কবিতা ৫২ – সোনার তরী / Poem 52 – Sonar Tori (The Golden Boat)

rabindranath-thakur-sonar-tori

একটি কবিতার অর্থ কবির একান্তই নিজের থাকে ততক্ষণই, যতক্ষণ সেটি একান্তই তার মনে ভাবনা হয়ে কিংবা অন্যের অগোচরে লেখা হয়ে রয়। যেই মুহূর্তে পৃথিবীর কাছে সেটি উন্মুক্ত হয়ে যায়, সেই মালিকানাটুকু যায় হারিয়ে, আর পাঠকের মনের প্রতিফলনের সাথে মিশে গিয়ে কবিতার আদি অর্থটুকু এক একটি হৃদয়ে এক একটি নতুন রূপ লাভ করে। আর সেইসব অর্থের ভীড়ে কবির মনের কথাটুকু হয়তো হারিয়েই যায়, আমরা কি তা জানতে পারি কখনো?

এই অনাবশ্যক ভণিতাটুকুর কারণ এই, যে রবিঠাকুরের সোনার তরী  নিয়ে কিছুদিন আগে এক বন্ধুর সাথে খানিকটা আলোচনা হয়েছিল। বন্ধুর মতে, কবিতাটি সমাজ কেমন করে একজন মানুষের অবদানটুকু গ্রহণ করে তাকে শূন্য করে ফেলে রেখে যায়, তা নিয়ে। মানুষের মাঝে মহীরুহসম রবীন্দ্রনাথ যে একাকীত্ব থেকে তেমনটা অনুভব করে লিখবেন, তা অস্বাভাবিক নয়। আমার অবশ্য কবিতাটির আক্ষরিক অর্থ করতে ইচ্ছে করে… এমন সুন্দর এই কবিতাটির মাঝে নিজের প্রতিবিম্ব খুঁজতে চাওয়াটুকু কি খুব দোষের।

Although he writes his poems on his own, the poet holds ownership of the meaning only as long as the lines are kept away from the reader. The moment his work is read, that ownership is lost to others, who reflect themselves onto the lines to create new meanings without ever realizing what the poet had wanted to say. But then again, perhaps it is those inherent mutations which makes this world so rich with meaning… as a reader, do you feel the same way?

A few days ago, I was talking with a friend when our conversation meandered to Rabindranath Thakur’s Sonar Tori (The Golden Boat). My friend was of the opinion that the poem speaks of how society gladly accepts the contributions of man, but seldom the man who has emptied himself for her sake. Perhaps Rabindranath, the titan that he was among men, felt the loneliness that my friend inferred in his lines; after all, it was the sage himself who wrote –

The grass seeks her crowd in the earth
The tree seeks his solitude of the sky.
(Collected from Stray Birds)

Given my penchant for literal interpretations, however, I read the poem very differently – it is hard not to, when the interpretation falls so in line with feelings at this end.

English translations, the first by the Kabiguru himself, and a second by the eminent Bangla scholar William Radice, are included below.

সোনার তরী

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

      একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা–
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।

      গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে–
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।

ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।

      যত চাও তত লও তরণী-‘পরে।
আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে–
এখন আমারে লহ করুণা করে।

      ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই– ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি–
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (সোনার তরী  হতে সংগ্রহীত)

Sonar Tori (The Golden Boat)
(Version 1: Translated by the poet himself, taken from The Fugitive)

The rain fell fast. The river rushed and hissed. It licked up and swallowed the island, while I waited alone on the lessening bank with my sheaves of corn in a heap.

From the shadows of the opposite shore the boat crosses with a woman at the helm.
I cry to her, ‘Come to my island coiled round with hungry water, and take away my year’s harvest.’

She comes, and takes all that I have to the last grain; I ask her to take me.
But she says, ‘No’-the boat is laden with my gift and no room is left for me.

(Version 2: Translated by William Radice)

Clouds rumbling in the sky; teeming rain.
I sit on the river bank, sad and alone.
The sheaves lie gathered, harvest has ended,
The river is swollen and fierce in its flow.
As we cut the paddy it started to rain.

One small paddy-field, no one but me –
Flood-waters twisting and swirling everywhere.
Trees on the far bank; smear shadows like ink
On a village painted on deep morning grey.
On this side a paddy-field, no one but me.

Who is this, steering close to the shore
Singing? I feel that she is someone I know.
The sails are filled wide, she gazes ahead,
Waves break helplessly against the boat each side.
I watch and feel I have seen her face before.

Oh to what foreign land do you sail?
Come to the bank and moor your boat for a while.
Go where you want to, give where you care to,
But come to the bank a moment, show your smile –
Take away my golden paddy when you sail.

Take it, take as much as you can load.
Is there more? No, none, I have put it aboard.
My intense labour here by the river –
I have parted with it all, layer upon layer;
Now take me as well, be kind, take me aboard.

No room, no room, the boat is too small.
Loaded with my gold paddy, the boat is full.
Across the rain-sky clouds heave to and fro,
On the bare river-bank, I remain alone –
What had has gone: the golden boat took all.

– Rabindranath Thakur

Advertisements

কবিতা ৫১ – তোমার ন্যায়ের দন্ড / Poem 51 – Tomar Nyayer Dando (Your Mace of Justice)

Rabindranath Thakur-Tomar Nyayer Dando 1

শান্তিপ্রিয়তার অজুহাতে ভাল আর খারাপের মধ্যবর্তী পথ বেছে নেওয়াটাই যেখানে আজ আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলার বর্তমান পরিস্থিতিকে মনে রেখে আজ তাকে উদ্দেশ্য করে একটি কবিতা। এড়িয়ে যেতে যেতে ন্যায় আর অন্যায়ের পার্থক্যটুকু আমরা ভুলে গেছি অনেক আগেই, তবু পাছে কারো তা মনে পড়ে, আর সঠিক পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তাঁর একটি সংকল্পের প্রয়োজন হয়, সেজন্যেতোমার ন্যায়ের দন্ড – রবিঠাকুরের কলমে।

When society takes the convenient middle-path between the right and the wrong for too long, that only fosters some of its ills all-consuming forms. If you are a Bangalee, you will perhaps know what I speak of. And if you do, and if you have ever hesitated on choosing sides despite that realization, here is a resolution – beautifully written by Thakur – to keep in your heart. A crude translation inspired by a (cited) source is included below.

তোমার ন্যায়ের দন্ড

তোমার ন্যায়ের দন্ড প্রত্যেকের করে
অর্পণ করেছ নিজে। প্রত্যেকের ‘পরে
দিয়েছ শাসনভার হে রাজাধিরাজ।
সে গুরু সম্মান তব সে দুরূহ কাজ
নমিয়া তোমারে যেন শিরোধার্য করি
সবিনয়ে। তব কার্যে যেন নাহি ডরি
কভু কারে। ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা,
হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা
তোমার আদেশে। যেন রসনায় মম
সত্যবাক্য ঝলি উঠে খরখড়গসম
তোমার ইঙ্গিতে। যেন রাখি তব মান
তোমার বিচারাসনে লয়ে নিজস্থান।
অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (নৈবেদ্য  হতে সংগ্রহিত)

Tomar Nyayer Dando (Your Mace of Justice)
Translation based off an original by Dilip Mitra

Your mace of justice You bestow upon Man
On the judge’s seat, You grant me this place
And to rule from it You have commanded, o Lord.
May I uphold your glory, with justness and grace.

This granted honour, this onerous task,
I pray to You that I perform,
With head bowed and a reverent heart,
And without fear, uphold Your norm.

Where mercy is a flaw, if You sound
May my ruthlessness know no bound
And at Your gesture, through my voice
May truth strike falsehood down to ground.

He who commits wrong or condones the same,
May your contempt singe like a reed in flame.

– Rabindranath Thakur

কবিতা ৫০ – আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই / Poem 50 – Amar Gharete Aar Nai She Je Nai (Brink of Eternity)

Rabindranath Thakur-Amar Gharete Ar Nai

আজ পাঠকদের জন্যে নীলচে একটি কবিতা। হারানো কোন প্রিয়জনকে নিয়ে বিরহ, আর তাঁকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্খা যে কতটুকু তীব্র হতে পারে, রবীন্দ্রনাথের আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই  কবিতাটিতে তা ব্যাকুলরূপে প্রতিমূর্ত হয়ে উঠেছে। স্থান ও কালের যে অসীমতাকে আমরা ঈশ্বরের একটি রূপ বলে জানি, বিলীন হয়ে যাওয়া সমস্ত কিছুর ঠাঁই তো তারই মাঝে হয়। প্রিয়জনের খোঁজে ক্লান্ত আর পরাজিত মনটির যদি ঈশ্বরের কাছে শেষ আর্তি বলে কিছু থেকে থাকে, তবে তা সেই অসীমতায় হারিয়ে গিয়ে সেই হারানো জনের সাথে একাকার হয়ে যেতে চাওয়া ছাড়া আর কি হতে পারে? পাঠকদের মাঝে যদি কেউ প্রবল আবেগ দিয়ে কাউকে ভালবেসে থাকেন, তিনি জানবেন হয়তো।

Today, a heartbreakingly beautiful poem for your contemplation: in Amar Gharete Aar Nai She Je Nai (Brink of Eternity), Rabindranath Thakur inks his longing for a beloved someone into lines so profound that they leave us awestruck at the infinitude of Creation and the intensity of human feeling. Yearning for someone he has lost, Thakur knows that his search for her is only in vain, so standing on the brink of the Eternal and the Infinite – where all that was exists forever – he tearfully asks God to immerse him in that eternity… wishing nothing more than to feel, for once, her “lost sweet touch in the allness of the Universe”.

Finding words that give voice to a overwhelming love and longing may give solace to those who know the feeling. If you have ever felt anything close, this poem is for you.

আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই

আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই–
যাই আর ফিরে আসি, খুঁজিয়া না পাই।
আমার ঘরেতে নাথ, এইটুকু স্থান–
সেথা হতে যা হারায় মেলে না সন্ধান।
অনন্ত তোমার গৃহ, বিশ্বময় ধাম,
হে নাথ, খুঁজিতে তারে সেথা আসিলাম।
দাঁড়ালেম তব সন্ধ্যা-গগনের তলে,
চাহিলাম তোমা-পানে নয়নের জলে।
কোনো মুখ, কোনো সুখ, আশাতৃষা কোনো
যেথা হতে হারাইতে পারে না কখনো,
সেথায় এনেছি মোর পীড়িত এ হিয়া–
দাও তারে, দাও তারে, দাও ডুবাইয়া।
ঘরে মোর নাহি আর যে অমৃতরস
বিশ্ব-মাঝে পাই সেই হারানো পরশ।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (গীতাঞ্জলী হতে সংগ্রহিত)

Brink of Eternity
(Translated by the Poet himself)

In desperate hope I go
and search for her
in all the corners of my room;
I find her not.

My house is small and
what once has gone from it
can never be regained.

But infinite is thy mansion,
my lord, and seeking her
I have to come to thy door.

I stand under the golden canopy
of thine evening sky and
I lift my eager eyes to thy face.

I have come to the brink of eternity
from which nothing can vanish —
no hope, no happiness,
no vision of a face seen through tears.

Oh, dip my emptied life
into that ocean, plunge it
into the deepest fullness.
Let me for once feel that
lost sweet touch
in the allness of the universe.

– Rabindranath Thakur (Collected from Gitanjali)

কবিতা ৪৯ – ব্যাকুল / Poem 49 – Byakul (The Wicked Postman)

Rabindranath Thakur-Byakul

চিরস্তব্ধ হয়ে যাওয়া কোন বাবার হয়ে তার অবুঝ শিশুর চিঠি লিখে মাকে প্রবোধ দিতে চাওয়ার চাইতে করুণ কিছু বোধহয় এই পৃথিবীতে খুব কমই আছে। আজ তা নিয়েই মন খারাপ করা একটি কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যাকুল

There are few things sadder on earth than a little child trying to console a mother who has gone numb at the loss of her husband. In Rabindranath Thakur’s Byakul (The Wicked Postman), a little boy tells her mother that he will write her all the letters that father does not write to her any more, with a heartbreaking innocence and sincerity that is bound to touch the reader.

ব্যাকুল

অমন করে আছিস কেন মা গো,
খোকারে তোর কোলে নিবি না গো?
পা ছড়িয়ে ঘরের কোণে
কী যে ভাবিস আপন মনে,
এখনো তোর হয় নি তো চুল বাঁধা।
বৃষ্টিতে যায় মাথা ভিজে,
জানলা খুলে দেখিস কী যে —
কাপড়ে যে লাগবে ধুলোকাদা।
ওই তো গেল চারটে বেজে,
ছুটি হল ইস্কুলে যে —
দাদা আসবে মনে নেইকো সিটি।
বেলা অম্‌নি গেল বয়ে,
কেন আছিস অমন হয়ে —
আজকে বুঝি পাস নি বাবার চিঠি।
পেয়াদাটা ঝুলির থেকে
সবার চিঠি গেল রেখে —
বাবার চিঠি রোজ কেন সে দেয় না?
পড়বে ব’লে আপনি রাখে,
যায় সে চলে ঝুলি-কাঁখে,
পেয়াদাটা ভারি দুষ্টু স্যায়না।
মা গো মা, তুই আমার কথা শোন্‌,
ভাবিস নে মা, অমন সারা ক্ষণ।
কালকে যখন হাটের বারে
বাজার করতে যাবে পারে
কাগজ কলম আনতে বলিস ঝিকে।
দেখো ভুল করব না কোনো —
ক খ থেকে মূর্ধন্য ণ
বাবার চিঠি আমিই দেব লিখে।
কেন মা, তুই হাসিস কেন।
বাবার মতো আমি যেন
অমন ভালো লিখতে পারি নেকো,
লাইন কেটে মোটা মোটা
বড়ো বড়ো গোটা গোটা
লিখব যখন তখন তুমি দেখো।
চিঠি লেখা হলে পরে
বাবার মতো বুদ্ধি ক’রে
ভাবছ দেব ঝুলির মধ্যে ফেলে?
কক্‌খনো না, আপনি নিয়ে
যাব তোমায় পড়িয়ে দিয়ে,
ভালো চিঠি দেয় না ওরা পেলে।

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (শিশু হতে সংগ্রহীত)

Byakul (The Wicked Postman)
(Translation by the poet himself)

Why do you sit there on the floor so quiet and silent, tell me, mother dear?
The rain is coming in through the open window, making you all wet, and you don’t mind it.
Do you hear the gong striking four? It is time for my brother to come home from school.
What has happened to you that you look so strange?
Haven’t you got a letter from father today?
I saw the postman bringing letters in his bag for almost everybody in the town.
Only, father’s letters he keeps to read himself. I am sure the postman is a wicked man.
But don’t be unhappy about that, mother dear.
To-morrow is market day in the next village. You ask your maid to
buy some pens and papers.
I myself will write all father’s letters; you will not find a single mistake.
I shall write from A right up to K.
But, mother, why do you smile?
You don’t believe that I can write as nicely as father does!
But I shall rule my paper carefully, and write all the letters beautifully big.
When I finish my writing, do you think I shall be so foolish as father and drop it into the horrid postman’s bag?
I shall bring it to you myself without waiting, and letter by letter help you to read my writing.
I know the postman does not like to give you the really nice letters.

– Rabindranath Thakur (Collected from Shishu)