কবিতা ৭৬ – বিদ্রোহী / Poem 76 – Bidrohee (The Rebel)

আজ একটি কবিতা, যা নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে একটি। নজরুল-সাহিত্যের উৎকর্ষ বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে বিদ্রোহী  কবিতাটি খুব সম্ভবত তাই – অন্তত যতদূর জানি, মানব-সমাজের কলুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কোন বিদ্রোহীর নির্মম ক্রোধ ও অপরাজিত ঔদ্ধত্যেকে এমন অসামান্য রূপ আর কোন কাব্য দিতে পারেনি। কবিতাটি যতবারই পড়ি, ততবারই মনে রোমাঞ্চ জাগে, তাই পাঠকদের জন্যে আজ তুলে দেওয়া। শোনা যায় যে বিদ্রোহী কবিতাটি নজরুল লিখেছিলেন এক রাতে – সেটি কতটা অকল্পনীয় আর অসামান্য একটি ব্যাপার, কবিতাটি পড়লে তা বোঝা যায়।

পুনশ্চ – পাঠকদের মধ্যে অনেকেই হয়তো জেনে থাকবেন যে নজরুলের বন্ধু কবি মোহিতলাল মজুমদারেরআমি  লেখাটির সাথে বিদ্রোহী র মোক্ষম সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। বিদ্রোহ কবিতাটি যে শুধুমাত্র কাব্যশৈলীর গুণেই অনন্য, তবে যেই লেখা দ্বারা সেটি অনুপ্রাণিত, তাঁর লেখকের অবদানও অনস্বীকার্য। ভবিষ্যতে তাই বিদ্রোহী র সাথে সাথে সেই লেখাটিও তুলে দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।

Today, one of the masterclasses of the rebel poet of Bangla literature, and one that has been long overdue on this site. Critics unanimously say Bidrohi (The Rebel) is one of Nazrul’s masterclasses, but that label hardly conveys sheer awesomeness of the poem. I can only testify for myself, but every time I read it, I am left amazed that words could portray rage and radiance in the measures contained by the poem. And what words they are! Read on to find out!

Legend has it that Nazrul composed Bidrohi in a single night. If so, that is an achievement by its own. Condensing fire and ice into a whirl of words that stun the reader is in itself an act of genius – but doing that in one night is at a whole different plane.

P.s. It was recently brought into my attention that while writing Bidrohi, Nazrul might have borrowed heavily from Ami (Me) – a work authored by his once close-friend and contemporary poet Mohitlal Majumdar. While Nazrul’s fiery style is what defines the poem, acknowledgments are also due for unapplauded literary figures like Majumdar – in the future, I hope to feature Ami in a post of its own.

বিদ্রোহী – কাজী নজরুল ইসলাম

বল বীর –
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর –
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর –
আমি চির উন্নত শির!

আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস,
মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!
আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর,
আমি দুর্বার,
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল,
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানি না কো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন!
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর
আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর!
বল বীর –
চির-উন্নত মম শির!

আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’।
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।
আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’
ফিং দিয়া দিই তিন দোল;
আমি চপলা-চপল হিন্দোল।
আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,
করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা,
আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা!
আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর;
আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর!
বল বীর –
আমি চির উন্নত শির!

আমি চির-দুরন্ত দুর্মদ,
আমি দুর্দম, মম প্রাণের পেয়ালা হর্দম হ্যায় হর্দম ভরপুর মদ।
আমি হোম-শিখা, আমি সাগ্নিক জমদগ্নি,
আমি যজ্ঞ, আমি পুরোহিত, আমি অগ্নি।
আমি সৃষ্টি, আমি ধ্বংস, আমি লোকালয়, আমি শ্মশান,
আমি অবসান, নিশাবসান।
আমি ইন্দ্রাণী-সুত হাতে চাঁদ ভালে সূর্য
মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর রণ-তূর্য;
আমি কৃষ্ন-কন্ঠ, মন্থন-বিষ পিয়া ব্যথা-বারিধীর।
আমি ব্যোমকেশ, ধরি বন্ধন-হারা ধারা গঙ্গোত্রীর।
বল বীর –
চির – উন্নত মম শির!

আমি সন্ন্যাসী, সুর-সৈনিক,
আমি যুবরাজ, মম রাজবেশ ম্লান গৈরিক।
আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,
আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ!
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,
আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার,
আমি পিণাক-পাণির ডমরু ত্রিশূল, ধর্মরাজের দন্ড,
আমি চক্র ও মহা শঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচন্ড!
আমি ক্ষ্যাপা দুর্বাসা, বিশ্বামিত্র-শিষ্য,
আমি দাবানল-দাহ, দাহন করিব বিশ্ব।
আমি প্রাণ খোলা হাসি উল্লাস, – আমি সৃষ্টি-বৈরী মহাত্রাস,
আমি মহা প্রলয়ের দ্বাদশ রবির রাহু গ্রাস!
আমি কভূ প্রশান্ত কভূ অশান্ত দারুণ স্বেচ্ছাচারী,
আমি অরুণ খুনের তরুণ, আমি বিধির দর্পহারী!
আমি প্রভোন্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহা কল্লোল,
আমি উদ্জ্বল, আমি প্রোজ্জ্জ্বল,
আমি উচ্ছ্বল জল-ছল-ছল, চল-ঊর্মির হিন্দোল-দোল!

আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণু, তন্বী-নয়নে বহ্ণি
আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!
আমি উন্মন মন উদাসীর,
আমি বিধবার বুকে ক্রন্দন-শ্বাস, হা হুতাশ আমি হুতাশীর।
আমি বন্চিত ব্যথা পথবাসী চির গৃহহারা যত পথিকের,
আমি অবমানিতের মরম বেদনা, বিষ – জ্বালা, প্রিয় লান্চিত বুকে গতি ফের
আমি অভিমানী চির ক্ষুব্ধ হিয়ার কাতরতা, ব্যথা সুনিবিড়
চিত চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম প্রকাশ কুমারীর!
আমি গোপন-প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল-ক’রে দেখা অনুখন,
আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তা’র কাঁকন-চুড়ির কন-কন!
আমি চির-শিশু, চির-কিশোর,
আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচড় কাঁচলি নিচোর!
আমি উত্তর-বায়ু মলয়-অনিল উদাস পূরবী হাওয়া,
আমি পথিক-কবির গভীর রাগিণী, বেণু-বীণে গান গাওয়া।
আমি আকুল নিদাঘ-তিয়াসা, আমি রৌদ্র-রুদ্র রবি
আমি মরু-নির্ঝর ঝর ঝর, আমি শ্যামলিমা ছায়া-ছবি!
আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, এ কি উন্মাদ আমি উন্মাদ!
আমি সহসা আমারে চিনেছি, আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!

আমি উথ্থান, আমি পতন, আমি অচেতন-চিতে চেতন,
আমি বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন।
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া
স্বর্গ মর্ত্য-করতলে,
তাজী বোররাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার
হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে!

আমি বসুধা-বক্ষে আগ্নিয়াদ্রি, বাড়ব-বহ্ণি, কালানল,
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি-পাথার-কলরোল-কল-কোলাহল!
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ,
আমি ত্রাস সন্চারি ভুবনে সহসা সন্চারি’ ভূমিকম্প।
ধরি বাসুকির ফণা জাপটি’ –
ধরি স্বর্গীয় দূত জিব্রাইলের আগুনের পাখা সাপটি’।
আমি দেব শিশু, আমি চঞ্চল,
আমি ধৃষ্ট, আমি দাঁত দিয়া ছিঁড়ি বিশ্ব মায়ের অন্চল!
আমি অর্ফিয়াসের বাঁশরী,
মহা- সিন্ধু উতলা ঘুমঘুম
ঘুম চুমু দিয়ে করি নিখিল বিশ্বে নিঝঝুম
মম বাঁশরীর তানে পাশরি’
আমি শ্যামের হাতের বাঁশরী।
আমি রুষে উঠি’ যবে ছুটি মহাকাশ ছাপিয়া,
ভয়ে সপ্ত নরক হাবিয়া দোজখ নিভে নিভে যায় কাঁপিয়া!
আমি বিদ্রোহ-বাহী নিখিল অখিল ব্যাপিয়া!

আমি শ্রাবণ-প্লাবন-বন্যা,
কভু ধরনীরে করি বরণীয়া, কভু বিপুল ধ্বংস-ধন্যা-
আমি ছিনিয়া আনিব বিষ্ণু-বক্ষ হইতে যুগল কন্যা!
আমি অন্যায়, আমি উল্কা, আমি শনি,
আমি ধূমকেতু-জ্বালা, বিষধর কাল-ফণী!
আমি ছিন্নমস্তা চন্ডী, আমি রণদা সর্বনাশী,
আমি জাহান্নামের আগুনে বসিয়া হাসি পুষ্পের হাসি!

আমি মৃন্ময়, আমি চিন্ময়,
আমি অজর অমর অক্ষয়, আমি অব্যয়।
আমি মানব দানব দেবতার ভয়,
বিশ্বের আমি চির-দুর্জয়,
জগদীশ্বর-ঈশ্বর আমি পুরুষোত্তম সত্য,
আমি তাথিয়া তাথিয়া মাথিয়া ফিরি স্বর্গ-পাতাল মর্ত্য!
আমি উন্মাদ, আমি উন্মাদ!!
আমি চিনেছি আমারে, আজিকে আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ!!

আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার
নিঃক্ষত্রিয় করিব বিশ্ব, আনিব শান্তি শান্ত উদার!
আমি হল বলরাম-স্কন্ধে
আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্ব অবহেলে নব সৃষ্টির মহানন্দে।
মহা-বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উত্পীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না –
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।

আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন,
আমি স্রষ্টা-সূদন, শোক-তাপ হানা খেয়ালী বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!
আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দেবো পদ-চিহ্ন!
আমি খেয়ালী-বিধির বক্ষ করিব ভিন্ন!

আমি চির-বিদ্রোহী বীর –
বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত শির!

– কাজী নজরুল ইসলাম

Bidrohee (The Rebel)
(Translation by Kabir Chowdhury)

Say, Valiant,
Say: High is my head!

Looking at my head
Is cast down the great Himalayan peak!
Say, Valiant,
Say: Ripping apart the wide sky of the universe,
Leaving behind the moon, the sun, the planets
and the stars
Piercing the earth and the heavens,
Pushing through Almighty’s sacred seat
Have I risen,
I, the perennial wonder of mother-earth!
The angry God shines on my forehead
Like some royal victory’s gorgeous emblem.

Say, Valiant,
Ever high is my head!
I am irresponsible, cruel and arrogant,
I an the king of the great upheaval,
I am cyclone, I am destruction,
I am the great fear, the curse of the universe.
I have no mercy,
I grind all to pieces.
I am disorderly and lawless,
I trample under my feet all rules and discipline!
I am Durjati, I am the sudden tempest of ultimate summer,
I am the rebel, the rebel-son of mother-earth!

Say, Valiant,
Ever high is my head!
I am the hurricane, I am the cyclone
I destroy all that I found in the path!
I am the dance-intoxicated rhythm,
I dance at my own pleasure,
I am the unfettered joy of life!
I am Hambeer, I am Chhayanata, I am Hindole,
I am ever restless,
I caper and dance as I move!
I do whatever appeals to me, whenever I like,
I embrace the enemy and wrestle with death,
I am mad. I am the tornado!
I am pestilence, the great fear,
I am the death of all reigns of terror,
I am full of a warm restlessness for ever!

Say, Valiant,
Ever high is my head!
I am creation, I am destruction,
I am habitation, I am the grave-yard,
I am the end, the end of night!
I am the son of Indrani
With the moon in my head
And the sun on my temple
In one hand of mine is the tender flute
While in the other I hold the war bugle!
I am the Bedouin, I am the Chengis,
I salute none but me!
I am thunder,
I am Brahma’s sound in the sky and on the earth,
I am the mighty roar of Israfil’s bugle,
I am the great trident of Pinakpani,
I am the staff of the king of truth,
I am the Chakra and the great Shanka,
I am the mighty primordial shout!
I am Bishyamitra’s pupil, Durbasha the furious,
I am the fury of the wild fire,
I burn to ashes this universe!
I am the gay laughter of the generous heart,
I am the enemy of creation, the mighty terror!
I am the eclipse of the twelve suns,
I herald the final destruction!
Sometimes I am quiet and serene,
I am in a frenzy at other times,
I am the new youth of dawn,
I crush under my feet the vain glory of the Almighty!

I am the fury of typhoon,
I am the tumultuous roar of the ocean,
I am ever effluent and bright,
I trippingly flow like the gaily warbling brook.
I am the maiden’s dark glassy hair,
I am the spark of fire in her blazing eyes.
I am the tender love that lies
In the sixteen year old’s heart,
I am the happy beyond measure!
I am the pining soul of the lovesick,
I am the bitter tears in the widow’s heart,
I am the piteous sighs of the unlucky!
I am the pain and sorrow of all homeless sufferers,
i am the anguish of the insulted heart,
I am the burning pain and the madness of the jilted lover!

I am the unutterable grief,
I am the trembling first touch of the virgin,
I am the throbbing tenderness of her first stolen kiss.
I am the fleeting glace of the veiled beloved,
I am her constant surreptitious gaze.
I am the gay gripping young girl’s love,
I am the jingling music of her bangles!
I am the eternal-child, the adolescent of all times,

I am the shy village maiden frightened by her own budding youth.

I am the soothing breeze of the south,
I am the pensive gale of the east.
I am the deep solemn song sung by the wondering bard,
I am the soft music played on his lyre!
I am the harsh unquenched mid-day thirst,
I am the fierce blazing sun,
I am the softly trilling desert spring,
I am the cool shadowy greenery!
Maddened with an intense joy I rush onward,
I am insane! I am insane!
Suddenly I have come to know myself,
All the false barriers have crumbled today!
I am the rising, I am the fall,
I am consciousness in the unconscious soul,
I am the flag of triumph at the gate of the world,
I am the glorious sign of man’s victory,
Clapping my hands in exultation I rush like the hurricane,
Traversing the earth and the sky.
The mighty Borrak is the horse I ride.
It neighs impatiently, drunk with delight!
I am the burning volcano in the bosom of the earth,
I am the wild fire of the woods,
I am Hell’s mad terrific sea of wrath!
I ride on the wings of the lightning with joy and profound,
I scatter misery and fear all around,
I bring earth-quakes on this world!

I am Orpheus’s flute,
I bring sleep to the fevered world,
I make the heaving hells temple in fear and die.
I carry the message of revolt to the earth and the sky!
I am the mighty flood,
Sometimes I make the earth rich and fertile,
At another times I cause colossal damage.
I snatch from Bishnu’s bosom the two girls!
I am injustice, I am the shooting star,
I am Saturn, I am the fire of the comet,
I am the poisonous asp!
I am Chandi the headless, I am ruinous Warlord,
Sitting in the burning pit of Hell
I smile as the innocent flower!

I am the cruel axe of Parsurama,
I shall kill warriors
And bring peace and harmony in the universe!
I shall uproot this miserable earth effortlessly and with ease,
And create a new universe of joy and peace.
Weary of struggles, I, the great rebel,
Shall rest in quiet only when I find
The sky and the air free of the piteous groans of the oppressed.
Only when the battle fields are cleared of jingling bloody sabres
Shall I, weary of struggles, rest in quiet,
I the great rebel.

I am the rebel eternal,
I raise my head beyond this world,
High, ever erect and alone!

– Kazi Nazrul Islam

গান ৭৫ – হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল / Song 75 – Hari Din to Gelo Sandhya Holo (Carry me Across, O Lord)

আজ পাঠকদের জন্যে আমার প্রিয় একটি গান। হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল  বৃহত্তর বাংলার, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের, সবচেয়ে জনপ্রিয় ভক্তিমূলক গানগুলোর মধ্যে একটি। লালনশিষ্য কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের লেখা এই গানটি এক কথায় ঈশ্বরের কাছে পৃথিবীর মোহ হতে মুক্ত কিংবা দুঃখভারে ভেঙ্গে পড়া মানুষের চিরন্তন আর্তি – একূল আর ও কূলের মাঝে যে অসীম সাগর, তা পার করে তাকে পরপারে নেওয়ার। বাংলার লোকসঙ্গীতের মাঝে যে কত গভীর আধ্যাত্মিকতা নিহিত আছে, তার একটি উদাহারণ এই গান।

বাংলা লোকসঙ্গীতের সাথে যারা পরিচিত, তারা হয়তো এই গানটির ঈশ্বরকে মাঝি রূপে কল্পনার সাথে অন্যান্য লোকগানের সাদৃশ্য খুঁজে পাবেন। সেটি আশ্চর্য নয়। নদীমাতৃক বাংলার কবিরা যে মর্ত্য আর পরলোকের সংযোগকারীর উপমা খেয়াঁর মাঝির মাঝে খুঁজে পাবেন, তাই তো হওয়ার কথা।

যারা গান শুনতে ভালবাসেন, তাদের জন্যে আরতি মুখোপাধ্যায়ের গলায় গানটির একটি ইউটিউব সংস্করণ নিচে তুলে দিলাম।

Today, a heartfelt song of faith – one that you must have heard if you are a Bangalee on the western side of the border, or a listener of Bangla folk music on the eastern side. Written by Kangal Harinath Majumdar, Hari Din to Gelo (Carry me Across, O Lord) is a soulful call to God by a seeker who is in the twilight of his/her life. Weary of the world on this shore, (s)he wishes to cross over to the other side – a realm truer and more profound than holy texts can convey. But lacking the piety that would allow him/her to cross the waters, the seeker can only appeal keeping fatih in God’s mercy – something that is beautifully expressed in this song.

If you are familiar with Bangla devotional songs, you should find Hari Din to Gelo to be a classic Bangalee representation of God as a boatman. It should not be surprising – Bangla, after all, is a land crisscrossed by a thousand rivers. Who else could carry us away from that we want to leave, but a boatman?

হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল

হরি দিন তো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !
তুমি পারের কর্তা শুনে বার্তা
ডাকি হে তোমারে ।
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

আমি আগে এসে
ঘাটে রইলাম বসে –
ওহে – আমায় কি পার করবেনা হে ?
আমায় কি পার করবেনা হে ?
আমি অধম বলে –
যারা পাছে এল আগে গেল
আমি রইলাম পড়ে !
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

শুনি কড়ি নাই যার
তুমি তারেও কর পার !
আমি সেই কথা শুনে ঘাটে এলাম হে
সেই কথা শুনে ঘাটে এলাম হে
কড়ি নাই যার
তুমি তারেও কর পার !
আমি দিন ভিখারি নাইকো কড়ি
দেখ ঝুলি ঝেড়ে !
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

আমার পারের সম্বল
দয়াল নামটি কেবল !
তাই দয়াময় বলে ডাকি তোমায় হে
অধম তারণ বলে ডাকি তোমায় হে
পারের সম্বল
দয়াল নামটি কেবল !
ফিকির কেদে আকুল
পড়ে অকুল পাথারে সাঁতারে !

হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !
তুমি পারের কর্তা শুনে বার্তা
ডাকি হে তোমারে ।
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল
পার কর আমারে !

– কাঙাল হরিনাথ মজুমদার

গান ৭৪ – বাড়ির কাছে আরশিনগর / Song 74 – Barir Kachhe Aarshinagar (City of Mirrors)

আজকের ভণিতার বিষয়টুকু বেশ জটিল। একই তত্ত্বের সাধক বা একই পথের যাত্রী যারা, তাদের মধ্যে যে বন্ধুত্ব কিংবা রেষারেষি থাকবে, তা আশ্চর্য নয়, কিন্তু সম্পর্কটি যদি নারী ও পুরুষের মাঝে হয়? বিপরীত লিঙ্গের মধ্যেকার সহজাত আকর্ষণটুকু কি সেই সাধনা বা যাত্রাটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়, নাকি সেগুলোর অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়?

প্রশ্নগুলো করছি কারণ বাউলসম্রাট লালন সাঁইয়ের বাড়ির কাছে আরশিনগর  কবিতাটি পড়তে গিয়ে সেগুলো মনে এলো। বাউলদের আমরা সাধক বলে জানি, কিন্তু তাঁরা যে মানবিক প্রবৃত্তির প্রভাবগুলো হতে পুরোপুরি মুক্ত, তা কি সত্যি? লালন সাঁইয়ের ভাষায় –

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত, দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁকে রে।।

হয়তো আমাদের কেউই পুরোপুরি মুক্ত নই, কিংবা আমিই হয়তো আধ্যাত্মিক মিলনের আকাঙ্খাকে সাধারণ মানুষের আসক্তি ভেবে ভুল করছি। যাই হোক, ক্ষুদ্র মনের অনুধাবনের বাইরের প্রশ্নগুলি বাউলসম্রাটের কবিতাটিসহ পাঠকদের চিন্তার খোরাক যোগাবে, এই আশায় তুলে দিলাম।

A few questions for my readers today: In our pursuits of divine truths or higher goals, how do our relationships with fellow pursuers of the opposite gender matter? Does the sexuality that is entwined with gender intensify the camaraderie (or competition) between travelers on the same path? And does it influence, or perhaps taint, the very pursuit itself?

I write the questions because reading Lalon Sain’s Barir Kachhe Aarshinagar (City of Mirrors) made me think of those. Quoting from the source of the translation:

Bauls hold women in high esteem. They are essential to the male practitioner’s success in sadhana. This is one of Lalon’s many songs that secretly refer to the sadhika (female practitioner) or to the sahaj manus (natural person) within her.

Yet to me, the explanation seems to merely be a summarization of something more profound. Perhaps you know what I mean? The questions asked are far from simple, and a discussion of those require more than a blog post, and more than a knowledge of literature. So let me leave those for your weekend tea-parties – you will need more than a cup, I am sure :).

A translation of the poem by the Bangla scholar, Dr. Carol Salomon, is provided below.

বাড়ির কাছে আরশিনগর

বাড়ির কাছে আরশিনগর
সেথা এক পড়শি বসত করে।
আমি একদিন না দেখিলাম তারে।।
গিরাম বেড়ে অগাধ পানি
ও তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে
মনে বাঞ্ছা করি দেখব তারে
কেমনে সে গাঁয় যাই রে।।
বলবো কী সেই পড়শির কথা
ও তার হস্তপদ স্কন্ধমাথা, নাই রে
ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর
ক্ষণেক ভাসে নীরে।।
পড়শি যদি আমায় ছুঁতো
যম যাতনা সকল যেত, দূরে
সে আর লালন একখানে রয়
তবু লক্ষ যোজন ফাঁকে রে।।

– লালন সাঁই

Barir Kachhe Aarshinagar (The City of Mirrors)
(Translated by Carol Salomon)

I have not seen her even once–
my neighbor
who lives in the city of mirrors
near my house.
Her village is surrounded
by deep boundless waters,
and I have no boat
to cross over.
I long to see her,
but how can I reach
her village?
What can I say
about my neighbor?
She has no hands, no feet,
no shoulders, no head.
Sometimes she floats high up in the sky,
sometimes in the water.
If my neighbor only touched me,
she would send the pain of death away.
She and Lalon are in the same place,
yet five hundred thousand miles apart.

– Lalon Sain

কবিতা ৭০ – স্তব্ধতা উচ্ছ্বসি উঠে / Poem 70 – Stabdhota Uchchhwashi Uthe (Stillness Surges Up)

Rabindranath Thakur-Stabdhota Uchchhwashi Othe 1

আজ রবিঠাকুরের একটি অণুকাব্য। স্তব্ধতা উচ্ছ্বসি উঠে কবি লিখেছিলেন প্রকৃতির সর্বোচ্চ ও গভীরতমের মাঝে দুটি গুণের বিকাশ দেখতে পেয়ে। পর্বতের অগম্য উচ্চতার মধ্যে স্তব্ধতার উৎকর্ষলাভ, আর সরোবরের অতল গভীরতার মাঝে গতিবেগের আত্মোপলোব্ধি – কবিগুরু কি অবলীলায়ই না দৃশ্যমানের মাঝে প্রতীকি অর্থ খুঁজে পেতেন! রবিঠাকুরকে বুঝতে যাওয়ার স্পর্ধা আমাদের নেই, তবে কবিতাগুলো পড়ে ভাল লাগে, এই যা।

তবে কখনো কখনো ইন্টারনেটের কল্যাণে দু-একটি ছবি খুঁজে পাই, যা কবিগুরুর লেখাগুলোকে অপূর্বভাবে দৃশ্যমান করে তুলে। আমার চোখে উপরের ছবিটি তেমনই একটি, তাই পাঠকদেরও আমার মতো সেটি ভাল লাগবে, সেই আশায় তুলে দিলাম।

Today, a verse by Rabindranath Thakur – on the qualities that manifest in nature. It never ceases to amaze me how the sage associated abstractions around us with tangible things in nature. Taken apart, stillness that engulfs and mountains which surge up can appear unrelated. After reading the poem, however, one wonders whether they are anything but one. Greater minds have identified Thakur as one of the greatest intellects in modern history – to that, I can only nod without understanding. His simpler metaphors, however, come to me, and just that alone leaves me happy and glad.

Sometimes, while reading Thakur’s poems, the mind seeks a window to look out of and find what the lines remind it of. But such windows are almost never there. In this digital age, however, we have search engines, and a lucky search or two yields a picture that just captures the essence of the poem. I think Thakur would appreciate.

স্তব্ধতা উচ্ছ্বসি উঠে

স্তব্ধতা উচ্ছ্বসি উঠে গিরিশৃঙ্গরূপে,
ঊর্ধ্বে খোঁজে আপন মহিমা।
গতিবেগ সরোবরে থেমে চায় চুপে
গভীরে খুঁজিতে নিজ সীমা।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ হতে সংগ্রহীত)

Stabdhota Uchchhwashi Uthe (Stillness Surges Up)
(Translation by the Poet Himself)

In the mountain, stillness surges up
to explore its own height;
in the lake, movement stands still
to contemplate its own depth.

– Rabindranath Thakur (Collected from Sphulinga/Fireflies)

কবিতা ৫৪ – প্রশ্নের অতীত / Poem 54 – Proshner Ateet (Questions and Silence)

Rabindranath Thakur-Proshner Ateet

আজ অনন্ত প্রশ্নের জবাবে অনন্ত নীরবতা নিয়ে একটি অণুকাব্য – প্রশ্নের অতীত – রবিঠাকুরের কলমে।

On questions and silences, a beautiful metaphor by Rabindranath Thakur.

প্রশ্নের অতীত (Questions and Silence)

  হে সমুদ্র, চিরকাল কী তোমার ভাষা
সমুদ্র কহিল, মোর অনন্ত জিজ্ঞাসা।
কিসের স্তব্ধতা তব ওগো গিরিবর?
হিমাদ্রি কহিল, মোর চির-নিরুত্তর।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (কণিকা হতে সংগ্রহীত)

“What language is thine o sea?”
“The language of eternal question.”
“What language is thine, o sky?”
“The language of eternal silence.”

– Rabindranath Thakur (Collected from Stray Birds)

 

কবিতা ৩৩ – লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে / Poem 33 – Lekhan Amar Mlano Hoye Ashe (The Closing Words That Fade)

Rabindranath Thakur-Lekhan Amar (2)

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে ক্যান্ডেস জেম্‌স এর ওয়েব পাতায় / Original of the edited photo taken from candacejames.com)

আজ রবিঠাকুরের একটি কবিতা। জীবনে যেসব মানুষের প্রতি বলতে চাওয়া কিছু কথা চিরকাল অব্যক্ত থেকে যাবে, তাদের মনে রেখে।

On this day, a poem by Rabindranath Thakur – meant for the people in our lives whom we never get to tell how we feel for them. A poor attempt at translation follows.

লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে

লেখন আমার ম্লান হয়ে আসে
অক্ষরে
এখন গোপনে ফুটিয়া উঠিছে,
অন্তরে।

অনাহত বাণী মনে তুলে নিয়ে
রেখো তারে তব স্মরণে
স্থায়ী হয়ে যাবে যখন সে বাণী
তরিয়া যাইবে মরণে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ – অপ্রচলিত সংগ্রহ)

Lekhan Amar Mlan Hoye Ashe (The Closing Words That Fade)

The closing words that fade
with the dying ink
Today etch themselves
unfadingly on the heart.

Friend, those unwritten lines
keep alive in your memory.
For in the stasis of writing
the song
would only meet its end.

– Rabindranath Thakur (Sphulinga – Apracholito Sangraha)

কবিতাগুচ্ছ ১১ – রবীন্দ্র অণুকাব্য (লেখন) / Anthology 11 – Rabindra Anukabya (Lekhan) (Epigrams and Verses by Rabindranath Thakur)

‘রবীন্দ্রনাথ’ শব্দটি শুনলেই আমাদের অনেকেই গুরুগম্ভীর সাহিত্যের কথা ভাবি। অথচ কবিগুরু যে কত ছোট ছোট অথচ গভীর অর্থপূর্ণ কাব্য রচনা করেছেন, তা আমাদের অনেকেই খেয়ালে রাখিনা। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা হয়ত আজ সেসব অনুকাব্যগুলোকে নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তোলে, তাই রবিঠাকুরের কিছু অনুকাব্য নিয়ে এই পোস্ট। অন্যসব পোস্টগুলোর চাইতে এটি একটু আলাদা, কারণ এটি স্থির নয়, অন্য পোস্টগুলোতে লেখা তোলার ফাঁকে ফাঁকে এটিতে আমি নতুন নতুন কবিতা তুলব, কখনো কখনো অনুবাদ আর কখনো কখনো ছবি সহ। কবিগুরুর হাতের লেখাও কিছু থাকবে এতে। পাঠকদের কাছে এই প্রয়াসটুকু ভাল লাগবে আশা করি।

The word ‘Rabindranath’ often makes many a Bangalee think about serious literature – not unreasonably, as many of his works make for more than heavy reading. However, such thought perhaps arises because many of us Bangalee millennials remain unaware of the short verses and epigrams which he wrote. Delightful and profound in their own right, they are perhaps even more relevant in our time constrained modern life. Hence this post. This one is a little different from the other ones, as I plan to periodically add fresh works by the poet to it, with occasional translations and somewhat relevant images. I hope the readers will find my effort worth their time.

লেখন  হতে তুলে দেওয়া কিছু অনুকাব্য / Some Verses from Lekhan

“এই লেখনগুলি সুরু হয়েছিল চীনে জাপানে। পাখায় কাগজে রুমালে কিছু লিখে দেবার জন্যে লোকের অনুরোধে এর উৎপত্তি। তারপরে স্বদেশে ও অন্য দেশেও তাগিদ পেয়েছি। এমনি করে এই টুকরো লেখাগুলি জমে উঠ্‌ল। এর প্রধান মূল্য হাতের অক্ষরে ব্যক্তিগত পরিচয়ের। সে পরিচয় কেবল অক্ষরে কেন, দ্রুতলিখিত ভাবের মধ্যেও ধরা পড়ে… অন্যমনস্কতায় কাটাকুটি ভুলচুক ঘটেছে। সে সব ত্রুটিতেও ব্যক্তিগত পরিচয়েরই আভাস রয়ে গেল॥

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (হাঙ্গেরী, ১৯২৬)

“The lines in the following pages had their origin in China and Japan where the author was asked for his writings on fans or pieces of silk.”

Rabindranath Thakur (Hungary, 1926)

(১/1)

Rabindranath Thakur-Fireflies (2)

স্বপ্ন আমার জোনাকি ,
দীপ্ত প্রাণের মণিকা ,
স্তব্ধ আঁধার নিশীথে
উড়িছে আলোর কণিকা ॥

My fancies are fireflies
specks of living light—
twinkling in the dark.

(Translated by the poet himself)

(২/2)

আমার লিখন ফুটে পথধারে
ক্ষণিক কালের ফুলে ,
চলিতে চলিতে দেখে যারা তারে
চলিতে চলিতে ভুলে ॥

The same voice murmurs
in these desultory lines
which is born in wayside pansies
letting hasty glances pass by.

(Translated by the poet himself)

(৩/3)

Rabindranath Thakur-Projapoti (2)

প্রজাপতি সেতো বরষ না গণে ,
নিমেষ গণিয়া বাঁচে ,
সময় তাহার যথেষ্ট তাই আছে ॥

The butterfly does not count years
but moments
and therefore has enough time.

(Translated by the poet himself)

(১৩/13)

দুঃখের আগুন কোন্ জ্যোতির্ময় পথরেখা টানে
বেদনার পরপার পানে॥

The fire of pain traces for my soul
a luminous path across her sorrow.

(Translated by the poet himself)

(১৪/14)

দেবমন্দির-আঙিনাতলে শিশুরা করেছে মেলা।
দেবতা ভোলেন পূজারি-দলে, দেখেন শিশুর খেলা॥

From the solemn gloom of the temple
children run out to sit in the dust,
God watches them play and forgets the priest.

(Translated by the poet himself)

(১৬/16)

Rabindranath Thakur-Akash Dharare

আকাশ ধরারে বাহুতে বেড়িয়া রাখে,
তবুও আপনি অসীম সুদূরে থাকে॥

Though he holds in his arms the earth-bride,
the sky is ever immensely away.

(Translated by the poet himself)

(১৭/17)

Rabindranath Thakur-Dur Eshechhilo Kachhe

          দূর এসেছিল কাছে–
ফুরাইলে দিন, দূরে চলে গিয়ে আরো সে নিকটে আছে।

One who was distant came near to me in the morning,
and still nearer when taken away by night.

(Translated by the poet himself)

(২০/20)

দাঁড়ায়ে গিরি, শির
মেঘে তুলে,
দেখে না সরসীর
বিনতি।
অচল উদাসীর
পদমূলে
ব্যাকুল রূপসীর
মিনতি॥

The lake lies low by the hill,
a tearful entreaty of love
at the foot of the inflexible.

(Translated by the poet himself)

(২২/22)

Rabindranath Thakur-Giri Megh (2)

মেঘ সে বাষ্পগিরি,
গিরি সে বাষ্পমেঘ,
কালের স্বপ্নে যুগে যুগে ফিরি ফিরি
এ কিসের ভাবাবেগ॥

Clouds are hills in vapour,
hills are clouds in stone
– a phantasy of time’s dream.

(Translated by the poet himself)

(২৫/25)

Rabindranath Thakur-Dui Tire Tar

দুই তীরে তার বিরহ ঘটায়ে
সমুদ্র করে দান
অতল প্রেমের অশ্রুজলের গান॥

The two separated shores mingle their voices
in a song of unfathomed tears.

(Translated by the poet himself)

(৩০/30)

হে আমার ফুল, ভোগী মূর্খের মালে
না হ’ক তোমার গতি,
এই জেনো তব নবীন প্রভাতকালে
আশিস তোমার প্রতি॥

(৩৬/36)

Rabindranath Thakur-Matir Prodip (2)

মাটির প্রদীপ সারা দিবসের অবহেলা লয় মেনে,
রাত্রে শিখার চুম্বন পাবে জেনে॥

The lamp waits through the long day of neglect,
For the flame’s kiss in the night.

(Translated by the poet himself)

(৫৯/59)

Rabindranath Thakur-Kuasha Giri (1)

কুয়াশা যদি বা ফেলে পরাভবে ঘিরি
তবু নিজমহিমায় অবিচল গিরি॥

The mountain remains unmoved
by its seeming defeat by the mist.

(Translated by the poet himself)

(৬০/60)

Rabindranath Thakur-Parbatamala (2)

পর্বতমালা আকাশের পানে চাহিয়া না কহে কথা,
অগমের লাগি ওরা ধরণীর স্তম্ভিত ব্যাকুলতা॥

Hills are the earth’s gesture of despair
for the unreachable.

(Translated by the poet himself)

(৬১/61)

একদিন ফুল দিয়েছিলে , হায় ,
কাঁটা বিঁধে গেছে তার ।
তবু , সুন্দর , হাসিয়া তোমায়
করিনু নমস্কার ॥

Though the thorn in thy flower pricked me,
O Beauty,
I am grateful.

(Translated by the poet himself)

(৬২/62)

হে বন্ধু , জেনো মোর ভালোবাসা ,
কোনো দায় নাহি তার —
আপনি সে পায় আপন পুরস্কার ॥

Let not my love be a burden on you, my friend,
know that it pays itself.

(Translated by the poet himself)

(৬৩/63)

স্বল্প সেও স্বল্প নয়, বড়োকে ফেলে ছেয়ে।
দু-চারিজন অনেক বেশি বহুজনের চেয়ে॥

The world knows that the few
are more than the many.

(Translated by the poet himself)

(৬৬/66)

Rabindranath Thakur-Budbud (2)

বুদ্বুদ  সে তো বদ্ধ আপন ঘেরে
শূন্যে মিলায়, জানে না সমুদ্রেরে॥

In its swelling pride
the bubble doubts the truth of the sea,
and laughs and bursts into emptiness.

(Translated by the poet himself)

(৬৮/68)

Rabindranath Thakur-Megher Dal

মেঘের দল বিলাপ করে
আঁধার হল দেখে ,
ভুলেছে বুঝি নিজেই তারা
সূর্য দিল ঢেকে ॥

My clouds, sorrowing in the dark,
forget that they themselves
have hidden the sun.

(Translated by the poet himself)

(৭১/71)

Rabindranath Thakur-Asim Akash (1)

অসীম আকাশ শূন্য প্রসারি রাখে,
হোথায় পৃথিবী মনে মনে তার
অমরার ছবি আঁকে॥

The sky remains infinitely vacant
for earth there to build its heaven with dreams.

(Translated by the poet himself)

(৭৫/75)

আকর্ষণগুণে প্রেম এক ক’রে তোলে।
শক্তি শুধু বেঁধে রাখে শিকলে শিকলে॥

Power said to the world, “You are mine.
The world kept it prisoner on her throne.
Love said to the world, “I am thine.”
The world gave it the freedom of her house.

(Inferred translation by the poet himself)

(৭৬/76)

Rabindranath Thakur-Mahataru Bahe (2)

মহাতরু বহে
বহু বরষের ভার।
যেন সে বিরাট
এক মুহূর্ত তার॥

The tree bears its thousand years
as one large majestic moment.

(Translated by the poet himself)

(৮০/80)

স্তব্ধ অতল শব্দবিহীন মহাসমুদ্রতলে
বিশ্ব ফেনার পুঞ্জ সদাই ভাঙিয়া জুড়িয়া চলে॥

The world is the ever-changing foam
that floats on the surface of a sea of silence.

(Translated by the poet himself))

(৮২/82)

গোঁয়ার কেবল গায়ের জোরেই বাঁকাইয়া দেয় চাবি,
শেষকালে তার কুড়াল ধরিয়া করে মহা দাবাদাবি॥

The clumsiness of power spoils the key
and uses the pickaxe.

(Translated by the poet himself)

(৮৬/86)

Rabindranath Thakur-Mor Kagojer Khelar Nouka 2

মোর কাগজের খেলার নৌকা ভেসে চলে যায় সোজা
বহিয়া আমার অকাজ দিনের অলস বেলার বোঝা॥

These paper boats of mine are meant to dance
on the ripple of hours,
and not to reach any destination.

(Translated by the poet himself)

(৯৬/96)

Rabindranath Thakur-Shishir Rabire (1)

শিশির রবিরে শুধু জানে
বিন্দুরূপে আপন বুকের মাঝখানে॥

The dew-drop knows the sun
only within its own tiny orb.

(Translated by the poet himself)

(৯৭/97)

Rabindranath Thakur-Apon Asim Nishfalatar 1

আপন অসীম নিষ্ফলতার পাকে
মরু চিরদিন বন্দী হইয়া থাকে॥

The desert is imprisoned in the wall
of its unbounded barrenness.

(Translated by the poet himself)

(১২২/122)

???????????????????????????????

সাগরের কানে জোয়ার-বেলায়
ধীরে কয় তটভূমি,
“তরঙ্গ তব যা বলিতে চায়
তাই লিখে দাও তুমি।’

সাগর ব্যাকুল ফেন-অক্ষরে
যতবার লেখে লেখা
চির-চঞ্চল অতৃপ্তিভরে
ততবার মোছে রেখা ॥

The shore whispers to the sea:
“Write to me what thy waves struggle to say.”
The sea writes in foam again and again
and wipes off the lines in a boisterous despair.

(Translated by the poet himself)

(১৩৪/134)

Rabindranath Thakur-Jibon Khatar Anek Patai

জীবন-খাতার অনেক পাতাই
এমনিতরো শূন্য থাকে;
আপন মনের ধেয়ান দিয়ে
পূর্ণ করে লও না তাকে।
সেথায় তোমার গোপন কবি
রচুক আপন স্বর্গছবি,
পরশ করুক দৈববাণী
সেথায় তোমার কল্পনাকে॥

(১৫৭/157)

Rabindranath Thakur-Chand Kahe (1)

চাঁদ কহে “শোন্‌ শুকতারা,
রজনী যখন হল সারা
যাবার বেলায় কেন শেষে
দেখা দিতে হায় এলি হেসে,
আলো আঁধারের মাঝে এসে
করিলি আমায় দিশেহারা।”

Before he sets,
the Moon yearningly calls out
to the Morning Star
“Why, at this moment of parting,
Did thee bind me
with thy smile?”

(১৫৯/159)

Rabindranath Thakur-Bhebechhinu Goni Goni Labo (1)

ভেবেছিনু গনি গনি লব সব তারা —
গনিতে গনিতে রাত হয়ে যায় সারা ,
বাছিতে বাছিতে কিছু না পাইনু বেছে ।
আজ বুঝিলাম , যদি না চাহিয়া চাই
তবেই তো একসাথে সব-কিছু পাই —
সিন্ধুরে তাকায়ে দেখো , মরিয়ো না সেঁচে ॥

I had once sought to count all the stars
but the night sky swirled into the dawn
past my never-ending counts
leaving my designs fruitless in her wake.
I wish I had realized then
that her stars had all been mine alone
to own with a single, wondering gaze,
but like a fool, I had picked and sorted.
Know not to do the same, my friend.

(১৬৮/168)

আকাশ কভু পাতে না ফাঁদ
কাড়িয়ে নিতে চাঁদে,
বিনা বাঁধনে তাই তো চাঁদ,
নিজেরে নিজে বাঁধে।

(১৭৪/174)

Rabindranath Thakur-Andhar Ekere Dekhe 1

আঁধার একেরে দেখে একাকার ক’রে।
আলোক একেরে দেখে নানা দিক ধ’রে॥

Darkness smothers the one into uniformity
Light reveals the one in its multifariousness.

(Translated by the poet himself)

কবিতা ৬ – কুয়াশার আক্ষেপ / Poem 6 – Kuashar Akkhep (Regret of The Mist)

বেশ কিছুদিন ধরেই রবীন্দ্রনাথের ছোট কবিতাগুলোয় ডুবে আছি। খুব একটা গভীরভাবে বুঝছি বললে বেশি বলা হবে, তবে লেখাগুলোর যেটুকু অনুভবের মধ্যে, তার অনেকটুকুই মনে দাগ কাটে। তাই সেরকম একটি কবিতা তুলে দিলাম, যা মানুষের নাগালের মধ্যেকার আদর আর দূরের ভালবাসার গভীরতার তফাৎ নিয়ে লেখা।

Lately, I have been reading quite a few of Rabindranath’s poems. Not that I understand much, but once in a while, I come across a piece that really resonates within me. Here is one such poem, Regret of The Mist, which differentiates between the love of the people near us with that of those who love from far.

কুয়াশার আক্ষেপ

“কুয়াশা, নিকটে থাকি, তাই হেলা মোরে–
মেঘ ভায়া দূরে রন, থাকেন গুমরে!’
কবি কুয়াশারে কয়, শুধু তাই না কি?
মেঘ দেয় বৃষ্টিধারা, তুমি দাও ফাঁকি।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (কণিকা হতে সংগ্রহীত)

কবিতা ৫ – অদৃশ্য কারণ / Poem 5 – Adrishya Karan (The Invisible Cause)

Rabindranath Thakur-Adrishya Karan (1)

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে ড্যানিয়েল ট্রিমের ফ্লিকার পাতায় /Original Taken from Daniel Trim’s Flickr Page)

আজ আমার সবচেয়ে প্রিয় কবিতাগুলোর মধ্যে একটি। রবিঠাকুরের এই লেখাটি এতই সুন্দর ও স্বচ্ছ, যে কবিতাটির ভাষার চাইতে সরল করে কোন ভূমিকা লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই আর ভণিতা না করে কবিতাটি তুলে দিলাম –

অদৃশ্য কারণ

রজনী গোপনে বনে ডালপালা ভ’রে
কুঁড়িগুলি ফুটাইয়া নিজে যায় স’রে।
ফুল জাগি বলে, মোরা প্রভাতের ফুল–
মুখর প্রভাত বলে, নাহি তাহে ভুল।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (কণিকা)

This time, one of my favorite poems. In The Invisible Cause, Rabindranath Thakur points out how the one who does and the one who claims the glory for the act often turn out to be very different persons. A translation by the sage, followed by a cruder one from yours truly, follows:

The Invisible Cause

(Version 1 – Translated by the poet himself)

The night opens the flowers in secret and allows the day to get thanks.

(Version 2)

The Night silently kisses the flowers into bloom before leaving,
After which they awake and sing, “We are children of the light.”.
The proud Dawn says, “Indeed.”.

– Rabindranath Thakur (Kanika)

কবিতা ১ –  একটি শিশির বিন্দু / Poem 1 – Ekti Shishir Bindu (A Glistening Drop of Dew)

এবার এমন একটা কবিতা, যা বাঙ্গালীমাত্রেরই জীবনে অন্তত একবার হলেও শুনে থাকার কথা। মজার ব্যাপার হল, এই কবিতাটার সাথে দুটো বিখ্যাত নাম জড়িত – সত্যজিৎ রায় যখন ছোট্ট থাকতে শান্তিনিকেতন গিয়েছিলেন, তখন রবিঠাকুর “এটার মানে ও আরেকটু বড় হলে বুঝবে” বলে এই কবিতাটা লিখে দিয়েছিলেন তাকে। সত্যজিৎ রায়ের স্মৃতিচারণায় –

Rabindranath Thakur-Ekti Dhaner Shisher Upore Original

কবিতাটি ছাপার অক্ষরে এই –

বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (স্ফুলিঙ্গ হতে সংগ্রহীত)

যারা কবিতাটির পংক্তিগুলোর মাঝে প্রকৃতিকে খুঁজে পান, তাদের জন্যে শান্তনু বিশ্বাসের ফ্লিকার পৃষ্ঠা হতে সম্পাদিত একটি ছবি তুলে দিলাম।

Rabindranath Thakur-Ekti Dhaner Shisher Upore 2

(সম্পাদিত প্রতিরুপটির আদি ছবিটি পাওয়া যাবে শান্তনু বিশ্বাসের ফ্লিকার পৃষ্ঠায় / The original of this edited photo was taken from Shantanu Bishwas’s Flickr page.)

Another change, this time, in the form of a poem that I feel every Bangalee must know by heart. Written by Rabindranath Thakur, the poem is not only significant for its meaning, but also historical because Thakur wrote the poem and gifted it to a young Satyajit Ray, who would go on to become one of the greatest movie directors in history. In English (translation not mine), it reads something like:

I travelled miles, for many a year,
Spent a lot in lands afar,
I’ve gone to see the mountains, the oceans I’ve been to view.
But I haven’t seen with these eyes
What two steps from my home lies
On a sheaf of paddy grain, a glistening drop of dew.

– Rabindranath Thakur (Collected from Sphulinga)