mortal my clay
If you have created with it an idol immortal
Let it be worshipped at eventide
That game of devotion will not be hindered
Tarnished not by my daily touch
Not one flower detached from the salver of floral offering
The festive spread of your mind that you garnish with care
With the sweet juice of emotion to quench the desire of expression
I will not adulterate it with my riches that are mere dust
With that, which is moist with my tears
Even today you may design your creation
With words woven in dreams of just my memory
Weighed not down nor moored to obligation
My friend, farewell.

Grieve not for me
I have my work
I have this whole wide world
My vessel, empty it is not
I will make whole each void
This vow I take forevermore.
If there be one who is
For me anxiously awaiting
That very one will fulfill me
The one who brings a tuberose stalk
From the night of the waxing moon
To decorate the salver of sacrifice
When it wanes
Who sees me as I am
Virtues and vices all
With boundless forgiveness
In worship of the one
Now I wish to give up myself.
What I have given you
Your right to that remains endless
An iota it is
That I give here and now
Pitiable moments
That sip in mere fistfuls
From this heart of mine
It’s hands folded in prayer
What I have given you
Was your own gift to me
The more you accepted
The more indebted you made me
My friend, farewell!

Rabindranath Thakur (Translated by Rumela Sengupta)

Advertisements

কবিতা ১২ – হঠাৎ দেখা / Poem 12 – Hathat Dekha (An Unexpected Reunion)

Hathat Dekha (2)

পূর্ণতা না পাওয়া ভালবাসাগুলো হৃদয়ের মাঝে অতীতের যে মানুষটিকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তারই সাথে যদি অনেকদিন পর হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, তখন মনে কি অনুভূতি জাগে? যারা তা জানেন, আজ তাদের জন্য রবি ঠাকুরের একটি কবিতা, দুটি মানুষের ক্ষণিকের পুনর্মিলন, দ্বিধান্বিত ভালবাসা আর পুনর্বিচ্ছেদ নিয়ে।

This time, a poem about the feelings that separation from the beloved sustains within us, and how unexpected reunions rekindle old emotions and questions whose answers only lead to more. In Hathat Dekha (An Unexpected Reunion), Rabindranath Tagore narrates one such reunion – a chance encounter between former lovers on a train.

A crudely translated excerpt, by yours truly, is provided below the original.

হঠাৎ দেখা

রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা,
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনোদিন।
আগে ওকে বারবার দেখেছি
লালরঙের শাড়িতে
দালিম ফুলের মতো রাঙা;
আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,
আঁচল তুলেছে মাথায়
দোলনচাঁপার মতো চিকনগৌর মুখখানি ঘিরে।
মনে হল, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব
ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,
যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়
শালবনের নীলাঞ্জনে।
থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা;
চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।
হঠাৎ খবরের কাগজ ফেলে দিয়ে
আমাকে করলে নমস্কার।
সমাজবিধির পথ গেল খুলে,
আলাপ করলেম শুরু —
কেমন আছ, কেমন চলছে সংসার
ইত্যাদি।
সে রইল জানলার বাইরের দিকে চেয়ে
যেন কাছের দিনের ছোঁয়াচ-পার-হওয়া চাহনিতে।
দিলে অত্যন্ত ছোটো দুটো-একটা জবাব,
কোনোটা বা দিলেই না।
বুঝিয়ে দিলে হাতের অস্থিরতায় —
কেন এ-সব কথা,
এর চেয়ে অনেক ভালো চুপ করে থাকা।
আমি ছিলেম অন্য বেঞ্চিতে
ওর সাথিদের সঙ্গে।
এক সময়ে আঙুল নেড়ে জানালে কাছে আসতে।
মনে হল কম সাহস নয়;
বসলুম ওর এক-বেঞ্চিতে।
গাড়ির আওয়াজের আড়ালে
বললে মৃদুস্বরে,
“কিছু মনে কোরো না,
সময় কোথা সময় নষ্ট করবার।
আমাকে নামতে হবে পরের স্টেশনেই;
দূরে যাবে তুমি,
দেখা হবে না আর কোনোদিনই।
তাই যে প্রশ্নটার জবাব এতকাল থেমে আছে,
শুনব তোমার মুখে।
সত্য করে বলবে তো?
আমি বললেম, “বলব।”
বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,
“আমাদের গেছে যে দিন
একেবারেই কি গেছে,
কিছুই কি নেই বাকি।”
একটুকু রইলেম চুপ করে;
তারপর বললেম,
“রাতের সব তারাই আছে
দিনের আলোর গভীরে।”
খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম না কি।
ও বললে, “থাক্‌, এখন যাও ও দিকে।”
সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে;
আমি চললেম একা।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শ্যামলী হতে সংগ্রহীত)

Translated Excerpt from Hathat Dekha (An Unexpected Reunion)

Looking away towards the sky, she asked:
“The days we have had, have they all gone,
is there nothing left of those?”

I replied, “The stars still twinkle, beneath the light of the sun.”

At the next station, she got off the train
And I continued, unsure and alone.

– Rabindranath Thakur